Image description

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংস্কার করা সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে বিতর্কের মধ্যে সোমবার ছবিগুলোর ফ্রেম ভাঙচুর ও ছবি ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। দুপুর আড়াইটার দিকে উর্দু বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ও ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার ছবি ছিঁড়ে ফেলেন। এর কিছুক্ষণ পর বেলা ৩টার দিকে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী একই স্থানে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমকে জুতাপেটার একটি ছবি টাঙিয়ে দেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডাকসু, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান দেখা গেছে।

জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন নিয়ে এক পক্ষের অভিযোগ, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক একজন ব্যক্তিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় অযথা স্থান দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ডাকসুর দাবি, ছবিগুলো কাউকে মহিমান্বিত করে উপস্থাপনার জন্য নয়; বরং সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরতেই প্রদর্শন করা হয়েছিল। এর মধ্যেই ছবি ভাঙচুর এবং গোলাম আযমকে জুতাপেটার ছবি টাঙানোর ঘটনায় সংগ্রহশালায় ইতিহাসের উপস্থাপন নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

ছবি ভাঙচুরের সময় আবু তৈয়ব হাবিলদার বলেন, ‘এ দেশের ভাষা আন্দোলনের আসল নায়কদের বাদ দিয়ে পাকিস্তানের জাঁদরেল জিন্নাহর ছবি কেন ডাকসু রেখেছে, তার জন্য প্রশাসন ও ডাকসুর নেতাদের জবাব দিতে হবে। যে জিন্নাহ আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, সে জিন্নাহকে কীভাবে এখানে রাখা হয়?’

তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ—সব জায়গায় রক্ত দিয়েছে। এখানে ভাষা আন্দোলনের নায়ক আবুল কাসেমের ছবি থাকতে হবে। এখানে শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের ছবিও থাকতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ফলে সংগ্রহশালায় কোন ব্যক্তির ছবি কীভাবে ও কোন প্রেক্ষাপটে প্রদর্শন করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

আবু তৈয়ব ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ওই নির্বাচনে তিনি সবচেয়ে প্রবীণ প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিলেন।

জিন্নাহর স্থানে গোলাম আযমের ছবি জিন্নাহর ছবি ভাঙচুরের পর সোমবার বেলা ৩টার দিকে ওই স্থানেই গোলাম আযমকে জুতাপেটার একটি ছবি সাঁটান অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী। অর্ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী এবং বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক।

ছবিটিতে বায়তুল মোকাররম এলাকায় উপস্থিত ক্ষুব্ধ মানুষকে গোলাম আযমের দিকে জুতা নিক্ষেপ করতে দেখা যায়। ছবির ক্যাপশনে লেখা, ‘১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি বায়তুল মোকাররমে ফিলিস্তিনের যুদ্ধে শহীদ দুই বাংলাদেশির জানাজা পড়তে এলে উপস্থিত মুসল্লিরা তাকে জুতাপেটা করেন।’ অর্ক বড়ুয়া বলেন, ‘ডাকসু কারও বাপের না। ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন কেউ মেনে নেবে না।’

তিনি বলেন, ‘ডাকসু সংগ্রহশালা বাংলাদেশের মানুষের লড়াই ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলির একটি আর্কাইভ। ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক এখানে জিন্নাহর ছবি লাগানোর পর বলেছেন, তার ইচ্ছা হয়েছে বলে তিনি ছবিটি লাগিয়েছেন। আমারও ইচ্ছা হয়েছে, তাই আমি গোলাম আযমের এই ছবি লাগিয়েছি।’

গোলাম আযম একাত্তরে শান্তি কমিটি, রাজাকার ও আলবদর বাহিনী গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেন। সাজা ভোগের মধ্যেই ২০১৪ সালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

যেভাবে শুরু হয় বিতর্ক দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরবময় আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ডাকসু সংগ্রহশালাটি সংস্কার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন জরাজীর্ণ থাকা সংগ্রহশালাটিকে আধুনিক, নান্দনিক ও তথ্যসমৃদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

রোববার সংস্কার করা সংগ্রহশালার উদ্বোধন করেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম। সংস্কারকাজের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এইচ এম মোশারফ হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম, ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, ক্যারিয়ার উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম, সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের, ডাকসুর সাবেক ভিপি বদরুল আলমের মেয়ে ফারজানা আলম ও তার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ডাকসু ও হল সংসদের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরবময় কর্মকাণ্ডও এতে স্থান পেয়েছে। সাবেক নেতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে থাকা পুরোনো ছবি, নথি, প্রকাশনা, পোস্টার ও স্মারক সংগ্রহ করে পর্যায়ক্রমে যুক্ত করা হবে।

ডাকসুর ১৯৫৭-৫৮ সেশনের ভিপি বদরুল আলমের মেয়ে ফারজানা আলম বলেন, কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব ছাড়াই ১৯৫৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইতিহাস ও তথ্য-উপাত্ত ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, সংগ্রহশালায় ১৯০৫ থেকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, এতে প্রাচীন ইতিহাস, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন এবং ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনা কালানুক্রমিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

সংগ্রহশালায় যা রয়েছে— সংগ্রহশালায় ঢুকতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ১৯৫ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীর তালিকা রয়েছে। রয়েছে ডাকসুর বিভিন্ন সময়ের সম্পাদক ও নেতৃবৃন্দের তথ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি।

বিগত ১৭ বছরের বিভিন্ন ঘটনা ও আন্দোলনের স্মারকের মধ্যে রয়েছে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি, বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড, মোদিবিরোধী আন্দোলন, ২৮ অক্টোবরের ঘটনা ও শাপলা চত্বরের বিভিন্ন ছবি ও নথি। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাষ্ট্রস্বীকৃত শহীদের তালিকাও রাখা হয়েছে।

জুলাই আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ে ডাকসুর ভূমিকার আলাদা উপস্থাপন রয়েছে। আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের ছবি, জুলাই-পরবর্তী ডাকসুর প্রকাশনা এবং সাম্প্রতিক পত্রিকা ও বইও রাখা হয়েছে। গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের ব্রেইল সংস্করণও রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের জন্য আলাদা অংশে সাত বীরশ্রেষ্ঠ, ১১ জন সেক্টর কমান্ডার, বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, বীরউত্তমদের ছবি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও মুক্তিযোদ্ধা মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদের ছবি রাখা হয়েছে। রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের নামাজ পড়া, রাজাকারদের আটক, নারী মুক্তিযোদ্ধা রুবি ও সিতারা বেগম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুমি ও ক্রিকেটার জুয়েলের ছবি। ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ছবিও রয়েছে।

জিন্নাহর তিন ছবি নিয়ে বিতর্ক সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি রাখা হয়েছিল। এর একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের একটি অনুষ্ঠানের ছবি, যেখানে জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। দ্বিতীয়টি ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের গ্রুপ ছবি, যে সম্মেলনে মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবিসংবলিত প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল। তৃতীয়টি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকায় প্রকাশিত জিন্নাহর ছবিসংবলিত একটি প্রতিবেদনের পেপার কাটিং।

তবে সংগ্রহশালায় শেখ মুজিবুর রহমানের একক বা গৌরবোজ্জ্বল কোনো ছবি রাখা হয়নি। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন কিংবা ৭ মার্চের ভাষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ছবিতেও তাকে দেখা যায়নি। যদিও ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সালের সময়ের কিছু ছবি ও পেপার কাটিংয়ে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি রয়েছে।

এ ছাড়া মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, এম এ জি আতাউল গণি ওসমানী, নবাব সলিমুল্লাহ, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ছবি রয়েছে।

১৯৪৭-১৯৭১ অংশে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের ছবি, পিয়ারু সরদারের ছবি, মুক্তিযুদ্ধের ১১ সেক্টর কমান্ডার, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ, শহীদ বুদ্ধিজীবী ও সাত বীরশ্রেষ্ঠের ছবি রয়েছে। নিচের দিকে মুক্তিযুদ্ধের একটি খোদাই চিত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও আছেন।

১৯৭১-১৯৮১ অংশে শেখ মুজিবুর রহমানের দুই ছেলের বিয়ের ছবি, বঙ্গবন্ধুর ছবিসংবলিত তিনটি পেপার কাটিং, ‘বাংলাদেশে কোনো বিরোধী দল নেই’ শীর্ষক সংবাদ এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের ছবি রয়েছে। জিয়াউর রহমানের সময়ের খাল খনন, খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের স্থিরচিত্র, যুদ্ধকালীন ছবি এবং ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালট পেপারের ছবিও রয়েছে।

ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিবাদের সব আইকনের ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছে, তাই সেগুলো এখানে রাখা হয়নি। তবে ১৯৭২-৭৫ সালের অংশে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি রয়েছে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটির অভিযোগ, ডাকসুর বর্তমান পরিষদ শিক্ষার্থীদের গণআকাঙ্ক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিকামী চেতনাকে উপেক্ষা করে ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির প্রতি ‘প্রচ্ছন্ন অনুরাগ’ দেখাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল উপাচার্য ও ডাকসু সভাপতি অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জিন্নাহর ছবি সরানোর দাবি জানিয়েছে। পরে উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে প্রেস ব্রিফিং করে তারা।

ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস বলেন, সংগ্রহশালায় ‘বিতর্কিত’ দুজন ব্যক্তির ছবি টানানো হয়েছে। এটি নৈতিকভাবে স্খলনজনিত কাজ উল্লেখ করে তিনি জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছবি সরানো না হলে উপাচার্যের কার্যালয় ও ডাকসু সংগ্রহশালায় কর্মসূচি দেওয়া হবে।

ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, একজন বিতর্কিত ব্যক্তির ছবি ডাকসুর সংগ্রহশালায় টানানো হয়েছে, যার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ডাকসুর ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক নেই। ছবি সরানো না হলে কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নও জিন্নাহর ছবি অপসারণ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে।

সংগঠনটির সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা ও সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন শুভ বলেন, জিন্নাহর ছবি সংযোজন এবং শেখ মুজিবের ছবি অপসারণ ‘ইতিহাস বিকৃতির প্রচেষ্টা’। দাবি পূরণ না হলে শিক্ষার্থীরা ‘যথাযথ ব্যবস্থা’ নেবেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

ডাকসুর ব্যাখ্যা : সোমবার বিকেল ৪টায় ডাকসু ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জিএস এস এম ফরহাদ। তিনি বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন হঠাৎ করে হয়নি; এর আগে অনেকগুলো প্রেক্ষাপট ছিল। জিন্নাহ সরাসরি বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বলেছিলেন, এই অঞ্চলে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। সংগ্রহশালায় সেই বক্তব্যের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে এবং ছবির নিচের ক্যাপশনেও তার বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে।

ফরহাদের ভাষ্য, জিন্নাহর ছবি না রাখলে বলা হতো তিনি বাংলা ভাষার বিরোধিতা করেছিলেন—সেই ইতিহাস লুকানো হয়েছে। আবার ছবি রাখায় বলা হচ্ছে তাকে গৌরবান্বিত করা হচ্ছে। ডাকসু কোনো পক্ষ না নিয়ে ‘হুবহু ইতিহাস’ তুলে ধরেছে বলেও দাবি করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ছাত্রদলের অবস্থান দেখে তার মনে হয়েছে, তারা পক্ষান্তরে জিন্নাহর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং জিন্নাহ যে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন, সেটি লুকাতে চাইছে।

এদিকে ফাতিমা তাসনিম জুমা জিন্নাহর ছবি ভাঙচুরের ঘটনাকে ‘হামলা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি দাবি করেন, প্রথম ভাঙা ছবিটি একক জিন্নাহর ছবি নয়; ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় নির্বাচন নিয়ে একটি সংবাদপত্রের পেপার কাটিং। দ্বিতীয়টি ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের সময়কার গ্রুপ ছবি, যেখানে এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে জিন্নাহও ছিলেন। তৃতীয় ছবির ক্যাপশনেই জিন্নাহর ভাষাবিরোধী অবস্থান উল্লেখ ছিল বলে জানান তিনি।

শিক্ষক নেটওয়ার্কের পরিদর্শন : জিন্নাহর ছবি ভাঙচুরের পর সোমবার দুপুরে ডাকসু সংগ্রহশালা পরিদর্শন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সদস্যরা। এ সময় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান উপস্থিত ছিলেন। তাদের সেখানে যাওয়ার আগে আবু তৈয়ব হাবিলদার জিন্নাহর ছবির ফ্রেম ভেঙে ছবি ছিঁড়ে ফেলেন।

প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি : এদিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ ও তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের ঘটনায় কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের উপপরিচালক ফররুখ মাহমুদ স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।