দেশে বিদ্যুতের ঘাটতিতে লোডশেডিং যখন মানুষের জীবনযাত্রায় ওপর চাপ তৈরি করছে, তখন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নেওয়া যাচ্ছে না। রুপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যমুনা ও পদ্মা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সঞ্চালন লাইন নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়া। অর্থাৎ নদীতে টাওয়ার নির্মাণে জটিলতা, টাওয়ারের জায়গায় স্থানীয়দের বালুর বিশাল মজুত, জ্বালানি সংকট এবং যমুনার পানি বাড়ায় প্রকল্পের কাজ পিছিয়েছে। এ অবস্থায় ব্যয় বৃদ্ধি না করে প্রকল্পের মেয়াদ ৬ মাস বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ চলতি সেপ্টেম্বরেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন মেয়াদ বৃদ্ধি করে ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত করেছে বিদ্যুৎ বিভাগের স্টিয়ারিং কমিটি। গত ৭ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখের সভাপতিত্বে স্টিয়ারিং কমিটির সভার কার্যবিবরণীতে এ তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি কার্যবিবরণীটি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
সভায় উত্তাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত মাস পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৯৭ দশমিক ২০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৮৫ দশমিক ৪২ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় যমুনায় রূপপুর-ঢাকা ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট লাইনের ৭ কি.মি, পদ্মায় রূপপুর-গোপালগঞ্জ ৪০০ কেভি সিঙ্গেল সার্কিট লাইনের ২ কি.মি এবং যমুনায় রূপপুর-ধামরাই ২৩০ কেভি ডাবল সার্কিট লাইনের ৭ কি.মি রিভার ক্রসিং নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে যমুনার ২৩০ কেভি রিভার ক্রসিং অংশে এখনো পাঁচটি টাওয়ারের ইরেকশন (স্থাপন) বাকি। ১১টি টাওয়ারের মধ্যে ছয়টির ইরেকশন শেষ হয়েছে। এ অংশের অগ্রগতি প্রায় ৯৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। অবশিষ্ট কাজ শেষ করে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি কমিশনিংয়ের পরিকল্পনার কথা সভায় জানানো হয়। সভায় প্রকল্প পরিচালক জানান, যমুনার ৪০০ কেভি রিভার ক্রসিং অংশে ১১টি টাওয়ারের সবগুলোর ফাউন্ডেশন ও স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। এ অংশের ভৌত অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। পদ্মা নদীর রূপপুর-গোপালগঞ্জ ৪০০ কেভি রিভার ক্রসিং অংশের কাজও শেষ। গত ৫ জুন কমিশনিং করা হয়েছে।
বালু সরাতেই তিন মাস : কাজ পিছিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসাবে উঠে এসেছে টাঙ্গাইল প্রান্তের একটি অপ্রত্যাশিত সমস্যা। সভায় জানানো হয়, টাওয়ার নির্মাণের নির্ধারিত স্থানে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু করে বিপুল পরিমাণ বালু মজুত করে রাখেন। ফলে সেখানে নির্মাণ কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। জেলা প্রশাসনের সহায়তায় সেই বালু সরাতেই প্রায় তিন মাস সময় লেগেছে। এর প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক নির্মাণ অগ্রগতিতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদীতে ভারী নির্মাণযন্ত্র পরিচালনায় জটিলতা। টাওয়ার ফাউন্ডেশন ও ইরেকশনের (স্থাপন) জন্য বড় ক্রেন বার্জ, টাগবোট, অ্যাঙ্কর বোট, ডিজেলচালিত ড্রেজারসহ ভারী যন্ত্রপাতি নিয়মিত ব্যবহার করতে হয়।
সভায় প্রকল্প পরিচালক সভায় জানান, নদীর ভেতরে ফাউন্ডেশন, টাওয়ার স্থাপনসহ গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণকাজে দিনে প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার লিটার এবং সপ্তাহে প্রায় ৫০ হাজার লিটার এইচএসডি ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারি-মার্চে জ্বালানি তেলের অপ্রতুলতার কারণে প্রয়োজনীয় ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। এতে প্রকল্পের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়েছে। এরপর ২০২৬ সালের মে মাসে যমুনা নদীর পানির স্তর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি থাকায় নদীর ভেতরের কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে টাওয়ার ফাউন্ডেশন ও অন্যান্য কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হয়নি। সভায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লে ঠিকাদারের চুক্তির মেয়াদ, ব্যয় ও চুক্তিমূল্য বাড়বে কি না-এ নিয়েও আলোচনা হয়।
তবে প্রকল্প পরিচালক জানান, অনুমোদিত ব্যয় ও চুক্তিমূল্য বাড়বে না। তবে প্রয়োজন হলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদারের মেয়াদ বাড়ানো হবে। এর আগে গত জুনে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পরিদর্শনকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছিলেন, রূপপুরের প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করে সরবরাহ দিতে নভেম্বর পর্যন্ত লাগতে পারে। একই সঙ্গে তিনি উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কথা বলেছিলেন। সাম্প্রতিক আরেক বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, এলএনজি’র উচ্চমূল্যের কারণে শিল্পে উৎপাদন কমছে এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়ছে। অর্থাৎ রূপপুর থেকে নতুন বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও সেটি সময়মতো গ্রিডে নেওয়া, গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিতরণ ব্যবস্থায় পৌঁছে দেওয়া-তিনটি ধাপই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখের সভাপতিত্বে ওই সভায় অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সভায় সচিব বলেন, অবশিষ্ট কাজগুলো অত্যন্ত জটিল ও কারিগরি প্রকৃতির। বাস্তবায়নে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে অ্যাকশন প্ল্যানের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের সংস্থান রাখা উচিত। সভায় প্রকল্পের অগ্রগতি, বিলম্বের কারণ এবং বর্ধিত সময়ের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করা হয়। শেষ পর্যন্ত কমিটি ব্যয় না বাড়িয়ে ৩১ মার্চ ২০২৭ পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়।