Image description
রাজ্জাকের বইয়ের প্রকাশনা উৎসব

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের লেখা একটি বইকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধে দলটির ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ২০১৬ সালে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্ব দলের ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে একটি বিবৃতির খসড়া তৈরি করতে অনুরোধ করেছিলেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাককে। রাজ্জাক সাহেবের সেই স্টেটমেন্ট ওই সময় স্বাক্ষর করা হলে জামায়াতের অনেক প্রশ্নের সমাধান হতো। এদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও তার ওই বক্তব্যের পর জামায়াতের সংস্কারের বিষয়ে নতুন করে মতামত দিচ্ছেন। তারা বলছেন, জামায়াতের রিফর্ম প্রয়োজন। তবে জামায়াত ওই স্টেটমেন্ট প্রসঙ্গে বলছে, সেটি কোনো স্টেটমেন্ট হতে পারে না। কারণ দলটি সব সময় পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর মতে, মেইন স্ট্রিম রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে জামায়াতের ভেতরে রিফর্ম প্রয়োজন। তাদের রিথিংকিং করা দরকার। তারা এখনো দাওয়া আর পলিটিক্স আলাদা করতে পারেনি। এটি আলাদা করতে হবে। ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক তার বইয়ে এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। যুগান্তরকে তিনি বলেন, জামায়াত করলে বেহেশতে যাবেন, জান্নাতবাসী হবেন-এই তত্ত্ব থেকে দলটিকে সরে আসতে হবে। তাদের ভেতর থেকেই রিফর্ম করতে হবে। যদিও এবারের সংসদ নির্বাচনে জামায়াত অনেক ভোট পেয়েছে, এটা দেখে খুশি হওয়ার কারণ নেই। দেশের একটি অংশ আওয়ামী লীগ-বিএনপির ওপর নিজেদের হতাশা থেকে জামায়াতকে ভোট দিয়েছে। মানুষ একটি বিকল্প খুঁজছে। জামায়াতকে বিকল্প হতে চাইলে নিজেদের ভুল শোধরাতে হবে। ভেতরে ইন্টেলেকচুয়াল ডিবেট করতে হবে। ভেতর থেকেই তাদের রিফর্ম করতে হবে যা জামায়াতের ভেতরে নেই।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক আলী রীয়াজ যুগান্তরকে বলেন, আবদুর রাজ্জাক তার বইয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে জামায়াতের রাজনৈতিক চিন্তা, দর্শন এবং দলটির অভ্যন্তরীণ বিষয়েও বেশকিছু তথ্য তুলে ধরেছেন।

মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা এবং ক্ষমা চাওয়া-এই বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। আবদুর রাজ্জাক এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন তার বইতে। আমিও মনে করি, এই বিতর্কের অবসান জরুরি। তিনি আরও বলেন, আবদুর রাজ্জাক জামায়াতের বিবেচনা থেকে দেখতে পান, দলটির নেতৃত্বের ঘাটতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষয় হয়েছে। এটাকে তিনি বলছেন, জামায়াত যেভাবে সংগঠন ও কর্মসূচি তৈরি করে, সেখানে কোনো ভিশনারি লিডারশিপ আছে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আবদুর রাজ্জাক মনে করেন, জামায়াতের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা রয়েছে। আদর্শিক অবস্থার কারণে দলটির জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে। একই সঙ্গে আগামী দিনের পথ চলায়ও তাদের অনেক বাধা অতিক্রম করতে হবে।

মরহুম ব্যারিস্টার রাজ্জাকের লেখা ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী : ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ বইটি প্রকাশনা উৎসবে আইনমন্ত্রী শুক্রবার জামায়াতের সাবেক নেতার বিবৃতির বিষয়টি সামনে আনেন।

তবে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ ব্যারিস্টার রাজ্জাকের ওই স্টেটমেন্ট সম্পর্কে যুগান্তরকে বলেন, ওটি কোনো স্টেটমেন্ট হতে পারে না। তিনি বলেন, যে কোনো নীতিনির্ধারণী বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জামায়াতের তিনটি ফোরাম আছে। সেগুলো হলো-মজলিসে শূরা, কর্মপরিষদ এবং নির্বাহী পরিষদ। ব্যারিস্টার রাজ্জাক সাহেব তার বইয়ে ২০১৬ সালের যে অপ্রকাশিত বিবৃতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন সেটা তিনটি ফোরামের কোনোটিতেই অনুমোদিত হয়নি। সুতরাং সেটা দলের স্টেটমেন্ট হতে পারে না। জামায়াত সব সময় পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করে।

তিনি আরও বলেন, স্টেটমেন্ট লেখার জন্য সংগঠন কাউকে দায়িত্ব দিতে পারে। কিন্তু সেটা সংগঠনের উপরোক্ত তিনটি ফোরামে তো ধাপে ধাপে আলোচনা ও অনুমোদন হয়ে আসতে হবে। জামায়াতের নিয়ম হলো এ ধরনের নীতিনির্ধারণী বিষয় প্রথমে নির্বাহী পরিষদে তোলা হয়। সেখানে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নির্বাহীতে অনুমোদনের পর তা কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে উপস্থাপন করা হয়। সেখানেও ব্যাপক পরামর্শ ও আলোচনার সুযোগ রয়েছে। কর্মপরিষদ অনুমোদন দিলে ফাইনালি মজলিসে শূরাতে পাঠানো হয়। মজলিসে শূরা হলো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফোরাম।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে জামায়াতের আইনজীবীদের অংশগ্রহণ না করার প্রসঙ্গে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, কে দাওয়াত পেয়েছে আর কে পায়নি তা আমি জানি না। আমি দাওয়াত পাইনি। আর যারা দাওয়াত পেয়েও যাননি তাদের বিষয়টি তারাই বলতে পারবেন। আর এটা কোনো সাংগঠনিক প্রোগ্রামও ছিল না।

রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে দলটির সাবেক নেতার লেখা বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে জামায়াতের কোনো নেতাকে দেখা যায়নি। এ বিষয়টিও অনুষ্ঠানের আলোচনায় স্থান পায়।

আবদুর রাজ্জাক বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের (আসামিপক্ষ) পক্ষে প্রধান কৌঁসুলি হিসাবে কাজ করেন। এরপর তিনি ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যে যান। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালে দল থেকে পদত্যাগ করেন। পরে আত্মপ্রকাশ করা নতুন রাজনৈতিক দল এবি পার্টির (আমার বাংলাদেশ পার্টি) প্রধান উপদেষ্টা হন। ২০২৫ সালের ৪ মে দেশে ফেরার পর ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান প্রবীণ এই আইনজীবী।

আবদুর রাজ্জাক জামায়াতের সঙ্গে তার পথ চলার দীর্ঘ ৩৩ বছরের সম্পর্কের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে লেখা বইয়ে মুক্তিযুদ্ধে দলটির ভূমিকা, একাত্তর ইস্যুতে ক্ষমা চাওয়া প্রসঙ্গ, নাম পরিবর্তন করাসহ নানা বিষয় তুলে এনেছেন। তিনি লিখেছেন, একাত্তরে ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার খসড়া তৈরি হয়েছিল। দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা দফায় দফায় বৈঠকও করেছিলেন। কিন্তু কখনো নেতৃত্বের মত পরিবর্তন, কখনো দলীয় কমিটির বিরোধিতা, আবার কখনো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে এ উদ্যোগ থেমে যায়। বইয়ের ‘রিফর্ম এজেন্ডা উইদইন জামায়াত’ অধ্যায়ে তিনি আরও লিখেছেন, ২০১৯ সালে একপর্যায়ে জামায়াতের নির্বাহী কমিটি একাত্তরের বিষয়টি মোকাবিলা, দল বিলুপ্ত করা ও নতুন দল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। এর পরপরই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।

আবদুর রাজ্জাক লিখেছেন, দলের নেতৃত্ব ‘বেশ কয়েকটি নীতিগত ভুল ও মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত’ নিয়েছে এবং এখন দলটি ‘অস্তিত্বের সংকটে’ পড়েছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জনগণের মনোভাব বুঝতে জামায়াতের নেতৃত্ব ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। তার ভাষায়, ‘জামায়াত ছয় দফার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার পরপরই বাঙালির স্বার্থবিরোধী এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থের পক্ষে থাকা একটি শক্তি হিসাবে চিহ্নিত হয়ে যায়।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আবদুর রাজ্জাকের লেখা বইটি মূলত একটি স্মৃতিকথা। তবে এই স্মৃতিকথায় শুধু জামায়াতের ১৯৭১ সালের ভুলগুলোর বিবরণ নয়; এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে গোপনীয় রাজনৈতিক দলগুলোর একটি কীভাবে পরিচালিত হয় এবং স্বাধীনতার পর থেকে দলটির নেতৃত্বকে প্রভাবিত করা বিভিন্ন যুক্তি ও বিতর্ক কীভাবে গড়ে উঠেছে, তার একটি বিরল এবং অকপট চিত্র তুলে ধরার অনন্য এক দলিল।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্যেও এই কথার রেশ পাওয়া গেছে। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, আমার কাছে সাহিত্য মনে হয়নি, গবেষণাধর্মীও মনে হয়নি, এটাকে জীবন্ত একজন মানুষের এনসাইক্লোপিডিয়ার মতো মনে হয়েছে। আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন সংশোধনের সময় জামায়াত তাদের নাম মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি করেছিল জানিয়ে বলেন, সংসদে আইনটি পাশের সময় জামায়াত ‘না’ ভোট দেয়নি। তার দাবি, ‘না’ ভোট না দেওয়ার মধ্য দিয়ে জামায়াত ১৯৭১ সালের ভূমিকা মেনে নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ২০১৬ সালে আবদুর রাজ্জাকের ওই অবস্থান জামায়াত গ্রহণ করলে দলটির অনেক প্রশ্নের সমাধান হয়ে যেত।