Image description

দেশের বিভিন্নস্থানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে চরম সন্ত্রাস ও অপরাধ। তুচ্ছ ঘটনা থেকে শুরু করে আধিপত্য বিস্তার ও পুরোনো বিরোধের জেরে একের পর এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন মানুষ। কক্সবাজারের মহেশখালীতে চোর সন্দেহে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে এক যুবককে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে হত্যার পর ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার কেরানীগঞ্জে সেলুনে ঢুকে ফিল্মি স্টাইলে এক যুবককে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের পুরোনো বিরোধের যোগসূত্র পেয়েছে পুলিশ। এর বাইরে চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় গত আড়াই বছরে রাজনৈতিক বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারের জেরে অন্তত ৪০টি খুনের ঘটনায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সেখানকার সাধারণ মানুষ।

আড়াই বছরে ৪০ খুন

রাউজান-রাঙ্গুনিয়ায় মৃত্যুভয় তাড়া করে ফিরছে মানুষকে

চট্টগ্রামের উত্তরের দুই উপজেলা রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার মানুষ সন্ত্রাসীদের ভয়ে থরথর কাঁপছে। কখন কার ওপর জারি হয় মৃত্যুপরোয়ানা, কখন সন্ত্রাসীদের গুলিতে কিংবা প্রকাশ্য হামলায় নিভে যায় জীবনপ্রদীপ-সেই আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে তাদের। ব্যবসায়ী, প্রবাসী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ-সবার মধ্যেই রয়েছে এই আতঙ্ক। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ দুই উপজেলায় এ অবস্থা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এখানে সন্ত্রাসে জড়িত বাহিনী মাঝেমধ্যে নগরীকেও অশান্ত করে তোলে। হোয়াটসঅ্যাপ, ভয়েস মেসেজ কিংবা ফোন করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, চাঁদা না দিলে মৃত্যুর পরোয়ানা জারি এবং প্রকাশ্যে বাসাবাড়িতে গিয়ে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলিবর্ষণ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে আসছে তারা। গত আড়াই বছরে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় ৪০টির মতো খুনের ঘটনা ঘটেছে। শুধু রাউজানেই সংঘটিত হয়েছে ২৭টি হত্যাকাণ্ড।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্টরা জানান, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ খানের নির্দেশে তার অনুসারী ছোট সাজ্জাদ, ডেভিড ইমন, রায়হান, গলাকাটা মোবারক, ধামা ইলিয়াছসহ বিশাল একটি গ্রুপ পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডকে অস্থির করে রেখেছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তারা। ইতোমধ্যে ছোট সাজ্জাদ, ডেভিড ইমন, গলাকাটা মোবারক ও ধামা ইলিয়াছ গ্রেফতার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে রায়হান ও তার সহযোগীরা। শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ এখন রায়হানকে দিয়েই আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কোনো না কোনো ব্যবসায়ী ও প্রবাসী চাঁদার দাবিতে তাদের হুমকি পাচ্ছেন।

এলাকাবাসী জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে রায়হানসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী আত্মগোপনে গেলেও রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় নতুন নতুন সন্ত্রাসীর আনাগোনা বেড়েছে।

সূত্র জানায়, রাউজান-রাঙ্গুনিয়ায় সক্রিয় বাহিনীগুলো বালু, মাটি, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করে। বিনা পুঁজির এসব ব্যবসা থেকে তারা কোটি কোটি টাকা আয় করে। এক বাহিনীর ব্যবসায় আরেক বাহিনী হস্তক্ষেপ করলেই ঘটে সংঘর্ষ ও খুনোখুনির ঘটনা। রাউজানের নোয়াপাড়া এলাকায় সক্রিয় রয়েছে ফজল হক বাহিনী, জসিম বাহিনী, কামাল বাহিনী ও জানে আলম বাহিনী। পশ্চিম গুজরায় সক্রিয় রমজান বাহিনী এবং বাগোয়ান ইউনিয়নে মামুন বাহিনী ও ভূপেশ বাহিনীর দাপট রয়েছে। এছাড়া পৌরসভাসহ উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে সাতটি বাহিনীর উপবাহিনী গড়ে উঠেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল মান্নান হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই রক্তপাত দুই বছরেও থামেনি। একের পর এক রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও সশস্ত্র সন্ত্রাসে নিহত হয়েছেন ২৭ জন। তাদের ২০ জনই রাজনৈতিক কারণে লাশ হয়েছেন।

সর্বশেষ ৩ সেপ্টেম্বর রাতে রাউজান থানার উরকিরচর ইউনিয়নের কেরানিহাট এলাকায় মোহাম্মদ করিমকে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে দুর্ধর্ষ কিলারদের বেপরোয়া তৎপরতা। ঘটনার পুরো রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। জড়িত চারজনকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাউজানে ২৭টি হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। চলতি বছরের ১৩ জুন সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরী। রাউজানের পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী হিসাবে পরিচিত রায়হানসহ ১১ জনের নামে মামলা হয়।

২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরী মার্কেট এলাকায় পিটিয়ে হত্যা করা হয় রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া ইউনিয়নের শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল মান্নানকে। একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর সাবেক সংসদ-সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর বাগানবাড়ি থেকে ইউসুফ মিয়া নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ১১ নভেম্বর নিখোঁজের তিন দিন পর রক্তাক্ত অবস্থায় হাফেজ মাওলানা আবু তাহের নামে এক মাদ্রাসাশিক্ষকের লাশ উদ্ধার করা হয়।

২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি নোয়াপাড়ায় গ্রামের বাড়িতে জুমার নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন নগরীর খাতুনগঞ্জের আড়তদার মো. জাহাঙ্গীর আলম। ১৯ ফেব্রুয়ারি মুহাম্মদ হাসান নামে এক যুবলীগকর্মীকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা। ১৫ মার্চ ইফতার মাহফিল নিয়ে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের মারধর ও ছুরিকাঘাতে নিহত হন যুবদল কর্মী কমর উদ্দিন জিতু। ২১ মার্চ পূর্ব গুজরার হোয়ারাপাড়া থেকে রুবেল নামে এক তরুণের লাশ উদ্ধার করা হয়। ১৯ এপ্রিল রাতে যুবদলকর্মী মানিক আবদুল্লাহ ও ২২ এপ্রিল রাউজান উপজেলা সদরের কাছে গাজিপাড়ায় যুবদলকর্মী ইব্রাহিম খুন হন।

জেলা পুলিশের বক্তব্য : জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মোহাম্মদ রাসেল যুগান্তরকে বলেন, ‘উত্তর চট্টগ্রামের রাউজানসহ কয়েকটি উপজেলায় আমাদের বিশেষ অভিযান চলছে। প্রতিটি খুনের ঘটনায় বেশির ভাগ আসামি আমরা গ্রেফতার করেছি। প্রতিটি ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছি। আসামিদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’

কেরানীগঞ্জে গুলি-কুপিয়ে হত্যা

এলেক্স ইমন হত্যার বদলা নিতেই ফরহাদকে খুন

ঢাকার কেরানীগঞ্জে সেলুনে ঢুকে ফিল্মি স্টাইলে মো. ফরহাদ হোসেন (২৩) নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পুরোনো বিরোধের যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে পুলিশ। মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারকেন্দ্রিক দুই অপরাধীচক্রের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড বলে প্রাথমিক ধারণা পুলিশের। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

নিহতের মা নাছিমা বেগম বাদী হয়ে বুধবার কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় আসামি হিসাবে সাব্বির, সোহেল, আরমান, রমিজ হোসেন ও সজিব ওরফে পিচ্চি সজিবের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৭-৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, নিহত ফরহাদ মোহাম্মদপুরের একটি অপরাধীচক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কয়েক মাস আগে ওই গ্রুপের প্রধান হিসেবে পরিচিত এলেক্স ইমন নিহত হওয়ার পর ফরহাদ গ্রুপটির নেতৃত্বে আসেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। এরপর প্রতিপক্ষ পাটালী গ্রুপের সঙ্গে তাদের বিরোধ আরও বাড়ে। সেই বিরোধের জেরেই ফরহাদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে পুলিশ মনে করছে।

কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিলুল হক বলেন, মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের একাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিতেন এলেক্স ইমন। কিছুদিন আগে পাটালী গ্রুপের সদস্যরা তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। ফরহাদ ছিলেন ওই গ্রুপের সদস্য। ইমন নিহত হওয়ার পর ফরহাদ গ্রুপটির নেতৃত্বের আসনে জায়গা করে নেন। আর এ কারণেই ইমনকে যে কায়দায় যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল, ঠিক সেই একই কায়দায় ফরহাদকে হত্যার ছক কষা এবং তা বাস্তবায়ন করা হয়। পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা হচ্ছে। আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

এদিকে মামলার এজাহারে ফরহাদের মা নাছিমা বেগম অভিযোগ করেছেন, ২০১৮ সালে সাব্বিরের নেতৃত্বাধীন গ্রুপের কয়েকজনকে অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে তার ছেলের সঙ্গে আসামিদের বিরোধের সৃষ্টি হয়। ২০১৯ সালের মার্চে ওই বিরোধের জেরে ফরহাদকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। ওই ঘটনায় তিনি মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেছিলেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করেন।

নাছিমা বেগমের অভিযোগ, ওই ঘটনার পর থেকেই আসামিরা তার ছেলেকে হত্যার চেষ্টা করে আসছিল। ছেলেকে নিরাপদ রাখতে পরে মোহাম্মদপুর থেকে কেরানীগঞ্জের আরশিনগরে বাসা ভাড়া করে দেন তিনি। পাঁচ-ছয় মাস ধরে ফরহাদ সেখানেই বসবাস করছিলেন।

মঙ্গলবার বেলা ৩টার দিকে আরশিনগরের ‘রাজ বারবার জোন’ সেলুনে চুল কাটাতে গেলে কয়েকজন যুবক তাকে ঘিরে ধরে। এ সময় তাকে গুলি করার পর সেলুনের বাইরে নিয়ে চাপাতি দিয়ে কোপানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। জনবহুল এলাকায় দিনের বেলায় সেলুনের ভেতরে গুলি এবং বাইরে প্রকাশ্যে চাপাতি দিয়ে হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

এর আগে ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার-বুদ্ধিজীবী রোড এলাকায় দুই গ্রুপের সংঘর্ষে এলেক্স ইমন নিহত হন। সেই হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাসের মধ্যেই তার ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত ফরহাদ মঙ্গলবার কেরানীগঞ্জে একই ধরনের হামলায় নিহত হলেন। ফলে পুরোনো ওই বিরোধের নতুন করে বিস্তার নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ।

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি রুহুল কুদ্দুস বলেন, ফরহাদের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানায় হত্যা, মাদক, দস্যুতাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতারে পুলিশ কাজ করছে।

ফয়সালের বাবার আহাজারি

আমার ছেলে চোর না, ফজরের পর কাজে বেরিয়েছিল

কক্সবাজারের মহেশখালীতে চোর সন্দেহে খুঁটিতে বেঁধে মো. ফয়সালকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ওই এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নিহত যুবক চোর ছিলেন না দাবি করে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চেয়েছেন তার বাবা নুরুল আলম। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এমন বর্বরোচিত হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিও। এদিকে ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, জড়িত সন্দেহে একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মঙ্গলবার সকালে উপজেলার বড় মহেশখালী ইউনিয়নের পূর্ব ফকিরাঘোনা এলাকার মিয়াজির পাড়ায় মাওলানা কেফায়েত উল্লাহর বাড়িতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত ফয়সাল একই এলাকার বাসিন্দা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ফয়সালকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে একদল কিশোরকে মারধর করতে দেখা যায়। তার পিঠে ইট দিয়ে আঘাতের দৃশ্যও রয়েছে এতে।

ফয়সালের বাবা নুরুল আলম কান্নাজড়িত কণ্ঠে যুগান্তরকে বলেন, আমার ছেলেটা চোর না। আমার সঙ্গে সড়কের শ্রমিকের কাজ করত। ফজরের পর কাজে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর শুনি, তাকে চোর সন্দেহে ধরে মারধর করা হয়েছে। হাসপাতালে গিয়ে দেখি, আমার ছেলে আর বেঁচে নেই।

তিনি বলেন, একজন বাবা কীভাবে এটা মেনে নেবে? আমার ছেলে কোনো অপরাধ করে থাকলে পুলিশে দিত। কিন্তু তাকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে ইট দিয়ে পিটিয়ে মারতে হবে কেন? যারা আমার ছেলেকে এভাবে মেরেছে, আমি তাদের বিচার চাই।

মহেশখালী থানার ওসি মোহাম্মদ আব্দুস সুলতান বলেন, মিয়াজির পাড়ায় মাওলানা কেফায়েত উল্লাহর ঘর ও সংলগ্ন স্টিলের আসবাবপত্রের কারখানায় চুরির উদ্দেশ্যে ঢুকেছিল-এমন সন্দেহে ফয়সালকে আটক করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ফয়সালকে মারধর করে বেঁধে রাখা হয়েছিল। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

মারধরের ঘটনায় ওই বাড়ির এক যুবককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে জানিয়ে ওসি আরও বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও আটকের চেষ্টা চলছে।

বড় মহেশখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনায়েত উল্লাহ বাবুল জানান, তিনি যতটুকু জানতে পেরেছেন, চোর সন্দেহে ফয়সালকে ধরে মারধর করা হয়েছিল। চুরির অভিযোগ সত্য হলেও এভাবে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। চেয়ারম্যান বলেন, চুরি করলেও এভাবে মেরে ফেলা যায় না। তার মতে, কেউ অপরাধ করলে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া উচিত। এদিকে ময়নাতদন্তের পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফয়সালের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর স্বজনরা তাকে দাফন করেন। ফয়সালের বাবা নুরুল আলম জানান, থানায় মামলা করবেন তিনি। তবে বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত মামলা হয়নি বলে জানান মহেশখালী থানার ওসি মোহাম্মদ আব্দুস সুলতান।

‘গুলি কর’ বলে অস্ত্র নিয়ে হামলা

বেগমগঞ্জে আহত ৪

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আমান উল্ল্যাহপুর ইউনিয়নের লাকুড়িয়াকান্দি গ্রামে জমি নিয়ে দুই ভাইয়ের বিরোধের জেরে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। হামলায় নারীসহ চারজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ।

বুধবার ভোরে আমান উল্ল্যাহপুর ইউনিয়নে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। এর আগে মঙ্গলবার রাতে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে হামলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় রাতে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করা হয়েছে।

আটক ব্যক্তিরা হলেন-লাকুড়িয়াকান্দি গ্রামের মজিব উল্যাহ, তার ছেলে তোফায়েল আহমদ ও মেয়ের জামাই ইসরাফিল।

পুলিশ জানায়, লাকুড়িয়াকান্দি গ্রামের শরীফ উল্যাহর সন্তানদের সঙ্গে জমি নিয়ে তার ভাই মজিব উল্যাহর দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। এ বিরোধের জেরে তাদের মধ্যে বেশ কয়েকবার ঝামেলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সালিশ বৈঠকও হয়।

মঙ্গলবার দুপুরে জমি দখলের জন্য মজিব উল্যাহর একটি ঝুপড়ি ঘর ভাঙতে যান শরীফ উল্যাহর ছেলে মোবারকসহ পরিবারের লোকজন। এ সময় তাদের বাধা দিতে গেলে মজিবের মেয়ে শারমিনের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতি হয়। এতে শারমিন আঘাতপ্রাপ্ত হন।

খবর পেয়ে শারমিনের স্বামী ইসরাফিল কয়েকজন অস্ত্রধারী বন্ধুকে নিয়ে মোবারকের পরিবারের লোকজনের ওপর হামলা চালান। এ সময় তারা নারীসহ তিনজনকে পিটিয়ে আহত করেন এবং কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করার চেষ্টা করেন। এ সময় মোবারকদের বসতঘরে ভাঙচুর করা হয়।

বেগমগঞ্জ থানার ওসি শামসুজ্জামান বলেন, খবর পেয়ে ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এ ঘটনায় মোবারক উল্যাহ বাদী হয়ে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ১০-১৫ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। ওই মামলায় এজাহারভুক্ত তিন আসামিকে আটক করা হয়েছে। বাকিদের আটকে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আটক ব্যক্তিদের বুধবার আদালতে পাঠানো হয়েছে।