Image description

রেমিট্যান্স প্রবাহে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের তারল্য বাড়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্বস্তি ফিরেছে। একসময় ডলারের তীব্র সংকট, উচ্চ বিনিময় হার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্থিতিশীল। খোলা বাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা দরে। গত বছর এই সময় বিক্রি হয়েছে ১২৫ থেকে ১২৬ টাকায়। ডলারের স্বাভাবিক প্রবাহ থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার কিনছে। এতে বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ এবং আমদানি চাহিদার তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত অবস্থান ডলার বাজারে ভারসাম্য ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

গত কয়েক বছরে ডলারের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রিজার্ভের ওপর চাপ এবং ব্যাংক ও খোলাবাজারে ডলারের দামের বড় পার্থক্য নিয়ে উদ্বেগ ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের সরবরাহ বাড়ায় সেই চাপ অনেকটাই কমেছে। ২০২৩ সালের পর ডলার বাজারে যে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল সেই পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি কেটে গেছে। ২০২৪ সালের শুরুতেও ডলারের রেকর্ড দর ১৩০ টাকায় ওঠে। ২০২৪-২০২৫ সালে ডলারের ঘাটতি মোকাবিলা করতে হয়েছে। তবে গত কয়েক মাসে সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে পুরোপুরি স্থিতিশীল দরে কেনাবেচা হচ্ছে। 

খোলা বাজারে এখন সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা। বাজারে ডলারের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দীর্ঘদিন পর কেনা শুরু করেছে। গত সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় তিন মাস পর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নিলামের মাধ্যমে ৫০ মিলিয়ন বা ৫ কোটি ডলার কিনেছে। চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে সর্বশেষ গত ২০ মে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স হাউস থেকে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৪০ পয়সা দরে কিনেছে। এই সময় এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১২২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৬০ পয়সায়।

ডলারের এই স্থিতিশীলতার ওপর ভর করে দেশে বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৮ সেপ্টেম্বর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দুই বছরে মোট রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ১১ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার বা ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ইচগ৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভও একই সময়ে ১৯ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছেন প্রবাসীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৮৫ কোটি ৮৬ লাখ ডলার।

এর আগের অর্থবছরের একই মাসে এসেছিল ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। আগস্টেও রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল শক্তিশালী। ওই মাসে দেশে প্রায় ২৯৬ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের আগস্টের তুলনায় ২২ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। যদিও টানা তৃতীয় মাসে রেমিট্যান্স ৩০০ কোটি ডলারের নিচে ছিল, তবু প্রবৃদ্ধির হার ডলার বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। চলতি সেপ্টেম্বরেও একই ধারা অব্যাহত রয়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় দিনে দেশে এসেছে ৬৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৬৪৬ কোটি ২০ লাখ ডলার-আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ।

জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডলারের সংকট এখন দেশে নেই। এ কারণে দর একটি স্থিতিশীল পর্যায় রয়েছে। এটা ভালো দিক। তবে ডলারের চাহিদা কমায় মূলত ডলারের ঘাটতি নেই। গত কয়েক মাসে আমদানি এলসি কমেছে। দেশে প্রকৃত বিনিয়োগ কমেছে। ব্যাংকগুলোর উৎপাদন খাতে ঋণ প্রবাহ অনেক কম। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। এতে রিজার্ভ বাড়ছে। দেশের বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়লে এই রিজার্ভ হয়তো ভালো ভূমিকা রাখবে।