Image description

চব্বিশের জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময়ের বিভিন্ন ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একের পর এক রায় দিচ্ছেন। দুটি ট্রাইব্যুনাল থেকে এখন পর্যন্ত ৭ মামলায় ৬৮ জনকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে এসব আসামির মধ্যে দণ্ডিত ৪৮ জনই পলাতক। অন্যদিকে কুষ্টিয়ার ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটি বর্তমানে রায়ের অপেক্ষায়। সব মিলিয়ে দুই ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচার পর্যায়ে রয়েছে আরও ২১ মামলা। দণ্ডের পাশাপাশি তিনটি মামলার রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আটজনের সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে জুলাই শহীদ পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রায় ঘোষণার পর সামনে এসেছে বড় এক আইনি জটিলতা। আইন থাকলেও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া না থাকায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

প্রসিকিউশন সূত্র বলছে, গণ অভ্যুত্থানের ঘটনার সাত মামলায় এখন পর্যন্ত ২২ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। এদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ এসেছে পৃথক দুই

রায়ে। অন্যদিকে গত মঙ্গলবার দেওয়া রায়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ এবং যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করে গণ অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার ও আহতদের কল্যাণে ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু কোন কর্তৃপক্ষ কীভাবে সম্পত্তি জব্দ করবে, কীভাবে মূল্যায়ন হবে, কীভাবে বিক্রি বা হস্তান্তর করা হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে কী পদ্ধতিতে বণ্টন হবে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন বা কার্যবিধিতে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। রায়েও এসব বিষয়ে কিছুই বলা নেই। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ১১(৯) ধারায় ট্রাইব্যুনালকে অভিযুক্তের সম্পদ জব্দ (ফ্রিজ) বা বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পলাতক হওয়া ঠেকানো, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ আদায় এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে এ আদেশ দেওয়ার বিষয়টি আইনে উল্লেখ আছে। এ ছাড়া আইনের ২০ (ক) ধারায় ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দণ্ডিত ব্যক্তির বর্তমান বা ভবিষ্যতে অর্জিত সম্পদ থেকেও ক্ষতিপূরণ আদায় করা যাবে এবং এ ক্ষতিপূরণের দাবি অন্য যেকোনো দাবির তুলনায় অগ্রাধিকার পাবে।

ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থও হয়েছে প্রসিকিউশন : এ জটিলতা কাটাতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছেও নির্দেশনা চেয়েছে প্রসিকিউশন। আসামির সম্পদ কীভাবে বাজেয়াপ্ত এবং তা কীভাবে ভুক্তভোগীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে, এ বিষয়ে গত ১৩ আগস্ট ট্রাইব্যুনাল-২ এর কাছে নির্দেশনা চেয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধিতেও এ বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই। ফলে দণ্ডিত আসামিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হলেও, তা কার্যকর করা যাচ্ছে না। পরে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের রায় কার্যকর করার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের কার্যবিধি সংশোধন করতে উদ্যোগ নেওয়ার আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এর আগে ট্রাইব্যুনাল-১ এর নির্দেশনা চাওয়া হলে, সেখান থেকেও কার্যবিধি সংশোধনের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আদেশই দেওয়া হয়েছে বলে সেদিন জানিয়েছিলেন চিফ প্রসিকিউটর।

যা বললেন চিফ প্রসিকিউটর: ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধি সংশোধনের বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এ বিষয়টা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে প্রচলিত আইনেও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের রায় সরকার বাস্তবায়ন করতে পারবে। পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্টে সরকারকে সেই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘রায়ের পর আইন অনুযায়ী ৩০ দিন পর্যন্ত আপিলের সময়সীমা থাকে। এই সময়ে কোনো সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা অন্য কোনো ব্যবস্থায় যাওয়ার হয়তো সুযোগ নেই। কিন্তু ৩০ দিন পার হওয়ার পর এই রায় বাস্তবায়নে আইনগত কোনো বাধা থাকবে না।’

রায়ের অপেক্ষায় হানিফের মামলা : কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফসহ চার আসামির রায় যেকোনো দিন ঘোষণার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ১০ জুন ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদেশ দেন। মামলার অন্য আসামিরা হলেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। চারজনই বর্তমানে পলাতক।

৬৮ জনের সাজা : ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত সাতটি মামলার রায়ে ৬৮ জন বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত হয়েছেন। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে তিন মামলার রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল ও পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ ১৫ জন দণ্ডিত হয়েছেন। এই তিন মামলায় পলাতক আছেন ১০ জন। অন্যদিকে চার মামলার রায়ে ৫৩ জনকে সাজা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-২। এর মধ্যে পলাতক রয়েছেন ৩৯ আসামি। দুই ট্রাইব্যুনাল মিলিয়ে পলাতক আসামি ৪২ জন হলেও ডিএমপির সাবেক পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান একাই দুই মামলায় দণ্ডিত হয়েছেন। পলাতকদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী।