Image description

‘হাকালুকি হাওরে আগের মতো মাছ মেলে না। হাওরের পানির নিচে হাত দিলেই শুধু প্লাস্টিক হাতে আসে। হাওরের গভীরতা অনেকটাই কমে গেছে। আগে যে জায়গায় ১৫-২০ ফুট গভীর পর্যন্ত পানি ছিল, এখন সেই জায়গায় মাত্র ৫-৭ ফুট। পলিমাটি ও বালু এসে ধীরে ধীরে বিলগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। সরকারিভাবে হাওর রক্ষার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’ কথাগুলো মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার হাওরপারের বাসিন্দা রায়হান আহমেদের।

রায়হানের কথাতেই ফুটে উঠেছে এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি হাকালুকি হাওরের করুণ পরিণতি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জুড়ী নদীসহ হাওরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ১০টি নদ-নদী এবং অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া হয়ে হাওরে গিয়ে সরাসরি পড়ছে বর্জ্য ও বালু। আর এতেই ভরাট হয়েছে হাওরের অধিকাংশ বিল, নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য এবং বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে হাওর। শুধু বর্জ্য নয়; বিল শুকিয়ে একাধিকবার মাছ শিকার, কৃষিতে ব্যবহৃত কীটনাশকের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক প্রজাতির দেশীয় মাছ। দখল হচ্ছে হাওরের উপরিভাগের অংশ।

বাসিন্দারা জানান, হাকালুকি হাওর লাখ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম। কেউ মৎস্য শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে, আবার কেউ কৃষিখেত করে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, মাত্র কয়েক বছর হাওরের পরিবেশ দূষণে ভরে গেছে। নির্বিচার সেচ দিয়ে মাছ শিকার, কীটনাশক প্রয়োগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ না থাকা এবং হাওরের জায়গা দখল করে নেওয়া হচ্ছে। এসব কারণে বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে হাকালুকি হাওর।

অনুসন্ধানে জানা যায়, হাকালুকি হাওরের আয়তন প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে শুধু বিলের আয়তন ৪ হাজার ৪০০ হেক্টর। মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা, কুলাউড়া, জুড়ী এবং সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত। জুড়ী, ফানাই, সুনাইসহ ১০টি নদ-নদী এবং অসংখ্য পাহাড়ি ছড়ার হাওরের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। জুড়ী, সুনাই ও পানাই এই বিশাল হাওরের মূল প্রবাহ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পলি বালু জমে শতাধিক বিল ভরাট হয়ে গেছে। কাগজে-কলমে ২৩৮টি বিল থাকলেও প্রায় অর্ধেক বিলের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যেগুলো অবশিষ্ট আছে, এগুলোও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বছর কয়েক আগে যেসব বিলের নাব্যতা ৩৫-৩০ ফুট গভীর ছিল, এখন কমে ১৫-২০ ফুটে চলে এসেছে।

হাকালুকি হাওরের বৈশিষ্ট্য হারানোর বিষয়ে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব ও হাওর কৃষি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ নূর হোসেন মিঞা বলেন, ‘কয়েকটি কারণে হাওর বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। হাওরের ভেতরে অপরিকল্পিত বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণের কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্রোতে যে বালু আসে, তা জমা হয়ে ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে যাচ্ছে, ফলে হাওর পানি ধরে রাখতে পারছে না। আমরা যেসব প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করছি, এগুলো যত্রতত্র হাওরের পানির মধ্যে ফেলে দিচ্ছি। এসব বর্জ্যের কারণে হাওর ভরাট হচ্ছে। উজান থেকে যেসব পানি আসে, তা বঙ্গোপসাগরে নামার আগে বড় বড় সেতুর পিলারের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে; ফলে নদীগুলোতে বালু জমা হয়ে চর সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে নদীতে আগের মতো পানি ধারণক্ষমতা নেই। আমাদের যেসব হাওরে মাছ, ফসল উৎপাদন ও পানি থাকার কথা; এসব জায়গায় হাওর ভরাট হওয়ায় সবকিছু কমে যাচ্ছে। পলিমাটির জায়গায় বালু এসে হাওর ভরাট হচ্ছে।’

হাওর সুরক্ষার জন্য সরকারিভাবে যতটুকু উদ্যোগ নেওয়ার কথা, তা নেওয়া হচ্ছে না বলে মনে করেন অধ্যাপক নূর হোসেন। তিনি বলেন, ‘এসব কারণে হাওর তার গভীরতা হারাচ্ছে। হাওরে জলজ উদ্ভিদ কমে গেছে। আগের মতো মাছ নেই।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতির সালেহ সোহেল বলেন, ‘হাকালুকি দেশের সবচেয়ে বড় মিঠাপানির হাওর। এই হাওর বর্তমানে সংকটাপন্ন। হাকালুকি হাওরের বিলগুলো জরুরিভাবে খনন করা প্রয়োজন। দখল করা জায়গা মুক্ত করতে হবে। হাওরের জলজ উদ্ভিদগুলো রক্ষা করতে হবে। হাওরের প্রবেশপথে ছড়া ও নদীগুলো খনন করতে হবে। এখন হাওরে কী পরিমাণ বিল আছে, তা সঠিক হিসাব করা প্রয়োজন।’

মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাঈদুল ইসলাম বলেন, ‘হাকালুকি হাওরে বর্জ্য যাচ্ছে, বিষয়টি জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে দেখা হয়। অথবা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা এটা দেখাশোনা করে; এটা তাদের দায়িত্ব। এ ছাড়া আমাদের বললে আমরা সেখানে যাব।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফ হোসেন বলেন, একটা সময় হাওরে দেশীয় ২৬০ প্রজাতির মাছ ছিল। ২০১৫ সালের একটি জরিপে ১৪৩ প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া গেছে।

জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, ‘হাওরের সমস্যা নিয়ে আমার কিছু জানা নেই। হাওর উন্নয়ন প্রকল্প হবে কি না, এটা আমার বিষয় নয়, যাঁরা হাওর নিয়ে কাজ করেন, তাঁরা দেখবেন।’

বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সি এম ইউসুফ হোসাইন বলেন, ‘হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ার হাওর নিয়ে একটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। আশা করি, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে হাওরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বেশ কিছু উন্নয়ন হবে।’