Image description

কাজী নজরুলের জীবন, সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন নিয়ে গবেষণা এবং তার স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত নজরুল গবেষণা ইনস্টিটিউট চলছে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে। প্রতিষ্ঠার পর ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও ইনস্টিটিউটের স্থায়ী পরিচালক পর্যন্ত নেই। এছাড়া ২৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে আছেন মাত্র তিনজন। ফলে গবেষণা, প্রকাশনা, সংরক্ষণসহ একাডেমিক কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না। এটি প্রতিষ্ঠার পর প্রশাসনে অনেক পালাবদল হলেও স্থায়ী পরিচালক নিয়োগ এবং জনবল সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক কিছু বদলালেও বদলায়নি প্রতিষ্ঠানটির চিত্র।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আট বছর পর ২০১৪ সালে ‘ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল কবির স্মৃতি সংরক্ষণ, তার জীবন ও কর্ম নিয়ে পাঠদান, গবেষণা, নজরুল রচনাবলি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, প্রকাশনা এবং দেশে-বিদেশে তার ভাবমূর্তি তুলে ধরা। দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এটিই প্রথম ও একমাত্র নজরুল গবেষণা ইনস্টিটিউট।

তবে প্রতিষ্ঠার এক যুগ পরও প্রতিষ্ঠানটি পরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদটি পায়নি। উপাচার্য দায়িত্ব পালন করছেন। তবে পূর্ণকালীন পরিচালক না থাকায় গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রমে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি উপাচার্যের পক্ষে ইনস্টিটিউটের গবেষণা কার্যক্রমে সময় দেওয়া কঠিন।

জনবল সংকটও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমকে সীমিত করে রেখেছে। ২৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে মাত্র তিনজন কর্মরত থাকায় গবেষণায় সহায়তা, প্রশাসনিক কাজ, প্রকাশনা ও তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণসহ নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে নজরুলকে নিয়ে বৈচিত্র্যময় ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগে ‘নজরুল স্টাডিজ’ বাধ্যতামূলক কোর্স হিসাবে পড়ানো হলেও নজরুল গবেষণাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে ইনস্টিটিউটটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পর্যাপ্ত গবেষক, প্রয়োজনীয় স্টাফ এবং নেতা না থাকায় নজরুলকে নিয়ে বড় পরিসরে গবেষণার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।

প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি ভবনের একাংশে ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ স্থানান্তরের কথা রয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে ভবনটি বুঝে পাওয়ার কথা কর্তৃপক্ষের। সেখানে ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ ছাড়া আরও চারটি ইনস্টিটিউট স্থানান্তর করা হবে।

তবে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ‘ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ’ কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে। গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক জার্নাল ও গ্রন্থ প্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের মতো কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। ভারতের নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশিত ‘নজরুল জার্নাল’ এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনও প্রতিষ্ঠানটির অনন্য উদ্যোগ। তবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও সম্ভাবনার তুলনায় এসব কার্যক্রমকে এখনো সীমিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজের অতিরিক্ত পরিচালক রাশেদুল আনাম বলেন, ‘স্থায়ী পরিচালক না থাকা এবং অনুমোদিত পদের তুলনায় কমসংখ্যক জনবল থাকার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনই বলতে পারবে।’ তিনি বলেন, সীমিত জনবল নিয়ে ইনস্টিটিউটের নিয়মিত গবেষণা, প্রকাশনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. হাবিব-উল-মাওলা বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পর্যাপ্ত জায়গা ও অবকাঠামোর অভাবকে কার্যক্রম পরিচালনায় বড় বাধা হিসাবে দেখানো হয়েছে। তবে শুধু জায়গা বা ভবন সংকটকে মূল সমস্যা হিসাবে দেখলে প্রকৃত কারণ আড়ালে থেকে যায়। একাডেমিক পর্যায়ে নজরুলকে যথাযথভাবে ধারণ করা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে তার দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী নজরুল ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদটি সিন্ডিকেট সদস্য হওয়ার সঙ্গে যুক্ত, যা অন্যান্য পরিচালকের ক্ষেত্রে নেই। দীর্ঘদিনেও এ পদে স্থায়ী নেতৃত্ব তৈরি না হওয়ার পেছনে কৌশলগত অবস্থান, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা কাজ করছে কি না, তা পর্যালোচনার প্রয়োজন। নজরুল সাহিত্য নিয়ে কাজ করা যোগ্য সাহিত্যিক বা গবেষকদের মধ্য থেকেও পরিচালক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব। তবে শুধু পরিচালক নিয়োগ করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। প্রতিষ্ঠানটিকে কেবল একটি অর্থবছর পার করার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালনা করলে কাঙ্ক্ষিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, আমি নতুন এসেছি। ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। এরই মধ্যে ইনস্টিটিউটটির জন্য একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, যা এ বছরের মধ্যে হস্তান্তরের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবনটি প্রস্তুত হলে সেখানে ইনস্টিটিউটটি স্থানান্তর করা হবে। পাশাপাশি নজরুল গবেষণায় অভিজ্ঞ কোনো নজরুল গবেষক বা বিশেষজ্ঞকে পরিচালক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হবে।

নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত সেই বটগাছ : ময়মনসিংহের ত্রিশালে কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বটগাছটি আজও দাঁড়িয়ে আছে। কবির কিশোরবেলার স্মৃতি বহন করা এই বটবৃক্ষকে ঘিরেই একসময় প্রতিষ্ঠিত হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়। স্থানীয়ভাবে এটি ‘নজরুল বটবৃক্ষ’ নামে পরিচিত। জনশ্রুতি রয়েছে, কিশোর নজরুল স্কুল ফাঁকি দিয়ে এই বটগাছের নিচে বসে বাঁশি বাজাতেন। ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বটগাছসংলগ্ন স্থানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরের বছর আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর তার ভিত্তিফলক ও বটগাছকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে রেখে উন্নয়নকাজ করা হয়। নজরুলপ্রেমীদের অভিযোগ, কবির স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থান সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বটগাছটি দীর্ঘদিন উপেক্ষিত। যে বটগাছের স্মৃতিকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, সেই গাছই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকা দুঃখজনক। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ঐতিহাসিক বটতলাকে আমরা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেব। সংরক্ষণের জন্য সেখানে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা জাদুঘর করা যায় কি না, সেটাও ভাবনায় রাখা হচ্ছে।’