Image description

নিষ্পাপ শিশুরা তাদের পরিচিত মানুষের দ্বারাই পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নিজের ঘর, দোকান, পরিত্যক্ত ভবন, স্কুল ও মাদ্রাসাতে এসব ঘটনা ঘটছে। যুক্ত থাকছে প্রতিবেশী, পরিবারের সদস্য, নিকটআত্মীয়, শিক্ষক, দোকানদার, নৈশপ্রহরী এবং স্থানীয় প্রভাবশালীরা। পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্র বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছে, গত চার বছর ৭ মাসে মোট ধর্ষণের মামলা হয়েছে ৩৪ হাজার ৯২২টি। এর মধ্যে শিশু ধর্ষণের মামলা হয়েছে ১১ হাজার ৭৪৪টি। শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘শিশুরাই সব’ এর তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩৩৬ জন শিশু।

পুলিশ সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল (জানুয়ারি-জুলাই) পর্যন্ত সাত মাসে মোট ধর্ষণের মামলা হয়েছে ৩৪ হাজার ৯২২টি। আর এর মধ্যে শুধু শিশু ধর্ষণের জন্য মামলা হয়েছে ১১  হাজার ৭৪৪টি। পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘ধর্ষণ মামলা নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে খুবই স্পর্শকাতর। এজন্য মামলাগুলোর তদন্তে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জিডি ও পুলিশের কাছে রিপোর্ট করার প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে। এজন্য এসব ঘটনায় মামলার সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এ জাতীয় ঘটনায় তদন্ত করাই মূল লক্ষ্য। তবে অপরাধ কমাতে সামাজিক সচেতনতা দরকার। শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত বড় একটি অংশই আপনজন, পারিবারের সদস্য এবং পরিচিত লোকদের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়। এজন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে এ অপরাধ কমে আসতে পারে বলে আশা করছি।’ এদিকে ‘শিশুরাই সব’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ৬ মাসে (জানুয়ারি-জুন) ৩৩৬টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে মেয়ে শিশু ১২৭, ছেলে শিশু ২৪। তবে প্রতিবেদনে ১৮৫ শিশুর লিঙ্গ পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। এর আগে ২০২৫ সালে পুরো বছরে ৩০৮টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল। 

অর্থাৎ চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে শিশু ধর্ষণের ঘটনা গত বছরের চেয়ে বেশি ঘটেছে। ধর্ষণের ক্ষেত্রে ৭ থেকে ১২ বছর বয়সি শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। প্রতিবেদন বলছে, শূন্য থেকে ৬ বছর বয়সি শিশুরা ঝুঁকিতে। ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি কিশোর-কিশারীরা বেশি ধর্ষণের শিকার হয়। এই শিশুদের মধ্যে ৩০০-এর অধিক সংখ্যক একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৩৩৬ শিশুর মধ্যে ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে দুজন, গর্ভধারণ করেছে ১১ জন, আর হত্যার শিকার হয়েছে ৩২ জন। এ শিশুদের মধ্যে ১৬ জন প্রতিবন্ধী শিশু।

কৌশল : ‘শিশুরাই সব’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে অপরাধীরা বেশ কিছু কৌশল গ্রহণ করে। যেমন শিশুদের খাবারের লোভ দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয়। একা পেয়েও শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। খেলার সময় কৌশলে ডেকে নিয়ে এবং কিছুক্ষেত্রে ভয় দেখিয়ে বা ব্ল্যাকমেল করে ধর্ষণ করা হয়।

স্থান : সাধারণত এ ধরনের নির্যাতন বেশি ঘটে ব্যক্তিগত স্থানে। বিশেষ করে ঘর, পরিচিত সামাজিক ও পারিবারিক পরিবেশে। অনেক ঘটনা ভুক্তভোগীর নিজের ঘরে, অপরাধীর বাসায়, নির্জন মাঠে, দোকান ও পরিত্যক্ত ভবনে ঘটে। এ ছাড়া স্কুল ও মাদ্রাসাতেও ঘটনা ঘটছে, যেখানে শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট কর্মীরা অপরাধে জড়িত।

অপরাধী পূর্ব পরিচিত : প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে অধিকাংশ অপরাধীই শিশুর পূর্বপরিচিত। তারা শিশুর প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক, দোকানদার, নৈশপ্রহরী এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি। অপরিচিতিদের জড়িত থাকার হার তুলনামূলক কম। অপরাধীদের বয়স ২০ থেকে ৬০ বছর বা তার বেশি। তাদের মধ্যে ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সিরা সবচেয়ে বেশি শিশু ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত।

হয় না চূড়ান্ত সাজা : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হলেও, খুব কম ক্ষেত্রেই অপরাধীর চূড়ান্ত সাজা বা দণ্ডদেশ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। যেমন ৩৩৬টি ঘটনায় ২২৯টি মামলা হয়। এর মধ্যে ৭৭টির মামলা প্রক্রিয়াধীন আছে, আর ৩০টি ক্ষেত্রে অভিযোগই করা হয়নি। এ ছাড়া ২৬২ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়, তাদের মধ্যে ১৯ জন অভিযুক্ত।

এলিনা খানের ভাষ্য : বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘নারী ও শিশু ধর্ষণ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। পুলিশ প্রশাসন এ ব্যাপারে কঠোর হয়ে এলাকাভিত্তিক জনমত গঠন করতে পারত। এটা হলে অনেক আগেই এ ধরনের অপরাধ কমে আসত।’ তিনি আরও বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে কোনো শিশু ধর্ষণের শিকার হলে ভুক্তভোগীর পরিবার এই ঘটনা চেপে রাখে। এর বাইরে টাকা পয়সা দিয়ে ঘটনা চাপা দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। বিশেষ করে মীমাংসা করতে গিয়ে ভুক্তভোগীর পরিবার যখন টাকা পায় না, তখনই কেবল তারা পুলিশের কাছে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এসব ঘটনায় সরকার থেকে বাধ্যতামূলকভাবে জেলা প্রশাসক ও ইউএনদেরকে মাঠপর্যায়ে গিয়ে ঘটনা তদারকি করার জন্য দায়িত্ব দিতে হবে। ধর্ষণের মামলা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য চাপ থাকলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। জবাবদিহির ব্যবস্থাও করতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কাউকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে, তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’