অনিয়মই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে খাদ্য বিভাগে। সরকার আসে, সরকার যায়। কিন্তু দীর্ঘদিনের পুরোনো দুর্নীতিবাজদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙতে পারছে না কেউই। সিন্ডিকেটের কারণে সরকারি খাদ্যগুদামে ধান-চাল সরবরাহ করতে পারছেন না প্রকৃত কৃষক। বিভিন্ন এলাকায় মধ্যস্বত্বভোগী ও মিলারনির্ভর সিন্ডিকেটের দাপটের কাছে হার মানছেন তাঁরা। অভিযোগ পাওয়া গেছে, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল কেনার সরকারি উদ্যোগ থাকলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যগুদাম ঘিরে রয়েছে দালাল, ফড়িয়া ও প্রভাবশালী মহলের দৌরাত্ম্য। এদের সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতিবাজ খাদ্য কর্মকর্তা-কর্মচারী, মিলার ও ডিলাররা যোগসাজশে গড়ে তুলছেন সিন্ডিকেট। ফলে কোথাও কৃষককে গুদামে ধান দিতে না দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে, কোথাও আবার চুক্তিবদ্ধ মিলারের নিজের মিল না থাকলেও চাল সরবরাহের সুযোগ পাচ্ছেন।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, তালিকাভুক্ত মিলারের একটি বড় অংশেরই নিজস্ব কোনো চালকল নেই। তাঁরা ভাড়ায় চালিত চালকল কিংবা অন্যের মিলকে নিজের দেখিয়ে বছরের পর বছর সরকারি গুদামে ধান-চাল সরবরাহ করে আসছেন। এর সঙ্গে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে যুক্ত থাকছেন স্থানীয় পর্যায়ের গুদামকর্মী ও খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। ফলে কাগজে কলমে মিলার থাকলেও বাস্তবে অন্যের মিল ব্যবহার করে সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। রংপুর, নওগাঁ, রাজশাহীসহ অনেক অঞ্চলে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত মিলারের ৬০ শতাংশের বেশিসংখ্যকেরই মিল বা চাতাল নেই।অভিযোগ আছে, গুদামে খাদ্যশস্য সরবরাহের ক্ষেত্রে কৃষকের বদলে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই বাড়ছে। এ কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলএসডিতে কৃষকের তালিকা, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর ব্যবহারে অনিয়ম ঘটছে। এতে সরকারি দামে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।
বরিশাল : বরিশালের খাদ্য সংরক্ষণ গুদামে পণ্য আনা-নেওয়ার পথেই বড় অংশ কালোবাজারে চলে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা-কর্মচারী, ডিলার ও সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিরা চাল, গম ও আটা কালোবাজারে বিক্রি করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জানান, খাদ্যগুদাম থেকে পণ্য ছাড় করার সময় ওএমএস ডিলার ও জনপ্রতিনিধিরা একটি অংশ বিক্রি করে দেন। ওই পণ্য গুদাম থেকে আর বের হয় না। পরে নতুন পণ্য গুদামে আনার সময় বিক্রি করা অংশ মাঝপথ থেকে কালোবাজারে চলে যায়। পণ্য বেচাকেনার প্রধান হিসেবে কাজ করেন গুদামের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. শাহাবুদ্দিন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওএমএসের একজন ডিলার রবি থেকে বৃহস্পতি প্রতিদিন ১ টন চাল ও ১ টন আটা বিক্রির জন্য উত্তোলন করতে পারেন। কিন্তু তাঁরা অর্ধেক চাল ও ৩-৪ বস্তা আটা ট্রাকে নিয়ে বিক্রি করেন। বাকি চাল ও আটা শাহাবুদ্দিনের মাধ্যমে বিক্রি করে দেন। এমনকি জনপ্রতিনিধিরাও তাঁর কাছে চাল বিক্রি করেন। বিক্রির লভ্যাংশ গুদামের কর্মকর্তাসহ খাদ্য দপ্তরের কর্মকর্তারা ভাগ হিসেবে পান। আরও জানা গেছে, চাল জাহাজ থেকে গুদামে নেওয়ার এবং গুদাম থেকে ট্রাকে ওঠানোর সময় কৌশলে বস্তা ছিঁড়ে ফেলেন শ্রমিকরা। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বস্তায় চালের পরিমাণ ঠিক করে সেলাই করে দেওয়ার কথা। কিন্তু বেশি ছিঁড়ে গেলে নতুন বস্তায় ভরে সঠিক পরিমাণে চাল দিতে হয়। কিন্তু এ নিয়ম মানা হয় না। ছিঁড়ে ফেলায় পড়ে যাওয়া চাল রেখে দিয়ে বস্তা সেলাই করে দেওয়া হয়। এ কারণে দরিদ্ররা বস্তায় চাল কম পান।
বরিশাল সদর উপজেলার খাদ্য কর্মকর্তা আবু সাইদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘কালোবাজারে বিক্রির কোনো তথ্য নেই। প্যাকিং বস্তায় আসে ও প্যাকিং বস্তায় খালাস হয়। জাহাজে ওঠানোর সময় কিছু বস্তা ফেটে যায়। যে বস্তা সেলাইয়ের যোগ্য, সেখানে পরিমাণমতো চাল ভর্তি করে সেলাই করে দেওয়া হয়। সেখান থেকে চাল সরানোর কোনো সুযোগ নেই।’ এ বিষয়ে কথা বলার জন্য গতকাল বরিশাল জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এস এম তাহসিনুল হককে একাধিকবার কল করা হলেও রিসিভ করেননি।
রাজশাহী : রাজশাহী অঞ্চলের খাদ্যগুদামগুলো নিয়েও সিন্ডিকেটের অভিযোগ রয়েছে। বাগমারায় নিম্নমানের চাল মজুতের ঘটনায় ভবানীগঞ্জ খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. বাচ্চু মিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। মোহনপুরে নিজস্ব লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও অন্য মিলের লাইসেন্স ব্যবহার করে ৪২০ টন ধান থেকে চাল তৈরি ও সরবরাহের কথা স্বীকার করার তথ্য রয়েছে। দুর্গাপুরে ৮০ টন খাওয়ার অনুপযোগী চাল শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। বাগমারা, ভবানীগঞ্জের ঘটনাসহ আটটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এসবের প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসেনি।
খুলনা : খুলনা জেলার সরকারি খাদ্যগুদামগুলোর নিয়ন্ত্রণও সিন্ডিকেটের কবলে। অভিযোগ অনুযায়ী, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের খাদ্য কর্মকর্তারা অবৈধ অর্থ উপার্জনের স্বার্থে এ সিন্ডিকেট পুষে রাখেন। ফলে বছরজুড়েই সংগৃহীত ধান-চালের নিম্নমান, নতুন বস্তার স্থলে পুরোনো বস্তার ব্যবহার, ওজনে কারচুপির অভিযোগ মেলে। ধান-চাল সংগ্রহে সরকারি দরপত্রে নতুন বস্তা কেনার নির্দেশ থাকলেও খুলনা শহরের মহেশ্বপাশা খাদ্যগুদাম থেকে চাল-ধান সরবরাহের সময় পুরোনো, ছেঁড়া বা নিম্নমানের বস্তা মিশিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে প্রতি বস্তা থেকে ৩০-৪০ টাকা হাতানো হয়। এ পদ্ধতিতেও চুরি করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, উপজেলা খাদ্যগুদামগুলো থেকে সরবরাহ করা ওএমএসের বরাদ্দ চাল ডিলাররা গুদামেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিক্রি করে দিচ্ছেন। খুলনা সদর গুদামে ৫০ কেজি বস্তায় ৪৯-৪৯.৫ কেজি চার দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এখানে সিবিএ, তল্লাশি ফাঁড়ি এবং ওয়ে ব্রিজ ট্রাক স্কেলে মাপার সময়ও সিন্ডিকেটকে টাকা দিতে হয়।
নড়াইল : জেলার কালিয়া উপজেলার যাদবপুর গ্রামের রিয়ালসহ অনেক কৃষকের অভিযোগ, সরকারি ধান-চাল সংগ্রহের সময় দালাল ছাড়া গুদামে ধান বিক্রি করা যায় না। যদিও জেলা খাদ্য কর্মকর্তা দাবি করেছেন, নড়াইলে খাদ্য বিভাগের কোনো সিন্ডিকেট নেই।
মেহেরপুর : মেহেরপুরে উপজেলা পর্যায়ের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার দেওয়া স্লিপের মাধ্যমে কৃষককে গুদামে ধান বিক্রি করতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্লিপ না থাকায় অনেক কৃষক সরকারি দামে ধান বিক্রি করতে পারেননি। অন্যদিকে খাদ্য বিভাগের দাবি, শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্লিপে কিছু ধান কেনা হলেও অধিকাংশ ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকেই কেনা হয়েছে।
বাগেরহাট : সরকার পরিবর্তনের পরও বাগেরহাটের জেলা ও উপজেলা খাদ্যগুদাম ঘিরে সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। ফলে সাধারণ কৃষক সিন্ডিকেট পাশ কাটিয়ে সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ পাননি বলে তাঁদের অভিযোগ। তাঁরা সরকারি টিআর, কাবিখা, কাবিটা ও ওএমএসের চাল সরবরাহেও ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।
চুয়াডাঙ্গা : জেলার সদর উপজেলার সরোজগঞ্জের কয়েকজন কৃষকের অভিযোগ, সরকারি খাদ্যগুদামে ধান দিতে হলে প্রতি মণে ১ কেজি অতিরিক্ত ধান দিতে হয়। ধানের মান বা আর্দ্রতা নির্ধারিত সীমার বেশি থাকলেও ঘুষ দিলে তা গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়।
কুষ্টিয়া : অভিযোগ অনুযায়ী, কুষ্টিয়ায় আগে জেলা-উপজেলার সরকারি খাদ্যগুদামগুলো নিয়ন্ত্রণ করতেন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা। এখন এ নিয়ন্ত্রণ বিএনপি নেতাদের হাতে। অভিযোগকারীরা জানান, কুষ্টিয়া সদরের বড় বাজার এলাকার সরকারি খাদ্যগুদামও কয়েকজন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
রংপুর : কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি খাদ্যগুদামে ধান-চাল সরবরাহের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত কৃষক। রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় সংগ্রহ কার্যক্রমে অনিয়ম, দালাল-ফড়িয়ার দৌরাত্ম্য এবং মিলার সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে। তাঁরা জানান, চুক্তিবদ্ধ মিলারের প্রায় ৬০ শতাংশেরই নিজস্ব মিল বা চাতাল নেই। এর পরও তাঁদের সঙ্গে ধান-চাল সরবরাহের চুক্তি করা হয়েছে। রংপুরের কাউনিয়া ও মিঠাপুকুরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ সংযোগ নেই এমন চাতাল এবং নিজস্ব মিল-চাতাল নেই এমন ব্যক্তিও সরবরাহকারীর তালিকায় রয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এঁদের কেউ কেউ নিজেদের নামে বরাদ্দ তালিকা অন্য ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রিও করে দিচ্ছেন। কৃষকের অভিযোগ, দালাল-ফড়িয়ারা কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে সরকারি গুদামে সরবরাহ করে লাভবান হচ্ছেন।
এদিকে কুড়িগ্রাম থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, রাজারহাটে গুদামে বস্তাসংকট দেখিয়ে কৃষকের ধান না নিয়ে অটো রাইস মিলে সরবরাহের টোকেন দেওয়া হয়েছে। দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলি খাদ্যগুদামেও কৃষক তালিকা, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বরে অসংগতির অভিযোগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
দিনাজপুর : দিনাজপুরের হাকিমপুর খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহে অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের প্রভাবের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কৃষক তালিকায় নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বরে অসংগতি পাওয়া গেছে। একই মোবাইল নম্বর একাধিক কৃষকের নামে ব্যবহারেরও অভিযোগ উঠেছে। কৃষক জানান, প্রকৃত কৃষকের বড় অংশ সরকারি গুদামে ধান দিতে পারেননি। কারণ প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট কৃষক তালিকা নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে খাদ্য বিভাগ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামের নয় উপজেলায় ধান সংগ্রহ অভিযান চললেও বিভিন্ন গুদামে অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের প্রভাব থাকার অভিযোগ রয়েছে। গুদামে বস্তাসংকট, কৃষক তালিকায় নাম না থাকা, মোবাইল নম্বরে অসংগতি এবং তালিকাভুক্ত কৃষকের ধান দিতে না পারার অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজারহাটের কৃষকের অভিযোগ, গুদামে বস্তাসংকটের কথা বলে ধান নেওয়া হয়নি; পরে অটো রাইস মিলে ধান সরবরাহের জন্য টোকেন দেওয়া হয়েছে। সেখানে সরকারি কর্মকর্তা উপস্থিত না থাকায় তিন বস্তা ধান কেটে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
টিআইবির ভাষ্য : এসব বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (বাংলাদেশ) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের খাদ্য সরবরাহ ও বিপণনব্যবস্থাটাই দুর্নীতিগ্রস্ত। বিশেষ করে সরকারি পর্যায়ে খাদ্য সংগ্রহ, বিতরণ বা বিপণনের প্রতিটি ধাপে সক্রিয় সিন্ডিকেট রয়েছে। এর নিয়ন্ত্রণ সরকার পরিবর্তনের কারণে হাতবদল হয়, আবার কখনো কখনো উৎকোচ বা ঘুষের বিনিময়ে এরা সব সরকারের সময়ই টিকে থাকে। এ ব্যবস্থা থেকে বেরোতে হলে দেশে সরকারি পর্যায়ে খাদ্য মজুত ও বিপণনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।’