প্রতি বছরের মতো এবারও নদীতীরবর্তী মানুষ ভয়াবহ ভাঙনের মুখে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া ভাঙন চিত্রে শুধুই মিলছে মানুষের স্বপ্ন ভাঙার আহাজারি। এ বাস্তবতায় অনেকেই কপাল বা বুক চাপড়ে চাইছেন নিরাপত্তা, চাইছেন ফি বছরের এ বিপদ থেকে নিশ্চিত মুক্তি। নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
কলাপাড়া (পটুয়াখালী) : কুয়াকাটায় ৪০ থেকে ৫০ বছরে সমুদ্র দেড় থেকে দুই কিলোমিটার ভিতরের দিকে এগিয়ে এসেছে। অব্যাহত ভাঙনে গত এক দশকে বিলীন হয়েছে নারিকেল বাগান, এলজিইডির ডাকবাংলো, ডিসি পার্কের একাংশ, পূর্বের জাউবাগান, ভূমি অফিসের গেস্ট হাউস, হোটেল-মোটেলসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে হারিয়ে গেছে বহু মানুষের ঘরবাড়ি। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মৌসুম এলেই সমুদ্র লোকালয়ের দিকে আরও এগিয়ে আসে। জানা গেছে, সৈকতের ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলার উদ্যোগ নিলেও এতে স্থায়ী সমাধান মিলছে না। স্থানীয়রা জানান, এ উদ্যোগে সাময়িকভাবে ভাঙন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হচ্ছে না। তারা পর্যটননির্ভর কুয়াকাটার সৌন্দর্য ও অবকাঠামো রক্ষায় দ্রুত টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
খুলনা : শিবসা ও চৌমুহনী নদীর ভাঙনে খুলনার পাইকগাছার সোলাদানা পাটকেলপোতা থেকে ভ্যাকটমারি পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বর্তমানে জোয়ারের পানির চাপে বাঁধের মাটি ধসে পড়ছে। বাঁধের ওপরের সড়কের ইট সরে গিয়ে তৈরি হয়েছে বড় গর্ত। জোয়ারের সময় নদীর পানি বেড়িবাঁধে আছড়ে পড়লে আতঙ্কে থাকেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একইভাবে দাকোপ, কয়রা, বটিয়াঘাটার বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙন চলছে। কয়রার কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীভাঙনে মহারাজপুর, দলহালিয়া, হরিণখোলা, উত্তর ও দক্ষিণ বেদকাশিসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে বাঁধ ঝুঁকিতে রয়েছে। পাইকগাছায় শিবসা ও ভদ্রা নদীর ভাঙনে দেলুটি ইউনিয়নের কালিনগর, সোলাদানা ইউনিয়ন ও গড়াইখালী এলাকার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া বটিয়াঘাটার জলমা ইউনিয়নে কচুবুনিয়া, তেঁতুলতলা, বটিয়াঘাটা
বাজার, বারুইতলা ও সুরখালী ইউনিয়নের বড়আড়িয়া-সুন্দরমহল ও রায়পুর এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে।
বরিশাল : বরিশালের মেঘনা, তেঁতুলিয়া, আড়িয়াল খাঁ, কালাবদর, সুগন্ধা ও সন্ধ্যা নদীর ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে হুমকির মুখে রয়েছেন হাজারো মানুষ। অনেকের অভিযোগ, বর্তমানে প্রায় ৫৬ কিলোমিটার নদীতীর অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলার মেহেন্দিগঞ্জ, বাবুগঞ্জ, মুলাদী, বানারীপাড়া ও সদর উপজেলায় নদীভাঙন বেশি হয়েছে।
কুমিল্লা : কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের রঘুরামপুর গ্রামে গোমতী নদীর ভাঙনে ঝুঁকিতে রয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। কয়েক বছর ধরে নদীভাঙনে একের পর এক ফসলি জমি ও চলাচলের রাস্তা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এখন নদী চলে এসেছে বসতভিটার একেবারে কাছাকাছি। এতে ঘরবাড়ি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটছে স্থানীয়দের।
ফরিদপুর : পদ্মা, মধুমতী ও আড়িয়াল খাঁ নদীর তীব্র ভাঙনে দিশাহারা ফরিদপুরের ৫টি উপজেলার নদীপারের কয়েক হাজার মানুষ। বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এসব এলাকার নদীভাঙন। পদ্মার ভাঙনে ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থ চ্যানেল, ডিক্রিরচর, চরভদ্রাসন উপজেলার চরহরিরামপুর ও সদর ইউনিয়ন, আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে সদরপুর উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন এবং মধুমতী নদীর ভাঙনে আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হয়েছে। ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় আরও বেশ কিছু এলাকা রয়েছে হুমকির মুখে। বিস্তীর্ণ এলাকা ভাঙনের কারণে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি ও আবাদি জমি। জেলার মধ্যে নদীভাঙনের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র আলফাডাঙ্গা উপজেলায়।
পিরোজপুর : পিরোজপুরে সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে কাউখালী উপজেলার বাজার, ফেরিঘাট ও একটি গ্রাম হুমকির মুখে রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, নদীভাঙনের কারণে আমড়াঝুড়ির ফেরিঘাট এলাকায় বাজারের অধিকাংশ জায়গা নদীগর্ভে চলে গেছে। এমনকি কাউখালী থেকে পার্শ্ববর্তী জেলা ঝালকাঠিতে চলাচলের সড়কও নদীগর্ভে চলে গেছে।
লালমনিরহাট : তিস্তা নদীর ভাঙনে লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের ডান তীরের প্রায় ৩০০ মিটার কাঁচা সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে চরের ২ হাজারের বেশি পরিবারের মানুষের চলাচলে চরম দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, গত এক মাসে তিস্তা নদীর প্রবল স্রোত ও ভাঙনে সড়কটির প্রায় ৩০০ মিটার অংশ নদীগর্ভে চলে গেছে। বর্তমানে ভাঙন কিছুটা কম থাকলেও নদীতে পানি বাড়লে নতুন করে ভাঙন দেখা দিতে পারে।
হবিগঞ্জ : হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কালনী-কুশিয়ারা নদী সর্বনাশা রূপ নিয়েছে। নদীর তীরে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। ফলে প্রতিদিনই কোনো না কোনো গ্রামের বসতভিটা বিলীন হয়ে চলে যাচ্ছে। সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন নদীতীরবর্তী গ্রামের বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কালনী-কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোর মধ্যে বর্তমানে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ফিরোজপুর, সৌলরী, বদলপুর, শাহানগর, কাকাইলছেও, কালনীপাড়া, নদীপুর, মনিপুর, কাদিপুর, জয়নগর ও কন্যাজুড়িসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের তীরবর্তী বাসিন্দারা।
গাইবান্ধা : গত বৃহস্পতিবার সকালে তিস্তা নদীর ভাঙনে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের লাল চামার সিংগীজানী গ্রামের ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এক সপ্তাহের ভাঙনে প্রাথমিক বিদ্যালয়টিসহ দেড় শ বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হঠাৎ করে বসতভিটা হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। ভাঙন আতঙ্কে আরও দুই শতাধিক পরিবার তাদের ঘরবাড়ি, গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন অন্যত্র। এ ব্যাপারে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি ওপর মহলে জানানো হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ : চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর এলাকায় পদ্মা নদীর তীরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে করে নারায়ণপুর, আলাতুলী এবং শিবগঞ্জ উপজেলার পাকা ইউনিয়নে বসবাসকারী প্রায় ৫০ হাজার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজির হোসেন জানান, দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে মানচিত্র থেকে মুছে যাবে দুটি ইউনিয়ন।
পটুয়াখালী : পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আইরিন আক্তার জানিয়েছেন, মির্জাগঞ্জে পায়রা নদীর প্রায় ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন সক্রিয় রয়েছে। উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে পাঁচটিই পায়রা নদীতীরবর্তী হওয়ায় এসব এলাকায় ঝুঁকির মাত্রা বেশি।
শরীয়তপুর : শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মা নদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের মধ্যেই তিনটি স্থানে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। বর্তমানে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় ৫০০ পরিবারের ঘরবাড়ি। এতে আতঙ্কে দিন কাটছে নদীতীরের বাসিন্দাদের।
নেত্রকোনা : নেত্রকোনায় সোমেশ্বরী, কংশ, মগড়া ও ধনু নদী ভাঙনের কবলে রয়েছে দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, সদর, বারহাট্টা, আটপাড়া ও খালিয়াজুরী উপজেলার বেশ কিছু গ্রাম। সদর উপজেলার কেগাতি ইউনিয়নে কংশ নদীর ভাঙনে চন্দ্রকোনা বাজার ও মুক্তিযোদ্ধা বাজার হুমকির মুখে রয়েছে। বারহাট্টা উপজেলার ফকিরের বাজার থেকে রায়পুরে যাওয়ার সড়কটিও ভাঙনের মুখে রয়েছে। একই অবস্থায় রয়েছে আটপাড়া উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রাম। খালিয়াজুরী উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের পাঁচহার গ্রামও ভাঙনের মুখে রয়েছে।
নড়াইল : নড়াইলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মধুমতী, নবগঙ্গা ও চিত্রা নদীর তীব্র ভাঙনে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন নদীপারের হাজার হাজার মানুষ। বিভিন্ন পয়েন্টে একের পর এক বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়। সর্বশেষ সদর উপজেলার হবখালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রাচীরে ফাটল ধরা ও পাজারখালী মহাশ্মশানের বড় অংশ নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
খাগড়াছড়ি : খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় খরস্রোতা মাইনি নদীর ভাঙনে প্রতিনিয়ত নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা। সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাঙন আরও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
কৃষকরা তাদের আবাদি জমি হারিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এখন বসতভিটা নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষ।