Image description

কারিগরি ত্রুটির কারণ দেখিয়ে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দেওয়া নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার ঘোষণার পরই আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেক কমে যায়। কারিগরি ত্রুটি দেখিয়ে কৌশলে আদানি কর্তৃপক্ষ একটি ইউনিট থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াট কমিয়ে দেয়। এতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎসংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যাচ্ছেন না।

তাঁর এ ঘোষণার পরপরই বন্ধ করে দেওয়া হয় আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ। প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছিল। তবে দ্বিপক্ষীয় কিংবা ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর ভারত না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকা। এর মধ্যেই দেশে নতুন করে তীব্র হয়েছে বিদ্যুৎসংকট। ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ৮০০ মেগাওয়াট ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে গেছে। একই সময়ে দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছে গেছে। তবে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার আগেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা চাপে ছিল। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটের কারণে বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছিল না। 

১১ সেপ্টেম্বরের তথ্যানুযায়ী, আদানির কেন্দ্রটি আগের রাতে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করলেও একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়। কেন্দ্রটির কর্মকর্তারা জানান, বয়লারের একটি সমস্যার কারণে একটি ইউনিট বন্ধ হয়েছে এবং সেটি ঠান্ডা হতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা লাগতে পারে। আদানির বক্তব্য অনুযায়ী, সংকটের কারণ রাজনৈতিক নয়, প্রথমে কয়লা পরিবহনজনিত সমস্যা এবং পরে কারিগরি ত্রুটি। আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি হয়েছিল ২০১৭ সালে। কেন্দ্রটি মূলত বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্যই পরিচালিত হচ্ছে। অর্থাৎ এটি বর্তমান সরকারের করা চুক্তি নয়। আগের সরকারের সময় করা দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি বহাল রেখেই বাংলাদেশ এখন বিদ্যুৎ কিনছে।

২ সেপ্টেম্বর আদানি পাওয়ার বলেছিল, রেলওয়ে নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত চাপ, বিভিন্ন স্থানে লোডিং বিধিনিষেধ এবং কয়লা পরিবহনে বিঘ্নের কারণে গোড্ডা কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ কমে গেছে। কোম্পানিটি আরও জানিয়েছিল, তারা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি অবহিত করেছে এবং ভারতীয় রেলের সঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু এর কয়েক দিন পর যখন উৎপাদন আবার বাড়তে শুরু করল, তখন হঠাৎ একটি ইউনিট বয়লার-সংক্রান্ত সমস্যায় বন্ধ হয়ে গেল। পিডিবির একজন সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউনিটটির একটি ফিড ইউনিটে সমস্যা দেখা দেয় এবং অতিরিক্ত উত্তপ্ত হওয়ার কারণে ইউনিটটি বন্ধ করতে হয়। মেরামতের আগে সেটিকে ঠান্ডা হতে হয় এবং পুরোপুরি উৎপাদনে ফিরতে তিন থেকে চার দিন লাগতে পারে। বিশ্বের যেকোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রেই এমন ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু একটি দীর্ঘমেয়াদি আন্তদেশীয় বিদ্যুৎচুক্তির ক্ষেত্রে সমস্যাটি কত দ্রুত সমাধান করা হচ্চে এবং বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব কমাতে সরবরাহকারী কী ব্যবস্তা নিচ্ছে সেটিই বড় প্রশ্ন।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে অনেকটা আমদানিনির্ভর। গ্যাসসংকটের কারণে দেশের বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেও জাতীয় গ্রিডে বড় ঘাটতি এবং ব্যাপক লোডশেডিংয়ের খবর এসেছে। এ অবস্তায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের একটি আন্তদেশীয় কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা স্বাভাবিকভাবেই একটি কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করে। আর এ কারণেই আদানি চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে।

আগস্টে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফর নিয়ে আলোচনা চলছিল। ১৬ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, শেখ হাসিনার দিল্লি থেকে প্রকাশ্য বক্তব্যে সফর-প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আগে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন। এর পরও সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত সফর নিয়ে আলোচনা চলছিল।

৫ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা নেই এবং সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করে দেয়-তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না। আর এর পরই সামনে আসে আদানির গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর।

তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য নথি বা নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে তারেক রহমানের ভারত সফর না করার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ভারত সরকার বা আদানি পাওয়ার ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শাহাব এনাম খান সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে সরলভাবে “ভারতবিরোধী” হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।’ তাঁর মতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের সম্পর্ক রয়েছে। তবে ঢাকা এখন নিজের সার্বভৌম ও আইনগত অবস্থান প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে চাইছে। দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন এফ ড্যানিলোউইচের মতে অর্থবহ আলোচ্যসূচি ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে যাওয়া উচিত নয়। এ দুই বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের একটি জায়গায় মিল আছে-ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন আগের কাঠামোয় নেই। নতুন বাস্তবতায় দুই দেশকেই সম্পর্কের ভিত্তি পুনর্নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম এর আগে বলেছেন, আদানি চুক্তিতে গুরুতর অসাম্য থাকলে সেটি পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। আর ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম চুক্তিটিকে একতরফা হিসেবে সমালোচনা করে তা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।

সাধারণত লোডশেডিং বাড়লে মানুষের ক্ষোভ বাড়ে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়ে এবং রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হয়। তাই এ সংকটকে বাংলাদেশের ভিতরেও কেউ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে কি না, সেটিও অনুসন্ধানের বিষয় হওয়া উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আবার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে কি না, আদানি ইস্যু কেন্দ্র করে পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রচারণা হচ্ছে কি না, কিংবা কোনো পক্ষ সংকট কাজে লাগিয়ে সরকারবিরোধী বা ভারতবিরোধী জনমত তৈরির চেষ্টা করছে কি না-এসবও খতিয়ে দেখা দরকার।

কারণ বিদেশি চাপ থাকলেও সেটিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেরই।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, যদি এটি নিছক কারিগরি ত্রুটি হয়, তাহলে আদানি পাওয়ারকে দ্রুত স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করে বিস্তারিত প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা দিতে হবে। আর যদি কোনো রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক চাপের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্ন।