Image description

আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের ঘটনা নতুনভাবে যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ ও স্মৃতিচিহ্ন, আধুনিক প্রযুক্তি, খেলাধুলা, আনন্দময় শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে নবম-দশম শ্রেণির বিভিন্ন বইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘উই রিভোল্ট’-বিদ্রোহ, স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা এবং ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ যুক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে খালেদা জিয়ার ভূমিকার পাঠও রাখা হচ্ছে। এছাড়া শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। নবম-দশম শ্রেণির পৌরনীতি ও নাগরিকতা বইয়ের রাজনৈতিক দলের অধ্যায়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বিষয় যুক্ত করা হয়েছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্রে জানা গেছে, আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাথমিক স্তরের ৩৬টি বই আর মাধ্যমিক স্তরের ৯৫টি বই কর্মশালার মাধ্যমে পরিমার্জন করা হয়েছে। এছাড়া চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন চারটি বই যুক্ত করা হবে। সেখানে খেলাধুলা, আনন্দময় শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিতে এসব বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে। এসব বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ চলছে। আগামী জানুয়ারিতে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলে শিক্ষার্থীরা এসব বই বিনামূল্যে পাবে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা যুগান্তরকে বলেন, ইতিহাসে যার যতটুকু অবদান, তা নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা হচ্ছে। সত্য ও নির্ভুল ইতিহাস শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরতেই সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে।

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, নতুন বইয়ের অন্যতম আলোচিত সংযোজন নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ প্রবন্ধ। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে এটি পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রবন্ধটির সঙ্গে জিয়াউর রহমানের তৎকালীন একটি ডায়েরির ছবিও যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রবন্ধটিতে ১৯৭১ সালের মার্চে চট্টগ্রামে প্রতিরোধের প্রস্তুতি, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়নের সদস্যদের সংগঠিত করা, ‘উই রিভোল্ট’ বলে বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত এবং কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের ঘটনা জিয়াউর রহমানের স্মৃতিচারণার আলোকে তুলে ধরা হয়েছে। প্রবন্ধের ভূমিকা অংশে স্বাধীনতাকে কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কৃতিত্ব হিসাবে না দেখে দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম ও গণমানুষের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতার ফল হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এতে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিভিন্ন শ্রেণিতে রাজনৈতিক ইতিহাস : প্রাথমিকের পঞ্চম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের ‘আমাদের স্মরণীয় নেতা’ অধ্যায়ে শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানের পাশাপাশি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার জীবনী যুক্ত হচ্ছে। মাধ্যমিকের ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে জিয়াউর রহমানের ‘উই রিভোল্ট’ বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ যুক্ত হচ্ছে। অষ্টম শ্রেণির বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ব্রিগেড ফোর্সের বিষয়ও রাখা হয়েছে। নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রসত্তা বিনির্মাণের স্থপতিবৃন্দ’ নামে নতুন অধ্যায় রাখা হয়েছে। এতে রাজা গোপাল, ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ, মীর নিসার আলী তিতুমীর, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, ঈশা খাঁ, শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানকে নিয়ে পাঠ থাকছে। একই শ্রেণির ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’ বইয়ে ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ ও গণতান্ত্রিক বিকাশ’ নামে নতুন অধ্যায়ে ১৯৭২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন শাসনকাল ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ যুক্ত করা হচ্ছে। একই বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের কয়েকটি প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং জিয়া স্মৃতি জাদুঘর সম্পর্কেও পাঠ রাখা হয়েছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গুরুত্ব : ২০২৭ সালের বইয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু আরও বিস্তৃত হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘শহিদ আনাসের কথা’ শীর্ষক গদ্য এবং নবম-দশম শ্রেণির ইতিহাসভিত্তিক বইয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ ও তাৎপর্য তুলে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান জাদুঘর’ ও ‘জুলাই শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ’ বিষয়েও পাঠ যুক্ত হচ্ছে। এর আগে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার তৎকালীন নতুন শিক্ষাক্রম থেকে সরে এসে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের আলোকে বই পরিমার্জনের উদ্যোগ নেয়। ২০২৫ সালের বইয়ে বিভিন্ন শ্রেণির বাংলা ও ইংরেজি বইয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে কবিতা, প্রবন্ধ ও গদ্য যুক্ত করা হয়। পরে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়েও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

আইসিটি বইয়ে থাকছে এআই-রোবোটিক্স : শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করতে ষষ্ঠ থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত চারটি ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ বই যুগোপযোগী করা হয়েছে। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, অটোমেশন, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং, রোবোটিক্স, ন্যানোপ্রযুক্তি ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মতো বিষয় যুক্ত হয়েছে। এছাড়া রিমোট ওয়ার্ক, ফ্রিল্যান্সিং, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান, ক্যানভা, পাইথন, সরকারি ই-সেবা, এফ-কমার্স, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, সাইবার বুলিং, ফিশিং, গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা ও নাগরিক সাংবাদিকতা নিয়েও নতুন কনটেন্ট রাখা হয়েছে।

আসছে নতুন চার বই : প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে খেলাধুলা, আনন্দময় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে নতুন বই ও বিষয় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা ও আমার সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে নতুন বই যুক্ত হচ্ছে। ষষ্ঠ শ্রেণির কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষাবিষয়ক বইয়েও কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে ব্যাপক পরিমার্জন করা হচ্ছে।

এনসিটিবি সূত্র জানায়, পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তন দুইভাবে করা হচ্ছে। এক পর্যায়ে বাক্য, শব্দ ও ভাষাগত ছোটখাটো সংশোধন হচ্ছে। অন্য পর্যায়ে বিষয়বস্তু ও অ্যাকটিভিটিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের কারিকুলামে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও খেলাধুলাবিষয়ক নতুন বিষয় যুক্ত হচ্ছে। রোবোটিক্স, এআই ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়াই এর উদ্দেশ্য। ২০২৭ সালের পাঠ্যপুস্তকে যতটুকু সম্ভব পরিমার্জন, সংযোজন ও বিয়োজন করা হচ্ছে। তবে ২০২৮ শিক্ষাবর্ষের কারিকুলামে সংস্কার আনা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ বলেন, অতীতে পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে ইতিহাসচর্চায় একপাক্ষিকতার প্রবণতা দেখা গেছে। আগামী শিক্ষাবর্ষের নতুন বইয়ে বিভিন্ন পক্ষ ও ব্যক্তির ভূমিকা তুলে ধরার উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আরও বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপনে সহায়ক হবে।