Image description

অল্প দূরত্বে দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ থাকায় অটোরিকশা সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পেলেও এ বাহনগুলো দেশজুড়ে সড়ক-মহাসড়কে বড় ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ব্যস্ত ও ছোট-বড়সহ সব সড়কেই চলছে অবাধে। নানাবিধ ইতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্টদের মতে, অটোরিকশা বর্তমানে দেশের সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ খাত এবং জননিরাপত্তার জন্য সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

যথাযথ কোনো নীতিমালা ও আইনি কাঠামো ছাড়া গত এক দশকে দেশজুড়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে লাখ লাখ অটোরিকশা সড়কে নেমেছে, যার ফলে সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থায় এক চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। যদিও সারা দেশে দাপিয়ে বেড়ানো এসব ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার লাগাম টানতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।

সরকারি হিসাবে দেশের বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলারের সংখ্যা ৫০ থেকে ৮০ লাখের মধ্যে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এসব যান নিয়ন্ত্রণে সরকার পুরোপুরি বন্ধের পথে না গিয়ে ডিজিটাল নিবন্ধন, কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে বৈধ ও অবৈধ চার্জিং ব্যবস্থাকে আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থানও অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ করার বদলে নিয়ন্ত্রণের দিকে।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে যানজট নিরসন সংক্রান্ত বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার অটোরিকশা বন্ধের পক্ষে নয়। তবে অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ও দৌরাত্ম্য ঠেকাতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগে পরিচালিত চার্জিং পয়েন্টের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। এর আগে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে। বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৩০০ হলেও শুধু ঢাকাতেই অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৪৮ হাজার বলে সরকারের ধারণা। এসব অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে ডিএমপি, ডেসকো ও ডিপিডিসির যৌথ অভিযান চলছে। সরকারের পরিকল্পনায় ডিজিটাল নিবন্ধন, কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো একটি পরিচয়ের বিপরীতে একাধিক যানকে অনিয়মের সুযোগ না দেওয়া এবং যানবাহনের চলাচল নজরদারির আওতায় আনা।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে অটোরিকশা ও অটোভ্যান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ৬০৩ জন। একই সময়ে নছিমন, ভটভটি, আলমসাধু, মাহিন্দ্র, টমটমসহ বিভিন্ন যানবাহনের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৪৬৫ জন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, দেশে বর্তমানে ৮০ লাখের বেশি অটোরিকশা রয়েছে এবং এর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক পরিবারের জীবিকা জড়িত।

প্রচলিত সিএনজিচালিত অটোরিকশার পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ই-রিকশা ও ইজিবাইকসহ বিভিন্ন ধরনের তিন চাকার যান শহর, শহরতলি ও গ্রামীণ সড়কে চলছে। এগুলোর নির্মাণ কাঠামোও এক নয়। কোথাও কারখানায় তৈরি যান বাজারে আসছে; আবার কোথাও মোটর, ব্যাটারি, নিয়ন্ত্রক যন্ত্র, চাকা, ব্রেক, বডি ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ আলাদাভাবে সংগ্রহ করে স্থানীয় ওয়ার্কশপে সংযোজন (ফিটিং) করে অটোরিকশা তৈরি হচ্ছে। সেই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানবাহনের যন্ত্রাংশের বাজারেও রয়েছে দেশি-বিদেশি পণ্যের প্রকারভেদ। স্থানীয় বাজারে অটোরিকশার জন্য ব্যাটারি, চার্জার, মোটর, কন্ট্রোলারসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ যে যার মতো করেই বিক্রি করছে। একই সঙ্গে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে টাইগার নিউ এনার্জি, ওয়ালটন ডিজি-টেক, রহিমআফরোজ, হ্যামকো, সাইফ পাওয়ারটেক, প্যানা, নাভানা এবং ওয়ালটনের মতো শীর্ষস্থানীয় দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ই-রিকশা বা ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য ব্যাটারি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বাজারে সরবরাহ করছে। ফলে অটোরিকশার বিস্তার শুধু সড়কের পরিবহন ব্যবস্থাকে নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আমদানি, যন্ত্রাংশ ব্যবসা, স্থানীয় সংযোজন কারখানা, গ্যারেজ ও চার্জিং ব্যবসাকেও বড় একটি অর্থনৈতিক বাজারে পরিণত করেছে।

যাত্রী ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, নির্দিষ্ট রুটের অভাব, ভাড়ার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ না থাকা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, হঠাৎ সড়কের মাঝখানে থেমে যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে একই সড়ক ব্যবহার নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে চালকদের বক্তব্য, তাদের বড় অংশ জীবিকার জন্য এই পেশার ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ করে যান বন্ধ বা উচ্ছেদ হলে বিকল্প কর্মসংস্থান কী হবে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। এই দ্বন্দ্বই অটোরিকশা নিয়ে বর্তমান নীতিনির্ধারণের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সিকদার মনে করেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ভাষ্য, সড়কের নিয়মকানুন উপেক্ষা করে মহাসড়ক থেকে শহরতলির গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পর্যন্ত এসব যান চলাচল করছে। সাটুরিয়া-কালামপুর আঞ্চলিক সড়কে সাম্প্রতিক একটি দুর্ঘটনার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ওই ঘটনায় নিহত তিনজনের মধ্যে অটোরিকশার চালক ও যাত্রী ছিলেন এবং আরও তিনজন আহত হয়েছেন। নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা না থাকাই এ ধরনের দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। জাহাঙ্গীর সিকদার বলেন, মহাসড়কে অটোরিকশা, নছিমন, করিমন ও ভটভটির চলাচল বন্ধ না করলে সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ করা কঠিন হবে। রাজধানীর যানজট নিয়েও তার বক্তব্য, শুধু অটোরিকশা সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করে মিনিবাসের যাত্রী ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি হকারসহ সড়ক দখলের অন্যান্য কারণও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নাগরিকদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষও (ডিটিসিএ)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মশিউর রহমান জানান, শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। অল্প দূরত্বের যাতায়াতে বিকল্প পরিবহন ব্যবহার এবং প্রধান সড়কে রিকশা-অটোরিকশা নিয়ে চলাচল থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, এসব যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে দুর্ঘটনা ও যানজটের ঝুঁকি বাড়ছে।

মশিউর রহমান আরও জানান, রাজধানীর যানজট কমানো এবং পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে সরকার ২৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে কমিটির সভাপতি এবং ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালককে সদস্য সচিব করা হয়েছে।

সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনাও উৎপাদন ও রুটকেন্দ্রিক হিসেবে সাজানো হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে শুধু সড়কে অভিযান নয়, উৎপাদন পর্যায়েও নিয়ন্ত্রণ আনতে চায়। ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, অনুমোদন ছাড়া যত্রতত্র ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরি বন্ধ করে নির্ধারিত কিছু কারখানার মাধ্যমে উৎপাদনের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অঞ্চলভিত্তিক চলাচলের পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। ডিএসসিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে নির্দিষ্ট এলাকার রিকশা ওই এলাকার মধ্যেই চলাচলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যবস্থাপনায় সরকার সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকাকেও নীতিমালার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়ে স্থানীয় সরকার কাঠামোর ভূমিকাও সামনে এসেছে।

ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইক পরিচালনার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের পাশাপাশি বিআরটিএকে যুক্ত করে একটি কেন্দ্রীয় ও সমন্বিত নীতিমালা বা বিধিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপন। শুধু স্থানীয় সরকার নয়, বরং সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং চালক, যাত্রী ও সাধারণ মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর তিনি জোর দেন। এ ছাড়া বিআরটিএর প্রযুক্তিগত ও কারিগরি দক্ষতার আলোকে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের নিবন্ধন, চালকদের লাইসেন্স এবং রুট পারমিট দেওয়ার প্রস্তাবসহ যান্ত্রিক ত্রুটিগুলো দূর করে দেশীয় কারিগরদের মাধ্যমে আধুনিকায়ন এবং এর ডিজাইন কোনো সিন্ডিকেটের কবজায় না যাওয়ার বিষয়েও সতর্ক করেন। পাশাপাশি শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোয় পার্কিং ও চার্জিং স্টেশন স্থাপন, ট্র্যাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে গতিবিধি মনিটরিং করা, চালক ও প্রস্তুতকারকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা এবং বিদ্যমান গাড়িগুলো পরিবর্তনের জন্য দুই বছরের যৌক্তিক সময় দেওয়ার দাবি জানিয়ে সরকারপ্রধানের কাছে ১০ দফা দাবি পেশ করেছেন বলে কালবেলাকে নিশ্চিত করেন তিনি।

তবে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের প্রধান মো. আনিছুর রহমান মনে করেন, শুধু সড়কে অভিযান চালিয়ে কিংবা আটক অটোরিকশা ডাম্পিং করে সমস্যার সমাধান হবে না। তার মতে, অটোরিকশার মালিকানা ও নিবন্ধন থেকে শুরু করে চার্জিং, গ্যারেজ এবং সড়কে চলাচল—পুরো ব্যবস্থাকে এক কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, নিবন্ধনের পাশাপাশি জিপিএস ও জিওফেন্সিংয়ের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রয়োজন। এতে নির্ধারিত এলাকার বাইরে অটোরিকশা চলাচল করছে কি না, তা নজরদারি করা সম্ভব হবে।

গ্যারেজ ব্যবস্থাপনায়ও সীমা নির্ধারণের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে একটি গ্যারেজে সর্বোচ্চ পাঁচটি অটোরিকশা রাখা যাবে। অর্থাৎ প্রশাসনের পরিকল্পনায় এখন শুধু চালককে আটক বা যানবাহন ডাম্পিং নয়; মালিকানা, নিবন্ধন, গ্যারেজ, চার্জিং এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি—সবকিছুকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনার চিন্তা রয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, সরকার যদি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলে অবশ্যই যাত্রীবান্ধব হবে। কিন্তু সরকারের এমন কোনো মেকানিজম নাই যে, ৮০ লাখ অটোরিকশাকে এখন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। কারণ সরকারের যে মেকানিজম, পরিবহন নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে এটা অত্যন্ত দুর্বল, অত্যন্ত অ্যানালগ সিস্টেম। এই সিস্টেমগুলো পরিবহনের কোনো ক্ষেত্রেই আপনি শুধু অটোরিকশা নয়, যদি সিএনজিচালিত রিকশা বলি অথবা ব্যাটারিচালিত রিকশা বা থ্রিহুইলার তাদের নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, এটা দলীয় সরকার। দলের অনেকেই এটার বিস্তারের সঙ্গে জড়িত, সুবিধাভোগী। আবার পরিবহন ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এখানে তারা নিজেই একটা বড় সুবিধাভোগী। সুতরাং চাইলেও সরকারের পক্ষে এটা নিয়ন্ত্রণ করা কোনোভাবে সম্ভব নয়।

তবে তিনি বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহারের মধ্য দিয়ে যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে এ ক্ষেত্রে ভালো সুফল পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু পরিবহনে প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে সরকারের আসলে তেমন কোনো অবকাঠামো নেই।

ফলে সরকার চাইলেও এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। আর যেসব গাইডলাইন বা আমরা যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করছি, এ পদ্ধতিগুলো আমলাতান্ত্রিক। আমলাদের টেকনিক্যাল জ্ঞানের অভাব রয়েছে। সুতরাং আমি মনে করি, এখানে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো দরকার, প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। পাশাপাশি আমাদের যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, এখান থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। তাহলে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব হতে পারে।

অটোরিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি যানবাহনটির প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ও নকশা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উন্নত ব্রেক বা আধুনিক ব্যাটারি ব্যবহার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং যানটির গতি, কাঠামো, সড়ক ব্যবহারের সক্ষমতা এবং চালকের নিরাপত্তা—সবকিছুকে বিবেচনায় নিয়ে মান নির্ধারণ করতে হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, বুয়েটের তৈরি ব্যাটারি রিকশা সমস্যার প্রকৃত সমাধান করতে পারেনি। এতে ব্রেকিং ব্যবস্থা কিছুটা উন্নত করা হয়েছে এবং লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির বিকল্প হিসেবে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এতে বিদ্যুতের অপচয় বা ব্যাটারির ওপর নির্ভরতা কমেনি।

তার মতে, শক্তপোক্ত কাঠামো তৈরির কারণে চালকের আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়ে অনেকে আরও বেশি গতিতে রিকশা চালাচ্ছেন। ফলে গতি ও ঝুঁকির মূল সমস্যাগুলো থেকেই যাচ্ছে। তার ভাষায়, এটি অনেকটা ছোট আকারের সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত মোটরযানে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রচলিত রিকশার কিছু বৈশিষ্ট্যও হারিয়ে গেছে।

তিনি বলেন, সাধারণ প্যাডেল রিকশার গতি ঘণ্টায় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার হলেও ব্যাটারি যুক্ত হওয়ার পর অনেক রিকশা ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে চলছে। কিন্তু সে অনুযায়ী ব্রেকিং সক্ষমতা ও যানবাহনের মান নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

সাইফুন নেওয়াজের মতে, রিকশার আকার ও প্রস্থ বেড়ে যাওয়ায় নতুন চালকদের পক্ষেও এর নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক পরিমাপ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা নতুন চালকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা নিশ্চিত না করে এসব যান চালানোর সুযোগ দিলে দুর্ঘটনার পাশাপাশি যানজটও বাড়তে পারে।

ব্যাটারি চার্জিং নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে তার। তার দাবি, অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ সংযোগ বা বাসাবাড়ির বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাটারি চার্জ করা হচ্ছে। এতে বিদ্যুতের অপচয়ের পাশাপাশি অগ্নি ও অন্যান্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় সরু চাকার রিকশায় বসে ঝাঁকুনির মধ্যে চলাচলের কারণে চালকদের ভবিষ্যতে কোমর, হাঁটু ও মেরুদণ্ডের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে বলেও তিনি মনে করেন। তার মতে, বিষয়টি ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

ব্যাটারি ও এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও পরিবেশগত ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন তিনি। বিশেষ করে ব্যবহৃত ব্যাটারির অ্যাসিড ও অন্যান্য বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না হলে তা পানি, মাটি ও পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানান তিনি।

রিকশা নিয়ন্ত্রণে শুধু সড়কে অভিযান না চালিয়ে উৎপাদন, আমদানি, ব্যাটারি সরবরাহ ও চার্জিং ব্যবস্থার ওপর নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে, রাস্তায় রিকশা আটকানো বা ব্যাটারি খুলে নেওয়ার পাশাপাশি এসব যান কীভাবে বাজারে আসছে এবং কোথায় চার্জ হচ্ছে, সেটিও নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

তিনি বলেন, জোনভিত্তিক চলাচল ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি। প্রতিটি রিকশায় ট্র্যাকার বা অ্যাপভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করে নির্ধারিত এলাকার বাইরে গেলে কিংবা নিয়ম ভাঙলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।