সম্প্রতি এক অসাধ্য সাধন করেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তারা। আর্থিক লেনদেনের জটিলতম প্রক্রিয়া ক্রিপ্টোকারেন্সির পথ ধরে বিদেশে পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনেন তারা। কানাডাভিত্তিক ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ (এমটিএফই) প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া এসব টাকা পাচার করে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার ক্রিপ্টোতে পাচার হওয়া প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ফেরাতে সহযোগিতা করে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসসহ কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান। যাদের অন্যতম শর্ত ছিল দ্রুততম সময়ে ভুক্তভোগীদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়া। তবে এখন সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পথে তদন্ত সংস্থাটি। নিজেদের নামে চালু করা ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হওয়ার প্রায় ৬ মাস হয়ে গেলেও ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। এমনকি ফেরানোর কোনো প্রক্রিয়াও শুরু করেননি তারা। সিআইডির সংশ্লিষ্ট সূত্র ও এমটিএফইর প্রতারিত ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় টাকা ফিরিয়ে আনার পর তা যথাসময়ে ভুক্তভোগীদের না দেওয়ায় খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন হচ্ছে। এটি দেশ থেকে পাচার হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা ফিরিয়ে আনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। কর্মকর্তাদের উচিত দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে দ্রুত টাকা ফিরিয়ে দিয়ে নিজেদের স্বচ্ছতার প্রমাণ রাখা।
এদিকে টাকা ফেরত আসার পরও ফেরত না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগীরা। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে মিরপুর এলাকার এক ভুক্তভোগী বুধবার যুগান্তরকে বলেন, এই সাইটে বিনিয়োগ করে আমি অন্তত ১৫ লাখ টাকা খুইয়েছি। সিআইডিতে প্রয়োজনীয় সব তথ্য দিয়ে রেখেছি। একইভাবে আরও অন্তত ৩০ জন লেনদেনের তথ্য সিআইডিকে দিয়ে রেখেছেন টাকা ফেরত পাওয়ার আশায়। কিন্তু বিদেশ থেকে টাকা এনে কর্মকর্তারা এখনো রেখে দিয়েছেন। আমাদের কবে কীভাবে দেবেন কিছুই বলতে পারছেন না তারা।
আরেক ভুক্তভোগী টিকাটুলির ব্যবসায়ী আরমান আজীজ যুগান্তরকে বলেন, টাকা ফেরত পাইনি, এমনকি টাকা যে তারা নিয়ে এসেছেন এটাই আমাদের জানানো হয়নি। এত দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষায় থেকে তথ্যগুলোও সংরক্ষণে রাখতে পারিনি। তারা আরও সময়ক্ষেপণ করলে টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এ বিষয়ে সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি মিডিয়া শাখায় যোগাযোগের পরামর্শ দেন। মিডিয়া শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহর কাছে একাধিকবার প্রশ্ন পাঠিয়ে জানতে চাওয়া হয়। তবে গতকাল বুধবার এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
জানা গেছে, এমটিএফই ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ফরেক্স ট্রেডিংয়ে উচ্চ মুনাফার লোভ দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করত। এমএলএমের মতো নেটওয়ার্কের মাধ্যমে স্থানীয় দলনেতারা সাধারণ মানুষকে তাদের সঞ্চয় বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করেন। যাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন শিক্ষিত ও প্রযুক্তিবান্ধব। বিনিয়োগের জন্য কেউ সম্পদ বিক্রি করেন, আবার কেউ কেউ ঋণ নিয়ে টাকা জোগাড় করে বিনিয়োগ করেন। প্ল্যাটফর্মটি শুরুতে ভুয়া মুনাফা দেখিয়ে আস্থা অর্জন করে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি টাকা উত্তোলন বন্ধ করে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। পরে জানা যায়, হাতিয়ে নেওয়া টাকার মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই বাংলাদেশিদের। অভিযোগ উঠে তারা অন্তত ১১ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
পরে গ্রাহকের করা মামলার তদন্তে নেমে সিআইডি দেখতে পায়, এমটিএফইর সাইটে থাকা ভুক্তভোগীদের অ্যাকাউন্টে প্রদর্শিত ভার্চুয়াল মুদ্রাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। সিআইডি জানতে পারে শ্রীলংকার কর্তৃপক্ষ ওকেএক্স এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্ম থেকে এমটিএফই-সংশ্লিষ্ট তহবিল উদ্ধার করেছে। এই সূত্র ধরে এক্সচেঞ্জটির সঙ্গে প্রমাণাদিসহ আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করে সিআইডি। পরে জব্দ হওয়া টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়ায় ঢাকার মার্কিন দূতাবাস, ইউএস সিক্রেট সার্ভিস, এফবিআই এবং মার্কিন বিচার বিভাগের আইসিআইটিএপি প্রোগ্রামের সহযোগিতা নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় টাকা ফেরানোর জন্য গত বছরের নভেম্বরে অ্যাসেট রিয়েলিটি লিমিটেডের সঙ্গে ২ দশমিক ৫ শতাংশ ফি দেওয়ার শর্তে চুক্তি করে সিআইডি। অবশ্য টাকা গ্রহণের জন্য সোনালী ব্যাংকের মালিবাগ শাখায় তিনজন সিআইডি কর্মকর্তার নামে একটি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। একই বছরের ২৪ নভেম্বর অ্যাসেট রিয়েলিটির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকে সিআইডির খোলা অ্যাকাউন্টে পরীক্ষামূলক লেনদেন চালানো হয়। এতে ইউএসডিটি থেকে মার্কিন ডলার, এরপর টাকায় রূপান্তরের মাধ্যমে লেনদেনটি সফল হয়। একই প্রক্রিয়া অবলম্বন করে অ্যাসেট রিয়েলিটি ১৪ মার্চ জেপি মরগান চেজ ব্যাংকের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে টাকা পাঠায়। মার্চে ওই অ্যাকাউন্টেই টাকা জমা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্রিপ্টোতে পাচারের ঘটনা অনেক আগেই শুরু হয়েছে। তবে টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার ঘটনা এটিই প্রথম। দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন-সংক্রান্ত আইন না থাকা এবং পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কম থাকায় এটা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং কাজ। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে এই প্রক্রিয়ায় পাচার হওয়া সব টাকা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একইসঙ্গে টাকা ভুক্তভোগীদের যথাসময়ে দেওয়া বা আইনগত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।