মাঠপর্যায়ে মা, নবজাতক ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন এবং অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে ৩৯৬ কোটি ৮১ লাখ ২০ হাজার টাকার একটি বড় উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। আগামীকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুষ্ঠেয় সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে। ৩৯৬ কোটি ৮১ লাখ টাকার এ প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থায়ন আসছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ‘জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা’ (জাইকা)-এর বৈদেশিক ঋণ থেকে।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে আসা প্রকল্প প্রস্তাবনার (ডিপিপি) প্রাক্কলিত ব্যয় বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট ব্যয়ের ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ বা ৩২১ কোটি ৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা জাইকার ঋণ সহায়তা থেকে সংস্থান করা হবে। অবশিষ্ট ৭৫ কোটি ৭৭ লাখ ৯৬ হাজার টাকা (১৯ দশমিক ৬১ শতাংশ) সংস্থান করবে বাংলাদেশ সরকার। কোনো অবকাঠামো বা নতুন ভবন নির্মাণের সুযোগ না থাকায় ‘হেলথ সিস্টেম স্ট্রেন্থেনিং থ্রু এমএনসিএইচ সার্ভিসেস ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড এনসিডিএস কন্ট্রোল’ শীর্ষক এ প্রকল্পটির মূল জোর দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও এনসিডি কর্নার আধুনিকায়ন এবং ডিজিটালাইজেশনের ওপর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং ‘কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট’ যৌথভাবে এটি বাস্তবায়ন করবে।
পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের বাজেট ঘাটতি রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের প্রয়োজন হয় বলেই বৈদেশিক সহায়তা নেওয়া হয়। এই স্বাস্থ্য প্রকল্পে অনেক প্রযুক্তিনির্ভর ও কারিগরি বিষয় রয়েছে, তাই জাইকাকে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জাইকার ঋণ দীর্ঘমেয়াদি-প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছরে ধীরে ধীরে পরিশোধ করা যায়। তবে প্রকল্পটির অর্থায়ন ও কারিগরি বিষয়গুলো মূলত আর্থ-সামাজিক বিভাগ দেখছে।’
প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ ব্যয় হবে সরঞ্জাম ক্রয় ও ডিজিটালাইজেশনে। এর মধ্যে দেশের প্রায় ১৪ হাজার ৯৬০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আধুনিক পরীক্ষানিরীক্ষার সুবিধা পৌঁছে দিতে চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার সামগ্রী (এমএসআর) কেনা বাবদ সর্বোচ্চ ১৪৩ কোটি ২১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ৩৬ দশমিক ০৯ শতাংশ। এ ছাড়া প্রান্তিক ক্লিনিকগুলোর সঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স (ইউএইচসি) ও জেলা হাসপাতালের ডেটাবেস ও অনলাইন রেফারেল ব্যবস্থা কার্যকর করতে ১৪ হাজার ৫০০টি কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ কেনায় বরাদ্দ রয়েছে ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা (১৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ)।
ডিপিপির খাতের বিবরণ অনুযায়ী, তৃণমূলের প্রায় ১৫ হাজার কেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য সর্বমোট ৫ হাজার ২৫৪টি ব্যাচে ‘দেশীয় প্রশিক্ষণ’ দেওয়া হবে। এ খাতে রাখা হয়েছে ১০৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের ২৬ দশমিক ৩০ শতাংশ। পাশাপাশি বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার জন্য ৬টি ব্যাচে ‘বৈদেশিক প্রশিক্ষণ’ বাবদ ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে। অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতের মধ্যে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের ১৪ হাজার ৯৬০টি কেন্দ্রের জন্য গাইডলাইন, ম্যানুয়াল ও নথিপত্র মুদ্রণে ‘মুদ্রণ ও বাঁধাই’ খাতে খরচ ধরা হয়েছে ২৩ কোটি ২০ লাখ টাকা (৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ)।
এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে তথ্য প্রচার ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মোট ৬৪টি ‘সেমিনার ও কনফারেন্স’ আয়োজনের জন্য রাখা হয়েছে ৯ কোটি ৯২ লাখ ২০ হাজার টাকা (২ দশমিক ৫০ শতাংশ)। ২০০টি নির্দিষ্ট কেন্দ্রের জন্য স্থায়ী ‘আসবাবপত্র ও সরঞ্জাম’ ক্রয়ে বরাদ্দ করা হয়েছে ৯ কোটি টাকা (২ দশমিক ২৭ শতাংশ)। প্রকল্পের কার্যকারিতা ও স্বাস্থ্যসেবার গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনায় ৫টি ‘গবেষণা’র প্রস্তাব করা হয়েছে, যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ কোটি ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। প্রকল্প চলাকালে মাঠপর্যায়ে তদারকির উদ্দেশ্যে ৪টি ‘যানবাহন ভাড়া’র জন্য রাখা হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। পাশাপাশি অপ্রত্যাশিত বা সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে ‘প্রাইস কন্টিনজেন্সি’ ও ‘ফিজিক্যাল কন্টিনজেন্সি’-এই দুই খাতে পৃথকভাবে ৭ কোটি ৬৩ লাখ ১০ হাজার টাকা করে সর্বমোট ১৫ কোটি ২৬ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য ছোটখাটো প্রশাসনিক খাতে বরাদ্দ থাকছে ২ কোটি ৩০ লাখ ১৫ হাজার টাকা। অর্থায়নের সিংহভাগ জাইকার ঋণ থেকে আসায় প্রকল্পটিকে সময়মতো ও লক্ষ্যভিত্তিক উপায়ে সম্পন্ন করার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।