Image description

দেশে মাদকের অন্ধকার সাম্রাজ্যে যুক্ত হয়েছে নতুন দুই মাদক এমডিএমএ ও এমডিএমবি। ক্রেজি ড্রাগ ইয়াবা ও আইসের মতো প্রচলিত মাদকের জায়গা এখন দখল করে নিচ্ছে ল্যাবরেটরিতে তৈরি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এ দুই কৃত্রিম মাদক। আধুনিকতার মোড়কের আড়ালে এই মাদক সিসা লাউঞ্জ, ডিজে পার্টি এবং উচ্চবিত্ত তরুণ-তরুণীদের আড্ডায় ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে সিনথেটিক এই দুই মাদকের ভয়ংকর আগ্রাসনের চিত্র উঠে এসেছে।

২০২৬ সালে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ড্রাগ রিপোর্ট’ এবং ‘আর্লি ওয়ার্নিং অ্যাডভাইজরির দক্ষিণ এশিয়াভিত্তিক আঞ্চলিক প্রতিবেদনে এমডিএমএ এবং এমডিএমবিসহ সিনথেটিক মাদকের বিস্তার নিয়ে একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে বাংলাদেশে বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী উদ্ভিদভিত্তিক মাদক থেকে ল্যাবে তৈরি মাদকের দিকে পালাবদল হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ মাদকসেবীদের ধরা নয়, বরং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, বাণিজ্যিক সাপ্লাই চেইন এবং মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সিনথেটিক মাদকের করপোরেট-স্টাইলের চোরাচালান নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। বিশেষ করে এমডিএমবির মতো রাসায়নিক শনাক্ত করতে কাস্টমস এবং ফরেনসিক ল্যাবগুলোর সক্ষমতা রাতারাতি বৃদ্ধি করা। এ ছাড়া এ ঢল ঠেকানো প্রায় অসম্ভব।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চল (দক্ষিণ) উপপরিচালক মানজারুল ইসলাম বলেন, এমডিএমএ এবং এমডিএমবির মতো সিনথেটিক মাদক ল্যাবরেটরিতে রাসায়নিকগুলোর মলিকিউলার কাঠামো সামান্য পরিবর্তন করে সহজেই তৈরি করা হয়। যাতে প্রচলিত ডোপ টেস্ট বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি এড়ানো যায়। এ ছাড়া খুব সামান্য পরিমাণ তরল এমডিএমবি বা এমডিএমএ পাউডার দিয়ে হাজার হাজার ডোজ মাদক তৈরি করা সম্ভব। তাই বাংলাদেশি মাদক মাফিয়ারা ইয়াবা, আইসসহ অন্যান্য মাদকের সঙ্গে এমডিএমএ এবং এমডিএমবি মাদকাসক্তদের কাছে পরিচিত করে তুলছে। এ দুই মাদকের দিকে মনোনিবেশ করেছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। অভিযানে বেশ কিছু চালানও জব্দ করা হয়েছে। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, ল্যাবরেটরিতে তৈরি ভয়ংকর সিনথেটিক মাদক এমডিএমএ ও এমডিএমবি তৈরির রাজধানী হিসেবে খ্যাত ছিল ইউরোপের দুই দেশ নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়াম। এ দুই দেশের সীমান্ত এলাকার ল্যাবরেটরিগুলোতে তৈরি হওয়া এ দুই মাদক পুরো বিশ্বে পাচার করা হতো। কিন্তু এ দুই মাদকের প্রিকার্সরগুলো সহজলভ্য হওয়ায় গত কয়েক বছরে মিয়ানমারের মাদকরে রাজধানী খ্যাত শান রাজ্যে কিছু ল্যাবরেটরি গড়ে ওঠে। শান রাজ্যের তৈরি হওয়া এ দুই মাদকের কিছু কিছু চালান ইয়াবা ও আইস পাচারের রুট হয়েই বাংলাদেশে আসছে। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের অভিজাত শ্রেণির ব্যবহার করা এমডিএমএ ও এমডিএমবির চালানের সিংহভাগ আসছে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে।

মাদক কারবারিরা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর চোখ ফাঁকি দিয়ে কফি বিচি, পোশার প্রাণীর খাবার, শিশুদের খেলনা কিংবা অন্যান্য মালামালের ভিতর করে কৌশলে আকাশপথে নিয়ে আসছে এ দুই মাদকের চালানা। এগুলো মূলত ‘এলিট ক্লাস’ বা উচ্চবিত্তের মাদক। এর প্রধান ক্রেতা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী, ধনী ব্যবসায়ীদের সন্তান এবং পার্টি কালচারে অভ্যস্ত তরুণ-তরুণীরা। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার অভিজাত এলাকা এবং বিলাসবহুল রিসোর্টগুলোতে আয়োজিত ডিজে পার্টি ও প্রাইভেট রেভ পার্টিতে এসব মাদকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। একটি পিলের উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মাদকসেবীদের নাগালের বাইরে থাকে এটি। এরই মধ্যে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ অন্যান্য যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন দুনিয়ায় ‘অদৃশ্য বাজার’ তৈরি হয়েছে এ মাদকের।

ফেসবুকের ক্লোজড গ্রুপ, রিভিউ পেজ ও ভুয়া অ্যাকাউন্টে সংকেতপূর্ণ পোস্ট দিয়ে চলছে মাদকের কারবার। আগ্রহী ক্রেতারা ইনবক্সে মেসেজ করলে অ্যান্ড-টু-অ্যান্ড এনক্রিপ্টেড হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে দাম নির্ধারণ ও সরবরাহ নিশ্চিত হয়। লোকেশন শেয়ার, লাইভ ট্র্যাকিং ও বিশেষ ইমোজি ব্যবহার করে লেনদেন সম্পন্ন করে। এমডিএমএ ও এমডিএমবি সাধারণত ই-সিগারেট ও ভেপের ব্যবহার মাধ্যমে ব্যবহার করে করছে বাংলাদেশের মাদকাসক্তরা।

এ দুই মাদক বিস্তারের সবচেয়ে অভিনব ও বিপজ্জনক কৌশল ব্যবহার করছে মাদক ডিলাররা। তারা এমডিএমবি ও এমডিএমএ-এর তরল নির্যাস অত্যন্ত সুকৌশলে ই-সিগারেটের ফ্লেভারড জুস বা ভেপ লিকুইডের সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে। ভেপের ধোঁয়ায় স্ট্রবেরি, মিন্ট বা ভ্যানিলার মতো সুগন্ধি থাকে, তাই আশপাশে থাকা মানুষ বুঝতে পারে না ভেপ বা ই-সিগারেটের মধ্যে মাদকের ব্যবহার হচ্ছে। তরুণ-তরুণীরা একে নিছক ‘স্টাইল’ বা আধুনিক ট্রেন্ড হিসেবে গ্রহণ করলেও নিজের অজান্তেই তারা ভয়াবহ নেশার স্নায়বিক ফাঁদে আটকা পড়ছে।

এমডিএমএ ল্যাবে তৈরি একটি ভয়ংকর সিনথেটিক মাদক। এ মাদকের রাসায়নিক নাম মিথাইলিন-ডাইঅক্সি-মেথামফেটামিন হলেও আন্ডারওয়ার্ল্ডে মাদকটি পরিচিত এক্সট্যাসি, মলি বা ‘ই’ নামে। এ মাদক মস্তিষ্কে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটারের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। এতে তীব্র আনন্দ, শক্তি এবং অন্যদের প্রতি অস্বাভাবিক সহানুভূতি বা আবেগ অনুভব করায়। এ মাদক ব্যবহারে লিভার, কিডনি, হার্ট বিকলসহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ মাদকের প্রভাব কমে যাওয়ার পর ব্যবহারকারীরা তীব্র বিষণ্নতায় ভোগেন। যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘সুইসাইড টুয়েসডে’ বলে। এমডিএমবি হচ্ছে ল্যাবরেটরিতে তৈরি অত্যন্ত শক্তিশালী কৃত্রিম গাঁজা।

যা প্রাকৃতিক গাঁজার চেয়ে ২০ গুণ শক্তিশালী। ডার্ক ওয়ার্ল্ডে এটি স্পাইস, কে-টু ফেক উইড নামে অধিক পরিচিত। এ সিনথেটিক মাদক যা মাত্র কয়েক ফোঁটা স্নায়ুতন্ত্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই মাদক হ্যালুসিনেশন, আক্রমণাত্মক আচরণ এবং হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা ঘটায়। সাধারণ ফ্লেভারড লিকুইডের মতো দেখতে হওয়ায় এটি শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। ফলে ব্যবহারকারীরা বুঝতেই পারে না তারা প্রাণঘাতী ‘নেক্সট জেনারেশন সিনথেটিক ড্রাগ’ সেবন করছেন। প্রচলিত নিকোটিনযুক্ত লিকুইডের সঙ্গে মাত্র অল্প পরিমাণ এমডিএমবি মিশিয়ে এটি ব্যবহার করা হয়।

মাদক গবেষক বিষয়ক ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হুমায়ন কবির খন্দকার বলেন, এমডিএমএ এবং এমডিএমবি সম্পূর্ণ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরি সিনথেটিক ড্রাগ। এমডিএমএ সেবনকারীকে সাময়িক তীব্র আনন্দ ও উন্মাদনায় ভাসিয়ে দেয়। অন্যদিকে এমডিএমবি ল্যাবে তৈরি ভয়ংকর গাঁজা। যা প্রাকৃতিক গাঁজার চেয়ে কমপক্ষে ২০ গুণ বেশি শক্তিশালী। এটি এতটাই বিষাক্ত যে মাত্রার সামান্য হেরফেরে সেবনকারীর ব্রেন স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকে তাৎক্ষণিক মৃত্যু হতে পারে।