Image description

দেশে চলাচল করছে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান। এসব যানবাহনের দৈনিক বিদ্যুত্ চাহিদা দেশের মোট বিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রায় ৫ শতাংশ বা তারও বেশি। বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৩০০টি। বিপরীতে শুধু ঢাকাতেই ৪৮ হাজারের বেশি অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে ধারণা সরকারের।

এসব অবৈধ চার্জিং পয়েন্টে বিদ্যুত্ ব্যবহারের কারণে জাতীয় গ্রিড এবং স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধ বিদ্যুত্ ব্যবহারের কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে সরকারের। এছাড়া, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার সড়ক নিরাপত্তা, যানজট ও পরিবেশ দূষণেও চাপ বাড়াচ্ছে।

গতকাল সোমবার সংসদে কার্যপ্রণালি-বিধির ৭১ বিধিতে সংরক্ষিত মহিলা আসনের বিএনপি দলীয় সদস্য রেহানা আক্তার রানুর আনা জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের ওপর দেওয়া জবাবে এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ‘নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা চলাচল প্রসঙ্গে’ শিরোনামে আনা নোটিশে সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ট্রাফিক ক্যামেরা স্থাপনের পর লালবাতি অমান্য, লেন পরিবর্তন ও নির্ধারিত গতিসীমা লঙ্ঘনের মতো অনিয়ম কমেছে। কিন্তু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বেপরোয়া চলাচল করছে। এসব যানবাহনের নম্বর প্লেট না থাকায় এআই ক্যামেরায় শনাক্ত হলেও জরিমানা করা সম্ভব হচ্ছে না।

নোটিশের ওপর দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও অনুরূপ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান নগর ও গ্রামীণ পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। কম ভাড়া, সহজলভ্যতা ও স্বল্প দূরত্বে দ্রুত যাতায়াতের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে এসব যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে দ্রুত ও অনেকাংশে অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের কারণে এ খাত এখন বিদ্যুত্ ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিপুলসংখ্যক যান একসঙ্গে চার্জ দেওয়ায় স্থানীয় বিদ্যুত্ বিতরণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। অনুমোদিত বা আবাসিক বিদ্যুত্ সংযোগের বাণিজ্যিক ব্যবহার, ট্রান্সফরমার ও বিতরণ লাইনে বাড়তি লোড এবং পিক সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির মতো সমস্যাও দেখা দিচ্ছে।

নোটিশে রেহানা আক্তার রানু বলেন, অটোরিকশা তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হওয়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ বাহনে পরিণত হয়েছে। ফলে, একদিকে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব যানবাহনের কাঠামোগত ত্রুটি দূর করা প্রয়োজন, অন্যদিকে প্রধান সড়কে বেপরোয়া চলাচল নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। তিনি অটোরিকশায় নম্বর প্লেট সংযোজন, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের আওতায় আনা এবং প্রধান সড়ক থেকে এসব যান সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন।

নোটিশের ওপর দেওয়া বক্তব্যে সংরক্ষিত আসনের এই সংসদ সদস্য বলেন, বর্তমানে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চলাচলের পাশাপাশি ঢাকায় প্রতিদিন আরো প্রায় ৩০০টি অটোরিকশা যুক্ত হচ্ছে। তার দাবি—প্রতিদিন অটোরিকশার চার্জিং খাতে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ খরচ হচ্ছে, যা বর্তমানে লোডশেডিংয়ের অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধভাবে সংযোগ নিয়ে চার্জিং করায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না। তবে, অটোরিকশার সঙ্গে বিপুল মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত উল্লেখ করে তিনি বিকল্প পরিকল্পনা ছাড়া এসব যানবাহন জব্দ, ডাম্পিং বা চালকদের হয়রানি না করারও আহ্বান জানান।

২০২৫ সালে ৬,৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১১ জন নিহত ও ১৪,৮১২ জন আহত

হন; এর মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ১৩.৫৪ শতাংশ

রানুর নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল শুধু যানজট নয়, সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। মন্ত্রীর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় যুক্ত যানবাহনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অংশ ছিল ১৩.৫৪ শতাংশ। মন্ত্রী জানান, অনিবন্ধিত যান, অপ্রশিক্ষিত চালক, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, ব্রেক ও আলো ব্যবস্থার ত্রুটি, অতিরিক্ত গতি এবং মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট রুট, স্ট্যান্ড, পার্কিং ও যানসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ঢাকায় এসব যান যানজট ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করছে।

ব্যবহূত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ে সিসাদূষণ, মাটি ও পানিদূষণ হচ্ছে;

এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে শিশু শ্রমিকদের, কৃষি ও পোল্ট্রি শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে

অটোরিকশায় ব্যবহূত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা ও অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের কারণে সিসাদূষণ, মাটি ও পানিদূষণ বাড়ছে। এতে বিশেষ করে শিশু শ্রমিকদের গুরুতর স্বাসঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কৃষি ও পোল্ট্রি শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে বর্তমানে ৫০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরা চালু রয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে অটোরিকশাসহ অন্যান্য যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় রমনা ও তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগে আরো ২০০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের কার্যক্রম চলছে। পর্যায়ক্রমে ঢাকা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়েও এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা হচ্ছে, বাস্তবায়ন হলে নির্ধারণ

হবে চলাচলের সড়ক, যানবাহনের সংখ্যা ও চলাচল ব্যবস্থাপনা

অটোরিকশাকে একটি সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে অনুমোদিত অটোরিকশাকে নম্বর প্লেট ও কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে। চালকদের নিবন্ধনের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে। নির্ধারণ করা হবে চলাচলের সড়ক। যানবাহনের সংখ্যা, রুট, চালক এবং চলাচল ব্যবস্থাপনাও নিয়ন্ত্রণ করা হবে। একটি নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে যাতে একাধিক অটোরিকশা চালানো না যায়, সে ব্যবস্থাও করা হবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে ব্যাটারি ও যানবাহন ট্র্যাক করার ব্যবস্থার কথাও জানান মন্ত্রী।

নোটিশের ওপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জবাব দেওয়ার পর রেহানা আক্তার রানু বলেন, তিনি অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করার কথা বলেননি। বরং চলাচল নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, অটোরিকশার সঙ্গে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। তাই তাদের বিকল্পব্যবস্থা না করে বাহন জব্দ, ডাম্পিং বা পুলিশি হয়রানি করা ঠিক হবে না। বরং প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের সুযোগ দিতে হবে।

সরকারের লক্ষ্য বেকারত্ব না বাড়িয়ে ও কর্মসংস্থান

ব্যাহত না করে সুশৃঙ্খল চলাচল নিশ্চিত করা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেছেন এবং নীতিমালা ও বিধি প্রণয়নের অগ্রগতি হয়েছে। কর্মসংস্থান যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, পরিবেশ রক্ষা হয়, যানবাহনের শৃঙ্খলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয়—সবদিক বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে বেকারত্ব না বাড়িয়ে, কর্মসংস্থান ব্যাহত না করে পরিবেশ রক্ষা এবং যানবাহনের সুশৃঙ্খল চলাচল নিশ্চিত করা।