দুর্নীতি দমনে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে সচিবদের নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি। অধীনস্থদের দুর্নীতির বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে না পারলে চেয়ারে থাকার যোগ্যতা নেই বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন সরকারের এই শীর্ষ কর্মকর্তা। সরকার গঠনের প্রায় সাত মাস পর প্রথম সচিব সভায় এসব নির্দেশনা দেন তিনি। গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ ভবনে বিকাল সাড়ে ৪টায় শুরু হয়ে দুই ঘণ্টাব্যাপী এই সভায় বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। সভায় নির্ধারিত চারটি এজেন্ডার বাইরেও নানা বিষয়ে আলোচনা হয় বলে পাঁচজন সচিব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে নিশ্চিত করেছেন।
সচিব সভা সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি নীতিনির্ধারণী বৈঠক। এতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবেরা অংশ নেন।
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, নীতি বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক সমন্বয় নিয়ে এ সভায় আলোচনা হয়।
সভায় অংশ নেওয়া একাধিক সচিব বলেন, আলোচনার বড় অংশ ছিল দুর্নীতি এবং এটির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রসঙ্গে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। সভায় সাতজনের বেশি সচিব নানা বিষয়ে কথা বলেন। দুই মাস পরপর এই সভাটি করার প্রস্তাব দিয়েছেন মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার। দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানান, সচিবদের উদ্দেশে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘সৎ, দক্ষ, ভালো কর্মকর্তা পাওয়া যাচ্ছে না। স্পিকার সম্প্রতি সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যেটি বলেছেন, সেটি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং ওনার জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষার আলোকে বলেছেন। ওনার মতো সম্মানি ব্যক্তি হুট করে কথাটি বলেননি। আমরা নিজেদের মূল্যায়ন করি। আমাদের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কি আমরা কোনো ব্যবস্থা নিয়েছি? আমরা দুর্নীতিবাজদের দেখছি কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছি না? অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান দপ্তর সংস্থাগুলোর নামে প্রচুর দুর্নীতির অভিযোগ আসে। আমরা দেখেও দেখি না। যদি এই দুর্নীতি বা এসবের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখতে না পারি তাহলে চেয়ারে থাকার যোগ্যতাও নেই।’
জানা গেছে, দুর্নীতির আলোচনার মধ্যে দুদক সচিব সাইদুর রহমান বলেন, নতুন কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সৎ-যোগ্য লোক দিয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি করা হবে। কমিশন থেকে চিঠি পাঠানো হচ্ছে।
দুর্নীতির আলোচনার মধ্যে মুখ্য সচিব বলেন, কয়েকজন সচিবকে নিয়ে আলাদা বসা হবে; যাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ আছে দায়িত্বে অবহেলার। প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানান তিনি। তবে কোন কোন সচিব, সে নাম বলেননি তিনি। সভায় জ্বালানিনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, এ ছাড়া এলএনজি আমদানিতে দাম বাড়িয়েও পাওয়া যাচ্ছে না এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। এখন থেকেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে জোরালোভাবে কাজ করতে সচিবদের নির্দেশনা দেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। বিদ্যুৎ চাহিদা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিচিত্র জানানো হয়। বর্তমান গ্রীষ্মকালীন সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট থেকে ২০৩০ সালে প্রায় ২৪-২৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হবে। সিস্টেমের গড় বিবেচনায়, ২০৩০ সালে দেশের আনুমানিক বার্ষিক বিদ্যুৎ চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার গিগাওয়াট-ঘণ্টা।
জ্বালানি মিশ্রণের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জন করতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে প্রায় ২৭ হাজার গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসসমূহের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হলো সৌরশক্তি। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সৌরশক্তিভিত্তিক বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেটিও বলা হয় সভায়। সরকারি, বেসরকারি, আবাসিক ও শিল্প খাতের ভবন/স্থাপনার উপযোগী ছাদ ব্যবহার করে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই সব সরকারি প্রতিষ্ঠানকে এখন থেকেই শুরু করার নির্দেশনা দেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। যা দুই মাস পরপর এ-সংক্রান্ত কতটুকু এবং কোন প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করেছে, সে রিপোর্ট নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। সোলার আমদানি করতে ট্যারিফ কমানো হয়েছে বলে জানানো হয় সভায়।
এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে শূন্যপদ পূরণ করতেও নির্দেশ দেন। এ বিষয়েও দুই মাস পর রিপোর্ট নেওয়া হবে কোন প্রতিষ্ঠান কতগুলো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে, সে বিষয়ে। সচিবদের উদ্দেশে নাসিমুল গণি বলেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, একনেক বা অর্থনৈতিক ক্রয়সংক্রান্ত কমিটি থেকে অনেক সময় সামারি ফেরত পাঠানো হয়। কারণ অনেকের সামারিতে সঠিক তথ্য বা পুরো তথ্যটা আসে না। তখন জরুরি হলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না, ফেরত দেওয়া হয়। বিষয়টি সচিবদের বারবার চেক করে সঠিক তথ্য দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশ দেন।
সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এসব নিয়ে যথাযথ এবং সক্রিয়ভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন। সরকারি জমিগুলো নিয়েও নির্দেশ দেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি বলেন, অনেক সরকারি জমি দখল হয়ে যাচ্ছে, এসব নিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। জমি দখলদার হটানো এবং দখলমুক্ত করতে যথাযথ ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন। সরকারি জমি কাজে লাগানোর বিষয়েও নির্দেশ দেন। সরকারি এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠান মামলা না করে সংশ্লিষ্ট সচিবদের আলোচনার ভিত্তিতে সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদের আন্তমন্ত্রণালয় বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটি আছে, সেটি কার্যকর করার কথা বলেন এক সচিব।
জনপ্রশাসন সচিবকে প্রত্যেক মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানের অর্গানোগ্রাম আপগ্রেড করার নির্দেশ দেন। প্রতিষ্ঠানগুলোতে জনবল বাড়লেও অর্গানোগ্রাম আগেরই রয়ে গেছে। এতে কর্মকর্তাদের সংযুক্তি বাড়ছে। তাই সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে বলেন। প্রত্যেক জেলায় ডিসিদের ডেঙ্গু নিয়ে সচেতনতা কার্যক্রম, পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের নির্দেশ দেওয়া হয়। সাধারণত নতুন সরকার গঠনের দুই-তিন মাসের মধ্যে সচিব সভা আহ্বানের ঐতিহ্য অতীতে দেখা গেলেও এবার বছরের প্রথমার্ধ পেরিয়ে যাওয়ার পর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এই সভাটি অনুষ্ঠিত হলো।