দেশে সারের ঘাটতি নেই। বরং আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সম্ভাব্য চাহিদার তুলনায় সরকারি মজুদ প্রায় ১৬ লাখ টন বেশি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে সারের সম্ভাব্য চাহিদা ৩৫ লাখ ২০ হাজার টন।
তার পরও মাঠে সংকট কেন—এ প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে সরকার এবং ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন বলছে, কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে একটি সিন্ডিকেট।
তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন বিতরণের শেষ ধাপের ব্যবস্থাপনা, ডিলারদের অনিশ্চয়তা, সমন্বয়হীন মনিটরিং এবং দুর্বল নজরদারি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ডিলারনীতি বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণের জটিলতা।
মজুদ আছে, মাঠেও যাচ্ছে, কৃষকদের হাতে পৌঁছাতেই সংকট : সার বিতরণব্যবস্থায় তৈরি হওয়া জটিলতার কারণে একদিকে সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত সার পড়ে রয়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে সংকটের খবর পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও ডিলারের গুদামে সার না থাকলেও অন্যত্র অতিরিক্ত দামে সেই সার বিক্রির অভিযোগ উঠছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে জেলার চাহিদার ভিত্তিতে ৭৭ হাজার ৬৪০ টন নন-ইউরিয়া সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বর মাসে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬৮ হাজার ৭২৬ টন। আর অক্টোবর মাসের চাহিদা ধরা হয়েছে এক লাখ ৫৩ হাজার ১৯০ টন। এর মধ্যে বিএডিসি এক লাখ ৪৬ হাজার ১৯০ টন এবং বিসিআইসি সাত হাজার টন সার দেবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় অক্টোবরের বরাদ্দকৃত টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার বিধি অনুযায়ী ডিলারদের মধ্যে উপবরাদ্দ দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বরাদ্দ পাওয়া ডিলারদের মাসের ৭ তারিখের মধ্যে টাকা জমা দিয়ে সার উত্তোলন নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন নীতিতে পুরনো ডিলারদের অনিশ্চয়তা : সারসংকটের পেছনে নতুন ডিলারনীতি বাস্তবায়নের প্রভাবও দেখছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আমন মৌসুমে সারের চাহিদা যখন বাড়ছে, ঠিক তখনই ডিলার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় মাঠে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অভিযোগ উঠেছে, পুরনো ডিলারশিপ বাতিল হয়ে যাবে এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ায় কোনো কোনো ডিলার সরকারি গুদাম থেকে সার উত্তোলন কমিয়ে দিয়েছেন বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছেন। তবে নতুন নীতিমালায় যোগ্য পুরনো ডিলারদের বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ও বিদ্যমান রাসায়নিক সার খুচরা বিক্রেতাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল। কিন্তু নীতির পরিবর্তন এবং মাঠ পর্যায়ে তার বার্তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকায় সরবরাহব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে এক ধরনের স্থবিরতা। এর সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি অংশ।
কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ : বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) জানিয়েছে, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে। এর পরও অসাধু ও অসংগঠিত ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টা চলছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ডিলারদের গুদাম লুট করে সার সংকট তৈরির অপচেষ্টাও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংগঠনটি ডিলারদের নির্ধারিত সময়ে বরাদ্দের সার উত্তোলন করে নিজস্ব গুদামে সংরক্ষণ এবং কৃষক পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রির আহবান জানিয়েছে। সার নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো, কৃত্রিম সংকট তৈরি কিংবা নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে বিক্রির বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে সংগঠনটি।
অভিযানে এক হাজার ৭০০ বস্তা সার উদ্ধার : সার বিতরণ স্বাভাবিক রাখতে সরকার মাঠ পর্যায়ে অভিযানও জোরদার করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গত ২৮ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৩০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৩৮ লাখ ৬৮ হাজার ৮২৪ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে এক হাজার ৭০০ বস্তা সার। চারজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দেশের ৬৪ জেলায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
তবে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগও উঠেছে। সার পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থতার অভিযোগে উত্তরাঞ্চলের একাধিক এলাকার কৃষি কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সার ব্যবস্থাপনায় ‘কন্ট্রোল রুম’ : পরিস্থিতি সামাল দিতে কৃষি মন্ত্রণালয় ‘সার ব্যবস্থাপনা কন্ট্রোল রুম’ চালু করেছে। গত ১১ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এটি দুই শিফটে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম শিফট সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা এবং দ্বিতীয় শিফট বিকেল ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। এ জন্য গঠন করা হয়েছে ২৭টি দল। প্রতিটি দলে রয়েছেন একজন কর্মকর্তা, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও একজন অফিস সহায়ক। কন্ট্রোল রুমের সার্বিক তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত সচিবকে (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ)। কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে জেলা-উপজেলায় সার সরবরাহ, মজুদ, পরিবহন ও বিতরণের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ। কোথাও পরিবহনে অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট, অবৈধ মজুদ, কালোবাজারি কিংবা অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে বলা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখার উপসচিব মো. রোকনুজ্জামান বলেন, সারের মজুদ ও চাহিদাসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রতিনিয়ত মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কোথাও কোনো সমস্যা বা ঘাটতির তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সার ব্যবস্থাপনা ও বিতরণে মনিটরিংও জোরদার করা হয়েছে।
সরকারের উচ্চ পর্যায়ের দুই কমিটি : সার সংকটের কারণ অনুসন্ধান ও পরিস্থিতি মোকাবেলায় গত ২৫ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও কৃষি মন্ত্রণালয় পৃথক দুটি কমিটি গঠন করে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কমিটি সার বিতরণ ও ডিলার ব্যবস্থাপনার মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কমিটি সারা দেশে ডিলারদের বরাদ্দ, উত্তোলন ও বিতরণের তথ্য সংগ্রহ করে অনিয়ম শনাক্তের কাজ করছে। এর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে নিয়ে মাঠ পর্যায়ে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি মাঠে গোয়েন্দা সংস্থাও কাজ করছে।
অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কৃষক পর্যায়ে সারের দাম অপরিবর্তিত রেখে ডিলারদের কমিশন কেজিপ্রতি তিন টাকায় পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষকদের জন্য চার প্রকার সারের (ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি) প্রতি কেজি বিক্রয়মূল্য আগের মতোই অপরিবর্তিত থাকবে। ডিলারদের জন্য প্রতি কেজি সারের ক্রয়মূল্য এক টাকা কমানো হয়েছে। ডিলারদের জন্য প্রতি কেজিতে বিদ্যমান দুই টাকা কমিশন বাড়িয়ে তিন টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।