দেশে ডেঙ্গুজ্বরের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। চলতি সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী ছিল এবং তখন থেকেই সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়ছিল রোগীর প্রচণ্ড চাপ। সব মিলিয়ে ঢাকাসহ সারা দেশেই এখন ডেঙ্গুর দাপট উচ্চ মাত্রায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১ সেপ্টেম্বর ও ১২ সেপ্টেম্বরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ১২ হাজারের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে মৃত্যু বেড়েছে ৪৬ জন। এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘থেমে থেমে বৃষ্টিপাত এবং ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার অনুকূল তাপমাত্রার কারণে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর জুড়েই ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ থাকতে পারে। এবার ডেঙ্গু আর শুধু ঢাকার রোগ নয়। এডিস মশা এখন জেলা, উপজেলা এমনকি অনেক গ্রামেও বিস্তার লাভ করেছে। এককথায় এ মশা এখন আর শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাই ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গু রোগী দ্রুত বাড়ছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৩৭ হাজার ১৭০ জন। এ সময় মৃত্যু হয় ১০২ জনের। ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজার ২৭৬ জনে এবং মৃত্যু বেড়ে হয় ১৪৩ জন। অর্থাৎ ১১ দিনের ব্যবধানে নতুন করে ১৩ হাজার ১০৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ৪৩ মৃত্যু যোগ হয়েছে।
ঢাকার বাইরে বাড়ছে রোগীর চাপ : বিভিন্ন জেলাতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ১ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় রোগীর চাপ ছিল উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে গাজীপুর জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১৯৫ জন, নারায়ণগঞ্জে ৯৩৫, মুন্সিগঞ্জে ৫৭১, নরসিংদীতে ৫০৬ এবং কিশোরগঞ্জে ৩৭১ জন। একই সময়ে ময়মনসিংহ বিভাগেও রোগীর সংখ্যা বাড়তে দেখা গেছে। ১০ দিন পর ১১ সেপ্টেম্বরের চিত্রে দেখা গেছে, এসব জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেড়েছে। গাজীপুরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৭৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। নারায়ণগঞ্জে ১ হাজার ১৯৭, মুন্সিগঞ্জে ৮৩১, নরসিংদীতে ৭৮৬ এবং কিশোরগঞ্জে ৫৪১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। ময়মনসিংহ বিভাগেও রোগীর সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৭৪০ জনে পৌঁছেছে।
চট্টগ্রাম জেলাতেও ডেঙ্গুর চাপ বেড়েছে। ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮৬২ জন, যা ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৩৪ জনে। কক্সবাজারে আক্রান্তের সংখ্যা ৯৬৩ থেকে বেড়ে ১ হাজার ১৬৬ জন হয়েছে।
হাসপাতালগুলোতে বাড়তি চাপ : রাজধানীর হাসপাতালভিত্তিক তথ্যেও রোগীর চাপ বাড়ার চিত্র মিলেছে। ১ সেপ্টেম্বর সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন ৩৪৮ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ছিলেন ১১৮ জন। সব মিলিয়ে তখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৪৬৬ জন। ১১ সেপ্টেম্বর সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৩৯৯ জনে দাঁড়ায়। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ছিলেন আরও ১৪৫ জন। সব মিলিয়ে ওই দিন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৪৪ জনে। অর্থাৎ ১০ দিনের ব্যবধানে হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীর সংখ্যা ৭৮ জন বেড়েছে।
মৃত্যুও বাড়ছে : ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে দ্রুত। এ বছর ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০২ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ১১ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে ১৪১ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ মাত্র ১০ দিনে মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট মৃতদের মধ্যে পুরুষ ৬৭ জন এবং নারী ৭৩ জন; অর্থাৎ আক্রান্তের সংখ্যায় পুরুষের অংশ বেশি হলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা সামান্য বেশি।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, ‘ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমাতে জ্বর আসার পর অন্তত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় পর চিকিৎসা নিতে গেলে রোগীর অবস্থা গুরুতর হয়ে শকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে ব্যক্তি ও কমিউনিটিকে সক্রিয় করা প্রয়োজন। এডিস মশা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তাই মানুষের বসতবাড়ি ও কর্মস্থলের আশপাশে মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল দ্রুত ধ্বংস করাই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি। প্রতিদিন নিজের বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় জমে থাকা পানি ফেলে দেওয়া, পাত্র উল্টে রাখা এবং মশার প্রজননের উপযোগী স্থান পরিষ্কার করতে হবে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের কাজটি একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যক্তি ও কমিউনিটি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
সেপ্টেম্বরে নতুন উদ্বেগ : আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সেপ্টেম্বরেও সংক্রমণের সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৩২৪ জন আক্রান্তের তথ্য থাকলেও ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ সংখ্যা বেড়ে ১৪ হাজার ৪৩০ জনে পৌঁছেছে। একই সময়ে সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচজন থেকে বেড়ে ৪৬ জনে দাঁড়িয়েছে।