জনবল ঘাটতি, আবাসনসংকট, স্বাস্থ্যসেবার অভাব এবং ক্যান্টিনে অপরিচ্ছন্ন ও নিম্নমানের খাবার সমস্যায় ধুঁকছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এসব সংকট সমাধানে প্রশাসনের নিয়মিত আশ্বাস ও কিছু উদ্যোগ থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে ভোগান্তি প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে।
জানা গেছে, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুুস সোবহানের বিরুদ্ধে নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২০ সালে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর ফলে দীর্ঘদিন নিয়োগ বন্ধ থাকে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকট হয় জনবলসংকট। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে উল্লিখিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করায়। এরপর লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে ১৫৪ জন শিক্ষক নিয়োগ দেয় সালেহ ড. হাসান নকীব প্রশাসন। এ ছাড়া বিভিন্ন দপ্তরে দৈনিক মজুরি ভিত্তিক তিন শতাধিক কর্মচারীরও নিয়োগ দেওয়া হয়। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এই নিয়োগের পরও স্থায়ী পদে প্রায় ২০০ জন শিক্ষক, ২০০ জন কর্মকর্তা ও ৫০০ কর্মচারীর পদ শূন্য রয়েছে।
এদিকে নতুন চালু হওয়া টুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, মাইক্রোবায়োলজি ও চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকসংকটে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এসব বিভাগে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র ১৫ জন। টুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সভাপতি জাহিদ হাসান এ বিষয়ে বলেন, ‘প্রচণ্ড চাপে আছি। বিভাগে ৩০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক মাত্র তিনজন। অতিরিক্ত ক্লাস নিতে গিয়ে কোয়ালিটি এডুকেশন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে বহুবার জানানো হয়েছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের পরিচালক ড. আবু রেজা বলেন, ‘লোকবল সংকট দ্রুত নিরসনে প্রশাসন কাজ করছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান ঠিক রাখতে যোগ্য ও দক্ষ লোকবল নিয়োগের বিকল্প নেই।’
উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘জনবলসংকট নিরসনে আমরা কাজ শুরু করেছি। দ্রুতই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করা হবে। অন্য সমস্যা নিয়েও কাজ করছি।’
সেবা মিলছে না মেডিকেল সেন্টারে : বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে লোকবল সংকটে কাক্সিক্ষত চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। মেডিকেল সেন্টারটিতে ৩৬টি চিকিৎসক পদের স্থলে আছেন ১৭ জন। ফিজিওথেরাপিস্ট না থাকায় টেকনিশিয়ান দিয়ে চলছে ইউনিট। অ্যাম্বুলেন্স চালকও নেই। অবসরপ্রাপ্তদের ধরে এনে চালানো হচ্ছে কাজ। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে এলে পাঠানো হয় রাজশাহী মেডিকেলে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী সুরভী আক্তার বলেন, ‘মাত্র একজন গাইনি চিকিৎসক এক শিফটে থাকেন। মাঝে মধ্যে ছুটিতে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৫ হাজার ছাত্রী। দরকারের সময় চিকিৎসা পাওয়া যায় না।’ মেডিকেল সেন্টারের চর্মরোগ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, অত্যন্ত ছোঁয়াচে চর্মরোগ স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮-১০ জন চিকিৎসা নিতে আসছে। চর্ম চিকিৎসক ডা. মাশিউর আলম বলেন, ‘স্ক্যাবিসে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ছাত্রীই বেশি। বিশেষ করে গণরুমে গাদাগাদি করে থাকায় এ সমস্যা বাড়ছে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, গত ছয় বছরে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষার্থী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন। এই কেন্দ্রের কো-অর্ডিনেটর মেহেদী হাসান জানান, ‘বিষণ্নতা, নিদ্রাহীনতা, আর্থিক চাপ ও পারিবারিক সমস্যাসহ নানা সমস্যা নিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৫-২০ জন সেবা নিতে আসছেন।’ মেডিকেল সেন্টারের পরিচালক ডা. মাফরুহা সিদ্দিকা লিপি বলেন, ‘অবকাঠামো আছে। প্রতিদিন সেবাও প্রদান করা হচ্ছে। তবে কিছু জায়গায় লোকবল সংকটের কারণে কাক্সিক্ষত সেবা নিশ্চিত হচ্ছে না। প্রশাসনকে বিষয়টা জানানো হয়েছে।’
আবাসনসংকট : বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সাত দশকেও কাটেনি আবাসনসংকট। প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে ১৭টি হল। এতে মাত্র ১০ হাজার জনের আবাসন সুবিধা মিললেও ৭০ শতাংশই এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। হলে সিট পেলেও ছাত্রীদের ভোগান্তির শেষ নেই। হলে উঠে দেড়-দুই বছর গাদাগাদি করে থাকতে হয় গণরুমে। এতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মানসিক ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি। এদিকে আবাসনসংকট নিরসনে ছাত্রীদের জন্য শেখ হাসিনা হল ও ছাত্রদের জন্য বিজয়-৭১ হলের নির্মাণ কাজ ২০১৭-২২ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় তা হয়নি। এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় শেরেবাংলা হল ও মন্নুজান হল ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। যদিও গত বছরের শেষে সিন্ডিকেটের সভায় নতুন ছয়টি আবাসিক হল নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে এগুলো কবে হবে- তা নিয়ে সন্দিহান শিক্ষার্থীরা।
রাকসু ভিপি মোস্তাকুর জাহিদ বলেন, ‘আবাসনসংকট নিরসন জরুরি। এই সংকট রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নত শিক্ষা কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয়। বহু শিক্ষার্থী আর্থিকসংকটে দিনাতিপাত করছে। এত চাপ নিয়ে সৃজনশীল চিন্তা করা সম্ভব না।’
নামেই ‘ক্যাশলেস’ ক্যাম্পাস : গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাশলেস ক্যাম্পাস হিসেবে যাত্রা শুরু করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইসলামী ব্যাংক ও মাস্টারকার্ড যৌথভাবে এ উদ্যোগ নেয়। তবে ১ বছর পরও সেবা ক্যাশনির্ভরই আছে। ফরম ফিলাপ থেকে শুরু করে অন্যান্য ফি প্রদান ব্যাংকের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েই করতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেন্টারের পরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হাসনাত কবীর বলেন, ‘ডিজিটাল সময়ে ক্যাশলেস ক্যাম্পাস জরুরি। তবে নানা জটিলতায় এই প্রক্রিয়াটা আটকে আছে।’
খাবার নিয়ে অভিযোগ : বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে নিম্নমানের খাবারের সমস্যা দীর্ঘদিনের। এ নিয়ে বহুবার আন্দোলন করেছেন শিক্ষার্থীরা। ফল হিসেবে উল্টো খাবারে দাম বাড়লেও মান বাড়েনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী জন্ডিস, টাইফয়েড ও ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হন। মেডিকেল সেন্টারের পরিচালক ডা. মাফরুহা সিদ্দিকা লিপি জানান, ‘পানি বাহিত রোগ বিশেষ করে টাইফয়েড, ডাইরিয়া ও জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে প্রায়ই রোগী আসে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পানি ও খাদ্য নিশ্চিত করা না গেলে এ সমস্যা কমবে না।’
অভিযোগ থেকে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ আবাসিক হলের ট্যাংক দীর্ঘদিন পরিষ্কার করা হয় না। অনেকসময় জীবজন্তুও মরে পানিতে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ক ড. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ট্যাংকগুলো ২-৩ মাস পরপর পরিষ্কার করা উচিত। তবে সেটা বছরেও হয় না। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানালেও তারা সময়মতো আসে না।’