প্রিমিয়ামের টাকা না নিয়েই ১০ হাজার ৭৬০টি নৌ-বীমা পলিসি বা কভার নোট ইস্যু করেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি এশিয়া ইন্স্যুরেন্স পিএলসি। এসব পলিসির বিপরীতে ১৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা প্রিমিয়াম নির্ধারিত হলেও কোম্পানির হিসাবে দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। বাকি ১৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা কোম্পানির প্রধান হিসাব বইয়ে দেখানো হয়নি। ২০২৫ সালের নিরীক্ষায় বিষয়টি ধরা পড়ার পর আগের কয়েক বছরের আর্থিক বিবরণী সংশোধন বা রিস্টেটমেন্ট করেছে কোম্পানিটি। নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান সাইফুল শামসুল আলম অ্যান্ড কোং তাদের প্রতিবেদনে বিষয়টিকে ‘আইন ও বিধির বিচ্যুতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমন অনিয়মের তথ্য।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের নোট ১.৬(খ) অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এশিয়া ইন্স্যুরেন্স ১০ হাজার ৭৬০টি নৌ-বীমা পলিসি বা কভার নোট ইস্যু করেছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নিয়ম অনুযায়ী, প্রিমিয়ামের টাকা গ্রহণ না করে বীমা পলিসি ইস্যু করা নিষিদ্ধ। তবে এসব ক্ষেত্রে সেই নিয়ম মানা হয়নি বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বীমা আইন, ২০১০ অনুযায়ী প্রিমিয়ামের টাকা জমা না নিয়ে নৌ-বীমাসহ কোনো সাধারণ বীমার কভার নোট বা পলিসি ইস্যু করা একটি গুরুতর ও দণ্ডনীয় অপরাধ। আইনের ১৮(১) ধারা অনুসারে, নগদ, চেক বা ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে প্রিমিয়াম পরিশোধ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বীমা কোম্পানি কোনো ঝুঁকি গ্রহণ করতে পারবে না। এ বিধান লঙ্ঘন করলে শাস্তির কঠোর বিধান রয়েছে।
আইনের ১৮(৪) উপ-ধারা অনুযায়ী, প্রিমিয়াম ছাড়া কভার নোট ইস্যু করলে সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানিকে অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হবে। এই জালিয়াতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিকেও সমান অঙ্কের অর্থাৎ ৫ লাখ টাকা জরিমানার সম্মুখীন হতে হবে। এ ছাড়া টাকা না পেয়েও দলিলে ‘টাকা পাওয়া গেছে’ এমন মিথ্যা তথ্য দিলে ধারা ১৩০ অনুযায়ী দোষী ব্যক্তির ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
আইডিআরএর একজন কর্মকর্তা কালবেলাকে জানিয়েছেন, বড় ধরনের অনিয়মে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির লাইসেন্স পর্যন্ত বাতিল বা স্থগিত হতে পারে। মূলত ভ্যাট ও স্ট্যাম্প ডিউটি ফাঁকি রোধ এবং বীমা খাতে স্বচ্ছতা ফেরাতে এই কড়াকড়ি। আইন বহির্ভূতভাবে ইস্যুকৃত এসব কভার নোটের কারণে ভবিষ্যতে বীমা দাবি নিষ্পত্তিতেও গ্রাহক ও কোম্পানি—উভয়পক্ষই বড় ধরনের আইনি জটিলতায় পড়তে পারে। তাই বীমা খাতের শৃঙ্খলা রক্ষায় আইনের এই ধারার যথাযথ প্রয়োগ অপরিহার্য।
নিরীক্ষকরা প্রিমিয়াম ও পলিসি-সংক্রান্ত বিষয়টির পাশাপাশি কোম্পানির তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কথাও উল্লেখ করেছেন। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডাটা এন্ট্রি কিংবা সিস্টেমে কোনো পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। এতে কোম্পানির আর্থিক তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদনের অ্যানেক্সার-সি-এর ৫৭ নম্বর পৃষ্ঠা অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির মোট বিনিয়োগের ক্রয়মূল্য ছিল ৫৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এসব বিনিয়োগের বাজারমূল্য নেমে আসে ৪২ কোটি ১ লাখ টাকায়। এই হিসাবে ক্রয়মূল্য ও বাজারমূল্যের ব্যবধান ১১ কোটি ১১ লাখ টাকা। অর্থাৎ শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির বিনিয়োগে লোকসান রয়েছে ১১ কোটি ১১ লাখ টাকা। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ (এনওসিএফপিএস) ছিল ২ টাকা ৮৫ পয়সা। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ টাকা ৮৯ পয়সায়। অর্থাৎ এক বছরে পরিচালন কার্যক্রম থেকে শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহ কমেছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। এর পরও ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত বছরের জন্য বিনিয়োগকারীদের ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সুপারিশ করেছে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ।
কোম্পানিটির ব্যালান্স শিট অনুযায়ী, গ্রাহকদের কাছ থেকে ১০ কোটি ৩১ লাখ টাকা প্রিমিয়াম জমা রয়েছে (ডিপোজিট প্রিমিয়াম)। তবে এর বিপরীতে কোনো পলিসি ইস্যু করা হয়নি। এ ছাড়া বিবিধ দেনাদার (সান্ড্রি ডেবটরস) হিসেবে কোম্পানিটি ১৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা দেখিয়েছে। এর একটি বড় অংশ আদায় হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষকরা।
কোম্পানির দাবি, এরই মধ্যে ৬০ শতাংশ অর্থ উদ্ধার হয়েছে। তবে কালবেলা এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে টানা ছয় বছর এত বড় ধরনের অনিয়ম চললেও তা প্রকাশ না হওয়া কোম্পানিটির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে বিষয়টি বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরের নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। প্রিমিয়ামের টাকা গ্রহণ না করে হাজার হাজার পলিসি ইস্যু এবং এর একটি বড় অংশের আয় হিসাবের বাইরে রাখার মতো বিষয় ছয় বছর ধরা না পড়া নিয়ন্ত্রক নজরদারির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
একটি নন-লাইফ বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কালবেলাকে বলেন, কোনো কোম্পানিতে বছরের পর বছর অনিয়ম চলতে থাকলে তা শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের সুশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, পুরো বীমা খাতের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কোনো অনিয়ম দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রক নজরদারির বাইরে থাকলে অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যেও বিধিবিধান মেনে চলার ক্ষেত্রে শৈথিল্যের সুযোগ তৈরি হয়। এতে বীমা কোম্পানির আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ে এবং পলিসি হোল্ডার ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের দায় শেষ পর্যন্ত পুরো খাতকে বহন করতে হতে পারে। তাই এ ধরনের ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এসব বিষয়ে জানতে এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) মো. রফিকুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে জমা হওয়া অর্থগুলো মূলত ডিপোজিট প্রিমিয়াম হিসেবে কোম্পানির দায় হিসেবে হিসাবভুক্ত ছিল। গ্রাহকের পলিসি ইস্যু হলে ওই দায় সমন্বয় হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে বিল অব লেডিং (বিএল) বা শিপমেন্ট অ্যাডভাইস না পাওয়ায় মেরিন কভার নোট পলিসিতে রূপান্তর করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, আগে কভার নোট ৯ মাসের মধ্যে পলিসিতে রূপান্তরের সুযোগ ছিল। ২০২৫ সালে নতুন সার্কুলারের পর সময়সীমা ২৪ মাস নির্ধারণ করা হলে পুরোনো কভার নোটগুলো পুনরায় যাচাই ও রিকনসিলিয়েশন করা হয়। এরপর নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে থাকা কভার নোটগুলো পলিসিতে রূপান্তর করা হয়েছে। এসব অর্থ হারিয়ে যায়নি; ডিপোজিট প্রিমিয়াম হিসেবে কোম্পানির হিসাবেই ছিল।
রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, প্রায় ১৭ কোটি টাকা বিবিধ দেনাদার হিসেবে রয়েছে। এর প্রায় ৬০ শতাংশ আদায় হয়েছে। দীর্ঘদিন পলিসিতে রূপান্তর না হওয়ার ঘটনায় দায়ী কর্মকর্তা এরই মধ্যে চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। ক্যাশ ফ্লোতে নেতিবাচক ব্যালান্সের বিষয়ে তিনি বলেন, অডিটকালীন প্রায় ৪ কোটি টাকা পাওয়া গেলেও তা ৩১ ডিসেম্বরের পর হাতে এসেছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালে সিএফওর মাধ্যমে জানান তিনি দেশে নেই।
টাকা না নিয়ে ১০ হাজার ৭৬০টি নৌ-বীমা পলিসি ইস্যু করায় এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এর আগে আইডিআরএ নিয়েছে কি না জানতে চাইলে সংস্থাটির মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি কালবেলাকে বলেন, ২০২২ সালে এশিয়া ইন্স্যুরেন্সকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। এরপর কোম্পানিটির বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে প্রিমিয়াম গ্রহণ না করে পলিসি ইস্যু এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসা বিভিন্ন বিষয়সহ সংশ্লিষ্ট অনিয়মগুলো নিয়ে আইডিআরএ কাজ করছে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।