Image description

সারা দেশে বছরের পর বছর রেলওয়ের জমিতে দখলদারদের রাজত্ব চলছে। রেলের মোট ৩১ হাজার ৮৬০ একর জমির মধ্যে ৩ হাজার ২৪ দশমিক ৮৪ একর জমি দখলদারদের কবজায়। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ৩১৬ দশমিক ১৯ একর এবং পশ্চিমাঞ্চলে ২ হাজার ৭০৮ দশমিক ৬৫ একর জমি বেদখল হয়ে আছে। দখল হওয়া এসব জমিতে কোথাও গড়ে উঠেছে দোকানপাট, কোথাও বসতি, আবার কোথাও চলছে বাণিজ্যিক কার্যক্রম। অনেক জায়গায় আবার রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ও আছে। অভিযোগ আছে, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় দিনের পর দিন চলছে এই দখল। সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে থামছে না দখলদারদের রাজত্ব। 

রেলওয়ে সূত্রমতে, রেলের পূর্বাঞ্চলের দখল হওয়া জমির মধ্যে ১২২ দশমিক ৬ একর জমি ঢাকা বিভাগে এবং ১৯৩ দশমিক ৫৯ একর জমি চট্টগ্রাম বিভাগে। পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে ১ হাজার ১৭৬ দশমিক ৩৭ একর জমি লালমনিরহাট অঞ্চলে এবং ১ হাজার ৫৩২ একর জমি পাকশী অঞ্চলে। অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি জমি বেদখল হয়েছে পাকশী অঞ্চলে।

রেলের জমিঘটনা এক. রাজধানী ঢাকার প্রথম রেলস্টেশন ফুলবাড়িয়ায় রেলওয়ের ৩ দশমিক ৯৭ একর জমি বেদখল হয়ে আছে। চার দশকেও তা উদ্ধার করা যায়নি। কর্তৃপক্ষেরও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।  

ঘটনা দুই. রাজশাহীর গোদাগাড়ী সেকশন রেললাইনটি ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরপর বন্ধ হয়ে যায়। ১৯২৩ সালে নির্মিত ২৫ দশমিক ৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেকশনে রেলের জমির পরিমাণ ৭২০ একর। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এ জমির এক ছটাকও রেলের হাতে নেই। পুরোটাই বেদখলে আছে। আইন না থাকলেও এসব জমি একের পর এক হাতবদল হচ্ছে।

রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা বলছেন, দখলদারদের বেশির ভাগের সঙ্গেই রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক আছে। এ কারণেই অধিকাংশ সময় দখলমুক্ত করা যায় না। তবে রেলওয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশেও জমি দখলের অভিযোগ আছে। বিশেষ করে রেলের শ্রমিক নেতাদের কারণে অনেক জায়গাই দখলমুক্ত করা যায় না।

রাজধানী ও আশপাশের চিত্র : নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা আসার পথে জুরাইন রেলগেটের দুই পাশে জুরাইন নিউ সুপার মার্কেট এবং জুরাইন রেলওয়ে বাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির প্রায় ৪০০ দোকান গড়ে উঠেছে। রেলওয়ের মালিকানাধীন এ জায়গায় একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা পুনরায় দখল হয়ে যায়। সায়েদাবাদ থেকে জুরাইন পর্যন্ত পুরো এলাকাজুড়েই একই চিত্র।

নারায়ণগঞ্জ থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার রেললাইনের দুই পাশের ১৭২ একর জমি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দখলে চলে গেছে। এই রুটে অর্ধশতাধিক ছোটবড় বাজার গড়ে উঠেছে। জাল দলিল ও ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে বহুতল ভবনও নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিমানবন্দর ও তেজগাঁও রেলস্টেশন এলাকায় ১৯ একর এবং নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনের বাইরে ২৯ একর জমি বেদখলে রয়েছে। তেজগাঁও রেলওয়ে বস্তিতে প্রায় আড়াই হাজার ঝুপড়ি ঘর থেকে একটি চক্র নিয়মিত ভাড়া তুলছে। খিলগাঁও রেলওয়ে ক্রসিংয়ের দুই পাশে ৩ শতাধিক অবৈধ দোকানপাট রয়েছে। সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সময় একবার এসব উচ্ছেদ করা হলেও পরবর্তীতে তা পুনরায় দখল হয়ে যায়। একইভাবে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেললাইনের দুই পাশ, সিলেটের শায়েস্তাগঞ্জ এবং জামালপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় একই অবস্থা চলছে।

নিরাপত্তা ঝুঁকি ও আইন অমান্য : নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো দুর্ঘটনা এড়াতে ও বাড়তি সতর্কতার জন্য রেললাইনের উভয় পাশে ১০ ফুট জায়গা ফাঁকা রাখার বিধান রয়েছে। অথচ রাজধানীসহ দেশের জেলা শহরগুলোতে এ নিয়মের কোনো বালাই নেই। ঢাকা অঞ্চলের নারায়ণগঞ্জ, গেন্ডারিয়া, শ্যামপুর, জুরাইন, শাহজাহানপুর, মালিবাগ, মগবাজার, কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও, নাখালপাড়া, উত্তরা এবং টঙ্গীর বিভিন্ন অংশে রেললাইনের দুই ধারে বস্তি, দোকান, বাজার, ছাপড়া ঘর এবং রাজনৈতিক দলের নামে-বেনামে পাকা ও আধা-পাকা স্থাপনা গড়ে উঠেছে। অনেক স্থানে এই জমি দখল করে সরকারি-আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান এমনকি বাস ও ট্রাকের স্ট্যান্ডও তৈরি করা হয়েছে।

দখল টিকিয়ে রাখতে আইনি মারপ্যাঁচ ও জনবলসংকট : রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে চাইলেও নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে দখলদাররা আদালতে মামলা করে এবং স্থগিতাদেশ নিয়ে নিজেদের দখল পাকা করে তোলে। ঢাকায় রেল ভবনে রেলের জমি নিয়ে চলমান মামলার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও ভূ-সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের ধারণা, মামলার সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাবে।

আইনজীবীর সম্মানি মাত্র ৩২ টাকা : মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ধরনের সমস্যা। রেলের নিয়োজিত আইনজীবীরা মামলা পরিচালনার জন্য মাত্র ৩২ টাকা দৈনিক সম্মানি পান। এ কারণে দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইনজীবী রেলের পক্ষে মামলা লড়তে আগ্রহ দেখান না। এমনকি রেলের আইনজীবীদের একটি অংশের বিরুদ্ধে আদালতে দখলদারদের পক্ষ নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।

ইজারা দেওয়া জমিও বেহাত : রেলের ইজারা দেওয়া সম্পত্তির একটি বড় অংশও বেহাত হয়েছে। কৃষিকাজের জন্য ইজারা দেওয়া জমি ব্যবহার করা হচ্ছে বাণিজ্যিক কাজে। এসব জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবন ও মার্কেট। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামেও রেলের জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী সেকশনে রেলের মোট জমির পরিমাণ ৭২০ একর। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ এ জমির এক ছটাকও রেলের হাতে নেই। পুরোটাই বেদখলে আছে। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ রেলওয়ের অনুমোদন না নিয়েই আমনুরা-গোদাগাড়ীর রেলবাজার পর্যন্ত পরিত্যক্ত লাইনটির ওপর দিয়ে পাকা সড়ক করেছে।

আমনুরা-গোদাগাড়ী সেকশনের দিগরাম-ঘুণ্টিঘর এলাকায় রেলের একটি বড় পুকুর অবৈধভাবে দখল ও ভরাট করে প্লট আকারে বিক্রি করছেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ইসরাইল মোড়ল ও তার সহযোগীরা। ৩ লাখ টাকা কাঠা করে প্লট বিক্রি করছেন তিনি। রেলের জমি প্লট করে বিক্রি করলেও পশ্চিম রেলের ভূ-সম্পত্তি বিভাগ খবরই পায়নি। এভাবেই পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে রেলের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি বেদখল হয়ে গেছে।

পশ্চিম রেলের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা গোলাম সারওয়ার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অবৈধ দখলদারের বিরুদ্ধে রেলওয়ে অভিযান চালায়। যখন খবর পাওয়া যায় কোথাও দখল হচ্ছে, সেখানেই অভিযান চালানো হয়। আবার অনেক জায়গায় উচ্ছেদ অভিযানে গেলেই দখলদাররা আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে হাজির হন।

জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরীর বাণিজ্যিক এলাকায় রয়েছে রেলওয়ের একটি ডেবা, যেটি ‘আগ্রাবাদ ডেবা’ নামে পরিচিত। ২৭ একরের বেশি আয়তনের ডেবাটির চারপাশ দখল করে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে কাঁচা-পাকা শত শত ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। বিগত সময়ে বেশ কয়েকবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেও ফের নতুন করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা। এসব স্থাপনার কারণে ভরাট হয়ে যেতে বসেছে ২৭ একরের বৃহত্তম এই জলাশয়টি। একই সঙ্গে ময়লা-আবর্জনায় ডেবাটির পানি দূষিত হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এসব অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করে ভাড়া দিয়ে নির্বিঘ্নে রেলওয়ের জায়গায় নিজেরা জমিদার বনে গেছেন। এমনচিত্র রেলওয়ের বেশির ভাগ জায়গার।

কর্তৃপক্ষ কী বলছেন : বাংলাদেশ রেলওয়ের উপপরিচালক (ভূ-সম্পত্তি) মো. আবরার হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করি। কিন্তু আবার দখল হয়ে যায়।  রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সবুক্তগীন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কেউ রেলওয়ের সম্পত্তি দখল করে পার পাবে না। আমরা ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছি। 

পশ্চিম রেলের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা গোলাম সারওয়ার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যখন খবর পাওয়া যায় কোথাও দখল হচ্ছে, সেখানেই অভিযান চালানো হয়। আবার অনেক জায়গায় উচ্ছেদ অভিযানে গেলেই দখলদাররা আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে হাজির হন।

এ প্রসঙ্গে রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘রেলের জায়গা দখলমুক্ত করা হবে। যত বড় প্রভাবশালীই হোক, রেলের জায়গা দখল করে রাখতে পারবে না। রেলের জায়গা নতুন করে বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়া হবে না।’

বিশেষজ্ঞ কী বলছেন : ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রেলের জায়গা দখলকারীদের সঙ্গে রেল কর্তৃপক্ষের কারও কারও আঁতাত রয়েছে। আবার ভূমি দখলকারীরা কখনো কখনো ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে আদালতে মামলা করেন। দীর্ঘদিন এ মামলার রায় না হওয়ায় দখলকৃত জায়গা ফেরত পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, দখল হয়ে যাওয়া রেলের জায়গা উদ্ধার করা গেলে রেল সম্প্রসারণে কাজে দেবে। সারা দেশে দখলদারদের তালিকা করা উচিত।