পণ্য পরিবহণ খাতকে বিশ্বজুড়ে রেলওয়ের আয়ের প্রধান উৎস ধরা হয়; কিন্তু বাংলাদেশে চিত্রটি ঠিক উলটো। ইঞ্জিন-ওয়াগনের সংকট এবং সংশ্লিষ্টদের অদূরদর্শিতায় তলানিতে ঠেকছে রেলওয়ের পণ্য পরিবহণ। প্রতিদিন ২৫টি মালবাহী ট্রেন পরিচালনার সুযোগ থাকলেও সক্ষমতার অভাবে সপ্তাহে চলছে মাত্র ৩ থেকে ৪টি। যাত্রীবাহী ট্রেনের তুলনায় পণ্যবাহী ট্রেনের পরিচালন ব্যয় প্রায় ৮০ শতাংশ কম এবং আয়ও বহুগুণ বেশি। তবু এদিকে নজর নেই কর্তৃপক্ষের।
ফলে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকা আয়ের সুযোগ থাকলেও গত অর্থবছরে এ খাত থেকে এসেছে মাত্র ১৫০ কোটি টাকা। বিপুল সম্ভাবনাময় এই খাতটিকে অবহেলা করায় প্রতিবছর আড়াই হাজার কোটি টাকার বিশাল লোকসান গুনতে হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থাটিকে।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, বর্তমানে নামমাত্র কনটেইনার ও মালবাহী ট্রেন চলাচল করছে। দেশে মোট অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহণের মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ রেলপথে পরিবাহিত হয়। গত ১৮ বছরে রেলওয়ে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। অথচ এ সময়ে পণ্য পরিবহণ থেকে বার্ষিক আয় বেড়েছে মাত্র ৩৪ কোটি টাকা। লাভজনক এই খাতে নজর না দিয়ে সবার ঝোঁক শুধু প্রকল্পের দিকেই।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. সামছুল হক যুগান্তরকে বলেন, রেল কর্তৃপক্ষ মূলত চায় না প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক হোক। ভারতসহ বিশ্বের বহু দেশ মালবাহী ট্রেন পরিচালনা করে লাভবান হচ্ছে। রেলওয়ে শুধু মালবাহী ট্রেন পরিচালনার মাধ্যমেই লোকসান ঘুচিয়ে লাভজনক হতে পারে। তারপরও সংশ্লিষ্টরা দুর্নীতি ও লুটপাটের প্রকল্পের দিকেই দৌড়াচ্ছেন। তিনি বলেন, এখনো সময় আছে, পণ্য পরিবহণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রেলকে সবচেয়ে লাভবান করা সম্ভব।
রেলপথে পণ্য পরিবহণ বাড়াতে বহুমুখী পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন-ওয়াগন ও রোলিংস্টক সামগ্রী নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে এ খাতে আয় বাড়ানো সম্ভব। ব্যবসায়ী মহলকে রেলমুখী করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সার্বিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করা গেলে পণ্য পরিবহণেই হাজার কোটি টাকার বেশি আয় সম্ভব হবে।
রোলিংস্টক দপ্তর সূত্র জানায়, রেলপথে পণ্য পরিবহণের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পর্যাপ্ত ইঞ্জিন ও কোচ পেলে সপ্তাহে অন্তত ১৭৫টি ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব। একটি যাত্রীবাহী ট্রেন একবার গন্তব্যে গেলে সর্বোচ্চ দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা আয় হলেও একটি মালবাহী কিংবা কনটেইনার ট্রেনে আয় হয় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। বর্তমানে যে রেলপথ রয়েছে, পুরোটা ডাবল লাইন ও ডুয়েলগেজ হয়ে গেলে এ পথে প্রতিদিন অন্তত শতাধিক ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব। শতাধিক ট্রেন পরিচালিত হলে এবং একটি ট্রেনে গড়ে ১২ লাখ টাকা আয় হলে বছরে চার হাজার ৩৮০ কোটি টাকা আয় করতে পারবে রেলওয়ে।
আয়ুষ্কাল ফুরানো ইঞ্জিনে খুঁড়িয়ে চলছে ট্রেন : রেলওয়ে আইসিডি ও পরিবহণ দপ্তর বলছে, রেলে কনটেইনার পরিবহণ প্রায় ৮৫ শতাংশ কমেছে। গত জুলাই মাসে ২৬ হাজার ৪১০ টনের পরিবর্তে পণ্য পরিবহণ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৯৮২ টন। রোলিংস্টক দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রায় ৭৫ শতাংশ আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া ইঞ্জিন দিয়ে মালবাহী ট্রেন পরিচালনার চেষ্টা চলছে। যে কোনো সময় পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার লাগেজ ভ্যান ও মৌসুমভিত্তিক স্পেশাল ট্রেন ক্রয় বাবদ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা খরচ করেছে, যা টেকসই হয়নি; ওগুলো এখন রেলের গলার কাঁটা। অথচ এই ৫০০ কোটি টাকায় অন্তত ১৮টি ইঞ্জিন কেনা সম্ভব হতো, যা দিয়ে প্রায় ৩০টি মালবাহী ট্রেন পরিচালনা করা যেত। ইঞ্জিন ও কোচের ভয়াবহ স্বল্পতার কারণে বাধ্য হয়ে পণ্যবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন দিয়ে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে।
প্রকল্পের দিকেই বেশি নজর : রেলওয়ে মার্কেটিং ও করপোরেট প্ল্যানিং দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ দপ্তরকে গুরুত্বই দেওয়া হয় না। সবার নজর প্রকল্প গ্রহণ আর বাস্তবায়নের দিকে। একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে যে শুধু পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনায় বছরে চার হাজার কোটি টাকা আয় সম্ভব, এদিকে কেউই নজর দেয় না। কারণ একটাই, আয় থেকে দুর্নীতি ও লুটপাট করা যায় না। রেলপথ নির্মাণসহ পরিকল্পনাহীন প্রকল্প থেকে লুটপাটের সুযোগ থাকে বলেই সবার নজর সেদিকে।
২০০৮-০৯ অর্থবছরে পণ্য পরিবহণে রেলের আয় ছিল ১২৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ১৮ বছর পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রক্ষেপণে পণ্য পরিবহণে আয় ধরা হয়েছে মাত্র ১৬৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এই দীর্ঘ সময়ে রেল প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও পণ্য পরিবহণ বাড়াতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। উলটো দিন দিন পণ্যবাহী ট্রেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তীব্র সংকটে আইসিডি : রেলওয়ে বাণিজ্যিক ও পরিকল্পনা দপ্তর সূত্র বলছে, কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) স্বাভাবিক কার্যক্রম তীব্র সংকটের মুখোমুখি। এ কারণে এটি প্রায় অকেজো অবস্থায় রয়েছে। এদিকে গাজীপুরের ধীরাশ্রমে আইসিডি নির্মাণ প্রকল্পটির পরিকল্পনা এক দশকেরও বেশি আগে (২০১২ সাল) নেওয়া হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তবে, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুশাসন অনুযায়ী, মাল পরিবহণের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন ওয়াগন ও লোকোমোটিভ সংগ্রহ, আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক রেল সংযোগ সম্প্রসারণ, আইসিডি ও লজিস্টিকস হাব নির্মাণ এবং বাস্তবায়নাধীন মেগা রেল প্রকল্পগুলোর বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ ও অভিযোগ : বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মতো প্রতিষ্ঠান বুকিং দিয়েও জ্বালানিবাহী ট্রেন পরিচালনা করতে পারছে না। পণ্য আমদানিকারক ইমরান চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রেলপথে পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে হাজারও ঝামেলা লেগেই থাকে। নির্ধারিত সময়ে কখনোই পণ্য গন্তব্যে পৌঁছায় না। কমলাপুর আইসিডির অবস্থাও নাজুক, ওখানটা যেন যানজটের একটি উৎপত্তিস্থল। তার অভিযোগ, রেলের একটি অসাধু চক্র বাস ও ট্রাক-লরি মালিকদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে সম্পৃক্ত থাকার কারণেই রেলপথে পণ্য পরিবহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বলেন, মোট পণ্যের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ রেলে পরিবহণ করতে পারলে বছরে শুধু পণ্য পরিবহণেই চার হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করা সম্ভব।
আর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিংস্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন বলেন, আমাদের চেষ্টার কমতি নেই, কিন্তু আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া ইঞ্জিন-কোচ-ওয়াগন দিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া কঠিন।
রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন বলেন, আমাদের পুরো রেলপথ ডাবল লাইন ও ডুয়েলগেজ হচ্ছে। পণ্যবাহী ট্রেন বাড়াতে আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি। লোকসান কমাতে পণ্যবাহী ট্রেনের বিকল্প নেই।