সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর প্রস্তাবের মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১৮ ধরনের ভাতা বাবদ ১০ কোটি ৬ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। গুরুত্বপূর্ণ এ অবকাঠামো প্রকল্পে রেললাইন নির্মাণের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন ভাতা, পরামর্শক সেবা ও যানবাহন কেনায় বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৯০২ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পটির সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ১২ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল ব্যয়ের চেয়ে বাড়ছে ৬ হাজার ৬২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১৮ ধরনের ভাতার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ১০ কোটি ৬ লাখ টাকা। একই সঙ্গে পরামর্শক সেবায় ২৪৯ কোটি টাকা এবং গাড়ি ও যানবাহনের তেল ও লুব্রিকেন্ট কিনতে আরও ২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত ১৮ ধরনের ভাতার পেছনে ব্যয় হবে ১০ কোটি ৬ লাখ টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কী কী খাতে এ ভাতা দেওয়া হবে এবং এর কতটা অপরিহার্য-সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবে তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টরা। পরিকল্পনা কমিশনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সংশোধিত প্রকল্পে কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যুক্ত হয়েছে। এসব উপাদান প্রকল্পের মোট ব্যয় বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। সরকারের ব্যয় সংকোচনের সময়ে রেলওয়ের প্রস্তাবিত ব্যয়ের বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল।
১৮ ধরনের ভাতায় ১০ কোটি : সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেললাইন প্রকল্পের সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রকল্পে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১৮ ধরনের ভাতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এসব ভাতার মোট আর্থিক মূল্য ১০ কোটি ৬ লাখ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরামর্শক সেবার জন্য ২৪৯ কোটি টাকার বরাদ্দ। অর্থাৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাতা ও পরামর্শক সেবাতেই প্রায় ২৬০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া ১১টি গাড়ি, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও মোটরসাইকেল কেনার ব্যয় ৩ কোটি ৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ কোটি ৩৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ এ খাতেও ব্যয় প্রায় তিন গুণ বাড়ছে।
রেললাইন গুরুত্বপূর্ণ, প্রশ্ন আনুষঙ্গিক ব্যয়ে : সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেললাইন উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ সহজ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামো প্রকল্প। এটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে ঢাকার রেলপথের দূরত্ব প্রায় ১১৪ কিলোমিটার কমবে। যাত্রার সময় কমবে প্রায় দুই ঘণ্টা। পাশাপাশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সময় এবং ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। ফলে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। তবে প্রকল্পের মূল কাজের বাইরে অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয়, ভাতা ও পরামর্শক খাতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অবশ্য ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণের কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি, প্রকল্পের কাজের পরিধি বাড়ানো, ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং একটি রেল ও একটি সড়ক ওভারপাস যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে।
অর্থায়নেও পরিবর্তন : প্রকল্পটি শুরুতে ভারতের লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) অর্থায়নে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল। পরে সরকার ভারত ঋণ সুবিধা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর বিকল্প বৈদেশিক অর্থায়নের সন্ধান শুরু হলে বেইজিংভিত্তিক এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) প্রকল্পটিতে অর্থায়নের নিশ্চয়তা দেয়। এদিকে প্রকল্পের বাস্তবায়ন সময়ও বেড়েছে। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সংশোধিত প্রস্তাবে সময়সীমা বাড়িয়ে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর করা হয়েছে।