সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা। কমলাপুরগামী একটি আন্তনগর ট্রেন হুইসেল বাজিয়ে খিলক্ষেত রেলগেট ক্রস করবে। রেললাইন দখল করে বিভিন্ন দোকানের ব্যবসায়ীরা তাড়াহুড়া করে দুই রেললাইনের মাঝে সংকীর্ণ জায়গায় তাদের জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছে। রেলগেটের ড্রপবার নামানোর পরও পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে দৌড়ে রেললাইন পার হচ্ছেন। রেললাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে আসা পথচারীদের আশপাশের লোকজন রেললাইন থেকে সরে যেতে তাগিদ দিচ্ছেন। ট্রেন এলে ঝুঁকি নিয়ে সংকীর্ণ জায়গায় জিনিসপত্র নিয়ে ব্যবসায়ীদের দাঁড়িয়ে থাকা, ড্রপবার নামানোর পরও দৌড়ে রেললাইন পার হওয়া, রেললাইনকে ফুটপাত হিসেবে ব্যবহার করা রাজধানীতে রেল দুর্ঘটনার শঙ্কা বাড়াচ্ছে।
এতে আহত ও প্রাণ হারানোর শঙ্কাও দিন দিন বাড়ছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর রাতে কারওয়ান বাজার এলাকায় রেললাইন পারাপার হওয়ার সময় ট্রেনের ধাক্কায় ৫৫ বছর বয়সি এক ব্যক্তি গুরুতর আহত হন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ছাড়া গত ৩০ আগস্ট রাতে কারওয়ান বাজার এলাকায় এক যুবক ট্রেনের ধাক্কায় আহত হন। ৩১ আগস্ট বিকালে সেই যুবক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০১৮ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত রেলক্রসিং দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫৪৭টি। এতে ৭৬২ জন নিহত এবং ৬৯৪ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া মোট ২,৩৩৪টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ২,৪৬৬ জন নিহত এবং ২,১৩৪ জন আহত হয়েছেন।
দেশের ৮২% রেলক্রসিং ঝুঁকিপূর্ণ। সংস্থাটি বলছে, গেটকিপার ঠিকমতো দায়িত্ব পালন না করায় এবং জনসচেতনতার অভাবে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। খিলক্ষেত, কুড়িল বিশ্বরোড, এয়ারপোর্ট, কারওয়ান বাজার, মহাখালী, তেজগাঁও সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সাধারণ মানুষ রেললাইনগুলোকে ফুটপাত হিসেবে ব্যবহার করছে। খিলক্ষেত, কুড়িলে রেললাইনের ওপর দোকানিরা বিভিন্ন ব্যবসা নিয়ে বসেছেন। এ ছাড়া রাজধানীতে রেললাইনগুলোতে সন্ধ্যা হলে বন্ধুবান্ধব নিয়ে বসে আড্ডা দিতেও দেখা যায়। খিলক্ষেত রেলগেটের পাশের বাজারে প্রতিদিন সকালে পাইকারি হাট বসে। তখন সচল ও নতুন উভয় রেললাইনেই অস্থায়ী দোকানের সংখ্যা বেড়ে যায়। লোকজনের আনাগোনাও থাকে চোখে পড়ার মতো।
খিলক্ষেতে নতুন রেললাইন দখল করে গড়ে উঠেছে সারিবদ্ধ ফলের দোকান। এমনকি যে লাইনে ট্রেন চলাচল করে, তার গা ঘেঁষেও বসেছে বেশ কিছু অস্থায়ী ফলের স্টল। ট্রেনের সিগন্যাল পেলেই দোকানিরা দ্রুত মালামাল সরিয়ে নিয়ে দুই লাইনের মাঝখানের সংকীর্ণ জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। ক্রেতারাও বাধ্য হয়ে দোকানিদের পাশে গিয়েই দাঁড়ান। এসব দোকানের ঠিক পেছনে নতুন রেললাইনের জায়গা দখলে রাখতে ব্যবসায়ীরা তাদের কাঠের খাটিয়া লাইনের ওপরই ফেলে যান। যা পরদিন সকালে কেনাবেচার কাজে ব্যবহার করা হয়।
রেললাইনের ওপর অস্থায়ী দোকানপাটের পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলোকে নতুন লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করতে দেখা যায়। ট্রেন আসার মুহূর্তে গেটম্যান ড্রপবার নামিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও অনেক রিকশা ও সিএনজি মূল সড়কে ওঠার অপেক্ষায় লাইনের ভিতরের অংশেই বিপজ্জনকভাবে আটকে থাকে। যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া চরম উদ্বেগের বিষয় হলো ড্রপবার ফেলার পরও সাধারণ পথচারীরা অপেক্ষা না করে ট্রেন একেবারে কাছাকাছি না আসা পর্যন্ত জীবন বাজি রেখে পারাপার হতে থাকেন।
কুড়িল বিশ্বরোড রেলগেটে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন আরেক চিত্র। সেখানে ট্রেন চলাচলের লাইনে দোকান না থাকলেও পুরো নতুন লাইনটি দখল করে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ‘মিনি নিউমার্কেট’-এর আদলে সেখানে গড়ে উঠেছে কাপড়ের দোকান। হাঁকডাক দিয়ে চলছে বেচাকেনা। কাপড়ের দোকানের পাশাপাশি বসেছে চায়ের টং, খাবারের স্টল ও ইলেকট্রনিক্সের দোকান। এ ছাড়া কুড়িল বিশ্বরোডের রেললাইনের দুই প্রান্তে কোনো ধরনের মেকানিক্যাল ড্রপবার নেই। ফলে কোনো বাধা ছাড়াই পথচারীরা ইচ্ছামতো রেললাইন পার হচ্ছেন। এ ছাড়া অনেকে নতুন রেললাইন এবং সচল রেললাইন ধরে কানে হেডফোন দিয়ে হেঁটে যান গন্তব্যে। কোন ট্রেকে ট্রেন আসবে তা বুঝতে পারেন না। যা সার্বিক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
খিলক্ষেতের স্থায়ী বাসিন্দা মো. আল আমিন মিয়া বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বের হয়ে বাজারে আসি। ভোরে পাইকারি বাজার বসার কারণে প্রচণ্ড ভিড় থাকে। খুচরা বিক্রেতা, কর্মচারী ও কুলিরা ব্যস্ত সময় পার করেন। অনেক সময় তড়িঘড়ি করে বাজার নিয়ে রেললাইন পার হওয়ার মুহূর্তে তারা দুর্ঘটনার শিকার হন। চোখের সামনে এমন অনেক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটতে দেখেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাজারের প্রভাবশালী একটি চক্রই মূলত টাকা নিয়ে এখানে দোকানপাট বসানোর অনুমতি দেয়। কয়েক দিন পর পর পুলিশ এসে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে দোকান তুলে দিলেও তারা পুনরায় এসে আবার চেপে বসে।’
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিভিন্ন এলাকায় রেললাইনের লেভেল ক্রসিং এবং রেললাইনের গা ঘেঁষে বাজার ও অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠা কেবল খাসজমি দখলই নয়, এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এক নিরাপত্তাঝুঁকি। রেললাইনের ওপর যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকা বা পথচারীদের অসচেতন চলাচলের কারণে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।
মাঝে মাঝে রেললাইনের আশপাশের অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করা হলেও পেছনের শক্তিশালী চক্রটিকে কখনো আইনের আওতায় আনা হয় না। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই আবার নতুন করে দখল হয়ে যায়। তিনি বলেন, বছরের পর বছর সরকার পরিবর্তন হলেও রেলওয়ের সম্পত্তি বেহাত হওয়া থামেনি। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দীর্ঘদিনের উদাসীনতা ও সঠিক জবাবদিহির অভাবেই অবৈধ দখলদাররা এ সাহস পায়। পুলিশ বা কর্তৃপক্ষের মূল কাজ শুধু সাময়িক উচ্ছেদ করা নয়। এ দখলদারিত্বের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।