Image description

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা যাত্রীদের ঘিরে অন্তত শতাধিক অপরাধী চক্র সক্রিয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীদের টার্গেট করে প্রতারণা-ছিনতাই, ডাকাতি ও লুটের মতো ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। অথচ বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকা ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব সংস্থার নজরদারী রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে নিরীহ প্রবাসীরা থানায় অভিযোগও করছেন না তেমন। কারণ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসে একদিকে বাড়ি ফেরার তাড়া, অন্যদিকে প্রতারণার শিকার হয়ে থানায় গিয়ে মামলার ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে চান না। তাই দিনের পর দিন অপরাধীরা যাত্রীদের সঙ্গে অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বোনের বিয়েতে পাঠানো স্বর্ণ লুটের ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ওই ঘটনায় বিমানবন্দর এলাকার ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি নেতাসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কাওলায় সংঘটিত ওই ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন- বিমানবন্দর থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন শান্ত ও বিমানবন্দর ইউনিট বিএনপি’র সভাপতি আব্দুর রউফ। গ্রেপ্তার দুই নেতাসহ জড়িত চারজনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। পুলিশ সূত্র জানায়, ২৮শে আগস্ট রাতে বিমানবন্দর এলাকার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বলাকা ভবনের সামনে স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।

ওই ঘটনায় শনিবার মো. সুমন নামে এক ব্যক্তি বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন। পরে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সেদিনই জড়িত আব্দুর রউফ ও আল আমিন শান্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১০০ গ্রাম স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করা হয়েছে। মামলায় বিমানবন্দর ইউনিট বিএনপি’র সভাপতি আব্দুর রউফ, বিমানবন্দর থানা ছাত্রদলের সভাপতি রিপন হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আল আমিন শান্ত ও বিমানবন্দর ওয়ার্ড বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক রুবেলকে আসামি করা হয়। এজাহারে বলা হয়, ২৮শে আগস্ট মালয়েশিয়া থেকে ২০০ গ্রাম স্বর্ণালঙ্কার পাঠান বাদীর বড় ভাই। তার বন্ধু রোহানকে নিয়ে ওই দিন রাত ৮টার দিকে বিমানবন্দর থেকে স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে ভাড়া করা মাইক্রোবাসে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বলাকা ভবনের বিপরীত পাশে নামেন। সেখানে নামতেই ছিনতাইয়ের শিকার হন বাদী।

সৌদি আরব থেকে দীর্ঘদিন পর শুক্রবার দেশে ফিরেন সিলেটের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন। বিমানবন্দরে নামার পর ইমিগ্রেশন শেষ করে তিনি ওয়াইফাই কানেক্ট করে পরিবারের সদস্যদের দেশে পৌঁছানোর কথা জানান। এরপর তিনি নেটওয়ার্কের বাইরে চলে যান। কারণ তার কাছে কোনো দেশি সিম বা নেটওয়ার্ক ছিল না। ওদিকে, তার লাগেজে মার্কার কলম দিয়ে পরিবারের মোবাইল নম্বরসহ কিছু তথ্য লেখা ছিল। সেই তথ্যের ছবি তুলে রাখে প্রতারকরা। পরে আলমগীর বাসার উদ্দেশ্য রওনা দেয়ার পর প্রতারকরা বাড়ির নম্বরে ফোন দিয়ে জানায় কাগজপত্রে সমস্যা থাকার কারণে আলমগীরকে আটকে রাখা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ২০ হাজার টাকা দিলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। পরিবারের সদস্যরা ওই প্রতারকদের টাকা পাঠিয়ে দেন। বাড়ি পৌঁছানোর পর আলমগীর পরিবারের সদস্যদের কাছে এ বিষয়ে জানতে পেরে রীতিমতো অবাক হন। শুক্রবার র‌্যাব-১ এর কর্মকর্তারা আরেক প্রবাসীর সঙ্গে এ ধরণের ঘটনায় টাকা লেনদেনের আগে প্রতারককে আটক করেছেন।

সূত্র বলছে, বিদেশ থেকে আগত প্রবাসীরা যে গেইট দিয়ে বের হন তার বাইরে ওত পেতে থাকে তারা। যাত্রীর স্বজন, গাড়ি চালকদের ভিড়েই তারা স্বাভাবিক আচরণ করে। যাত্রীরা বের হওয়ার সময় কোন যাত্রীর সঙ্গে কোনো স্বজন নাই সেটি ফলো করে। তারপর স্বজনহীন যাত্রীদের তারা টার্গেট করে। যারা কম টাকায় গাড়ি খুঁজে তাদের কম ভাড়ার টোপে ফেলে, আবার যারা হেঁটে যায় তাদেরকে আরেক গ্রুপ টার্গেট করে। এভাবে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন চক্র ভিন্ন ভিন্নভাবে টার্গেট করে সব নিয়ে যায়।

সূত্রগুলো বলছে, বিমানবন্দরের ভেতরে যেমন অপরাধীরা সক্রিয় তেমনি বাহিরেও তারা থাকে। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে সামনের মোড়, হাতের বাঁ দিকে কিশোরগঞ্জ ও ভৈরবের বাস কাউন্টারের সামনে এবং পুলিশ বক্স থেকে একটু দক্ষিণে কাওলার মোড় এলাকায় ছিনতাইকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, দিন-রাত এই এলাকায় ছিনতাইকারীরা এক প্রকারের অভয়ারণ্য তৈরি করেছে। প্রবাসী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ অনেকেই প্রতিনিয়ত ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। দিনে ভবঘুরে টোকাই ছিনতাইকারী থাকলেও রাতে সংঘবদ্ধ ছিনতাই চক্র এলাকায় ঘোরাফেরা করে। এরাই প্রবাসীদের টার্গেট করে সর্বস্ব লুটে নেয়।

সিসি ক্যামেরা দিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, বিমানবন্দরের যাত্রী ঘিরে অন্তত শতাধিক চক্র সক্রিয় রয়েছে। সব সংস্থারই আলাদা আলাদা টিম যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে কাজ করে। কিন্তু অপরাধীরা নানা কৌশল অবলম্বন করে কাজ করে। এ ছাড়া তারা তাদের সুবিধাজনক স্থান ছাড়া ডাকাতি ছিনতাই করে না। আর সব জায়গায় বিভিন্ন পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা থাকে না। তাই বিমানবন্দর ও আশপাশের পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হচ্ছে। আগেও যেসব ক্যামেরা ছিল তার পাশাপাশি নতুন আরও শতাধিক ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। বিমানবন্দর থানা সূত্র জানিয়েছে, কাওলা থেকে উত্তরার ‘জসিম উদ্দিন মোড়’ পর্যন্ত পুরো এলাকাকে সিসিটিভি’র আওতায় আনা হচ্ছে। ২৫টির মতো ক্যামেরা থার্ড টার্মিনালের সামনে থেকে গোলচত্বর মোড় পর্যন্ত কাজ করছে। এর বাইরে ক্রাউন প্লাজা থেকে শুরু করে জসিম উদ্দিন পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে, অর্থাৎ বিমানবন্দরের স্টেশনের সামনে থেকে রেললাইন পার হয়ে হজ ক্যাম্প পর্যন্ত পুরো এলাকাকে আমরা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মির্জা তারেক আহমেদ বেগ মানবজমিনকে বলেন, পুলিশের পাশাপাশি বেবিচক, সিটি করপোরেশন, ক্রাউন গ্রুপসহ বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে সিসি ক্যামেরা লাগানোর কাজ চলছে। আমাদের টহল নজরদারির পাশাপাশি সিসি ক্যামেরা থাকলেও কোথায় কি ঘটছে সেটি আমরা থানায় বসে দেখতে পারবো। অত্যাধুনিক ক্যামেরার কারণে সেগুলোর ফুটেজও খুব পরিষ্কার হয়। সহজেই অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারবো। তিনি বলেন, আমাদের নিয়মিত অভিযান চলমান আছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু অপরাধী গ্রেপ্তার হয়েছে। আবার অনেকে জামিনে বের হয়ে আবার একই কাজ করছে। আমরা তাদের ধরার চেষ্টা করছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রবাসীদের নিরাপত্তা। এখানে যে অপরাধ করবে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তাকেই আইনের আওতায় আনা হবে। এক্ষেত্রে কারও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় আনা হবে না।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ইলিয়াস কবির মানবজমিনকে বলেন, আমাদের একটা টিম কাজ করে। কিন্তু ওরা খুব চালাক। কখন কোন জায়গায় করে সেটা বোঝা যায় না। বিমানবন্দরের আশপাশে করে না। আর যারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তাদের অনেকেই থানায় অভিযোগ দেন না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া মাত্রই আমাদের টিম কাজ করে। এর আগেও আমরা অনেককে শাস্তির আওতায় এনেছি।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের-১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নেয়ামুল হালিম মানবজমিনকে বলেন, এ ধরনের অনেক অভিযোগ আমরা পাচ্ছি। শুক্রবারও একটা অভিযোগ পেয়ে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। কিন্তু সমস্যা হলো- ওরা খুব কৌশলে কাজ করে। আমাদের যারা ওই এলাকায় দায়িত্ব পালন করে তাদের চেহারা পরিচিত হয়ে গেছে। সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করলেও তারা আমাদের চিনে। তাই আমাদের উপস্থিতি টের পেলে তারা সতর্ক হয়ে যায়। আর একটু সরলে তারা আবার অপকর্ম করে। তিনি বলেন, একবারে নিরীহ মধ্যেপ্রাচ্যর যাত্রীদের সঙ্গে তারা এসব করে। একেক যাত্রীর সঙ্গে একেকভাবে প্রতারণা করে।