Image description

সরকারের গ্যারান্টি যুক্ত প্রাইজবন্ডে বিনিয়োগে সাধারণ সঞ্চয়কারীদের আগ্রহে ভাটা পড়েছে। তারা প্রাইজবন্ডে যেমন বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছেন, তেমনি এর বিনিয়োগ থেকে মূল অর্থ ও মুনাফা প্রদানের হারও কমেছে। ফলে প্রাইজবন্ডের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে সরাসরি ঋণ গ্রহণের প্রবণতাও কমেছে। উপযুক্ত প্রচারের অভাব এবং বাজারে প্রাইজবন্ডের চেয়ে আরও লাভজনক ও সহজে কেনার সঞ্চয়ী উপকরণ পর্যাপ্ত থাকার কারণে এর প্রতি সঞ্চয়কারীদের আগ্রহে ভাটা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তারা প্রাইজবন্ডকে আরও আকর্ষণীয় করতে আরও বেশি মূল্যমানের বিশেষ করে ১ হাজার টাকার ও আকর্ষণীয় মুনাফার প্রাইজবন্ড বাজারে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন।

জনগণের জন্য সরকারের বিনিয়োগ প্রকল্প বা সঞ্চয়ী উপকরণ হিসাবে ১৯৭৪ সালে প্রথম প্রাইজবন্ড চালু করা হয়। বর্তমানে বাজারে ১০০ টাকা মূল্যমানের প্রাইজবন্ড চালু রয়েছে। ১৯৯৫ সালে এটি চালু করা হলেও প্রথমদিকে ১০ টাকা ও ৫০ টাকা মূল্যমানের প্রাইজবন্ড ছিল। মূল্যস্ফীতির হার বাড়ার কারণে সেগুলো ১৯৯৫ সালে বাতিল করা হয়। শুরুর দিকে এই বন্ড বিয়ে, জন্মদিন বা নানা পারিবারিক উৎসবে উপহার হিসাবে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। প্রিয়জনদের নানা উপলক্ষ্যেও দেওয়া হতো প্রাইজবন্ড। কারণ এটি বেশ সহজলভ্য। একই সঙ্গে যার হাতে যাবে সেই হবে এর মালিক। সময়ের বিবর্তনে এর গুরুত্ব ও জনপ্রিয়তা কমেছে।

নগদ টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে কোনো শাখা অফিস, বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা, ডাকঘর ও জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের যে কোনো শাখা থেকে খুব সহজে নগদ টাকার বিনিময়ে প্রাইজবন্ড কেনা যায়। এটি কেনার ক্ষেত্রে কোনো বিনিয়োগ সীমা নেই। এতে কোনো সুদ বা মুনাফা দেওয়া হয় না। তবে প্রতি তিন মাস পরপর বছরে চারবার এর লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে পুরস্কার দেওয়া হয়।

প্রাইজবন্ডের ৪৬টি সিরিজ রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি নাম্বারের ৪৬টি প্রাইজবন্ড আছে। প্রতি সিরিজের জন্য রয়েছে পুরস্কার। মোট ৪৬টি পুরস্কার দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রথম পুরস্কার ১টি ৬ লাখ টাকা, দ্বিতীয় পুরস্কার ১টি সোয়া ৩ লাখ টাকার। তৃতীয় পুরস্কার ২টি প্রতিটি ১ লাখ টাকা করে, চতুর্থ পুরস্কার ২টি প্রতিটি ৫০ হাজার টাকা করে এবং পঞ্চম পুরস্কার ৪০টি প্রতিটি ১০ হাজার টাকা করে। প্রতি সিরিজের জন্যই এসব পুরস্কার রয়েছে। সব মিলে প্রতি ড্রতে ১৬ লাখ ২৫ হাজার টাকার পুরস্কার দেওয়া হয়। ড্র অনুষ্ঠিত হওয়ার দুই বছরের মধ্যে পুরস্কার দাবি করতে হয়। অর্থ স্থানান্তরের আগে ২০ শতাংশ হারে আয়কর কেটে রাখা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রাইজবন্ড বিক্রির সংখ্যা বেশ কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯৯ কোটি ৩০ লাখ টাকার প্রাইজবন্ড বিক্রি হয়েছিল। গত অর্থবছরে বিক্রি হয়েছে ৭৭ কোটি ৯০ লাখ টাকার প্রাইজবন্ড। এক বছরের ব্যবধানে এর বিক্রি কমেছে ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকার বা ২১ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল বিনিয়োগ বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৬৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। একই সময়ে লটারির ড্র বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৪৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। মূল অর্থ পরিশোধ বাবদ অর্থ বাদ দিয়ে নিট বিক্রি ছিল ৩২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। মূল টাকা ও লটারির ড্র এই দুটি মিলে মোট পরিশোধ করা হয়েছে ১১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ গ্রস বিক্রির চেয়ে পরিশোধ করা হয়েছে ১৫ কোটি ১০ লাখ টাকা বেশি। এই বাড়তি অর্থ সরকারকে অন্য খাত থেকে এনে জোগান দিতে হয়েছে।

গত অর্থবছরে এ খাতেও অর্থ পরিশোধ কম হয়েছে। মূল অর্থ পরিশোধ করা হয় ৫৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং লটারির ড্র বাবদ পরিশোধ করা হয় ২৮ কোটি ২০ লাখ টাকা। মূল অর্থ পরিশোধ বাদ দিয়ে নিট বিক্রি হয়েছিল ২১ কোটি ৫০ লাখ টাকার। মূল অর্থ ও লটারির ড্র এ দুটি মিলে পরিশোধ করা হয় ৮৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। গ্রস বিক্রির চেয়ে পরিশোধ বেশি করা হয় ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এ অর্থও অন্য খাত থেকে জোগান দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তুলনায় গত অর্থবছরে প্রাইজবন্ডের মূল অর্থ পরিশোধ কমেছে ১০ কোটি ৩০ লাখ টাকা বা ১৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। একই সময়ে লটারির ড্র বাবদ পরিশোধ কমেছে ১৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা বা ৪০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ওই সময়ে নিট বিক্রি কমেছে ১০ কোটি ৯০ লাখ টাকা বা ৩৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

অথচ আগে প্রাইজবন্ডের বিক্রি বেশি ছিল। ফলে তা থেকে নিয়মিত অর্থ পরিশোধ করেও উদ্বৃত্ত থাকত। যা সরকার জনগণের কাছ থেকে ঋণ হিসাবে নিত। এখন এর বিক্রি কমায় সরকার নিট ঋণ নিতে পারছে না।

প্রাইজবন্ডের বিক্রি কমে যাওয়ার কারণ হিসাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, আগে প্রাইজবন্ডে বিনিয়োগের বিষয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হতো। এখন সেগুলো একেবারে বন্ধ। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে প্রাইজবন্ডের বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা নেই। মূল্যস্ফীতি বাড়ার কারণে ১০০ টাকা এখন তেমন মূল্যবান না। সময়ের প্রয়োজনে এখন ১ হাজার টাকা ৫০০ টাকা মূল্যমানের প্রাইজবন্ড ছাড়া যেতে পারে। এছাড়া ব্যাংকগুলোতে এখন নানা ধরনের সঞ্চয়ী উপকরণ আছে। সেগুলো নিয়ে বেশ প্রচারও চলছে। ফলে গ্রাহকরা এখন সেদিকে ঝুঁকছেন। তবে প্রাইজবন্ডের সুবিধাগুলোর প্রচার করা দরকার। পাশাপাশি এর মুনাফার ওপর কর তুলে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।