Image description

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র শাহবাগে অবস্থিত শহীদ জিয়া শিশু পার্ক। একসময় শিশু-কিশোরদের কলকাকলিতে মুখর থাকা বিনোদনকেন্দ্রটিতে ছুটির দিনে থাকত উপচে পড়া ভিড়।

মা-বাবার হাত ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা তো বটেই, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও শিশু-কিশোররা আসত এখানে। নাগরদোলা, ট্রেন, নানা ধরনের রাইড আর খোলা জায়গা জুড়ে ছিল আনন্দের আয়োজন। তবে সংস্কার ও আধুনিকায়নের কথা বলে ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি পার্কটি বন্ধ করে দেওয়ার পর বদলে গেছে চিত্র। তখন বলা হয়েছিল, এক বছরের মধ্যেই নতুন রূপে পার্কটি শিশুদের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
 
সেই এক বছরের প্রকল্প এখন গড়িয়েছে সাত বছরের বেশি সময়ে। অথচ সর্বশেষ হিসাবে প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৩০ শতাংশ।

শুধু সময়ই বাড়েনি, বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়ও। শুরুতে ৭৮ কোটি টাকার যে আধুনিকায়ন পরিকল্পনা ছিল, পরে তা পরিবর্তিত হয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নিজস্ব প্রকল্পে দাঁড়িয়েছে ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকায়।

অর্থাৎ প্রাথমিক পরিকল্পনার তুলনায় ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫২৬ কোটি টাকা। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়ও বারবার পিছিয়েছে। সর্বশেষ ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে পার্কটি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ডিএসসিসি। এখন প্রশ্ন উঠেছে, সাত বছরের বেশি সময়ে যেখানে প্রকল্পের ৭০ শতাংশ কাজই বাকি, সেখানে নতুন সময়সীমার মধ্যে আদৌ তা শেষ হবে কি না?

জানা গেছে, ২০১৯ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের কাজের অংশ হিসেবে পার্কের নিচে ভূগর্ভস্থ গাড়ি পার্কিং নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় পার্কের পুরনো রাইডগুলো সরিয়ে নেওয়া হয় এবং পার্কটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আধুনিকায়ন শেষে দ্রুত পার্কটি আবার চালুর পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে কাজ দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে।

প্রথম পরিকল্পনায় পার্কের আধুনিকায়নে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭৮ কোটি টাকা। পরে ডিএসসিসি নতুন করে বড় পরিসরে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়। ২০২৩ সালের আগস্টে ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। এর মধ্যে দেশের রাজনৈতিক পালাবদলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শেষে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। সেই সরকারেরও প্রায় সাত মাস হতে চলল, শিশু পার্কের সংস্কারকাজ শেষ হয়নি এখনো।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের জায়গা ১৫টি আধুনিক রাইড কেনা ও স্থাপন। এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৪৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ পুরো প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই ব্যয় হওয়ার কথা রাইডের পেছনে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ৪৮৩ কোটি টাকা সরকারের এবং ১২০ কোটি টাকা ডিএসসিসির নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়ার কথা। এত বড় অঙ্কের অর্থের মধ্যে রাইড কেনাকাটায় এত বেশি বরাদ্দ এবং একই সঙ্গে রাইড কেনার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. খয়বর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, রাইড কেনার দরপত্র আগে দুইবার বাতিল হয়েছে। তৃতীয়বারের মতো দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে। এবার সঠিকভাবে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার আশা রয়েছে।

ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, পার্কের অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিশুদের বিনোদনের জন্য ১৫টি অত্যাধুনিক রাইড কেনার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আগামী বছর জুনে পার্কটি চালুর চেষ্টা চলছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে শিশু পার্ক এলাকায় দেখা যায়, পুরনো স্থাপনা ও রাইড সরিয়ে নেওয়ার পর নতুন অবকাঠামো নির্মাণের কিছু কাজ হয়েছে। তবে পুরো এলাকায় প্রত্যাশিত কর্মচাঞ্চল্য চোখে পড়েনি। দৃশ্যমান
কাজের মধ্যে ড্রেন নির্মাণসহ কিছু অবকাঠামোগত কাজ দেখা গেলেও কাজের গতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, আগামী বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে। তবে রাইড কেনা ও স্থাপনে সময় লাগতে পারে। রাইড পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা এবং অন্যান্য কাজেও সময় প্রয়োজন হবে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব না হলে আরো ছয় মাস সময় বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।

উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্দেশে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের আওতায় শাহবাগে শিশু পার্কটি স্থাপন করা হয়। ১৯৮৩ সালে তৎকালীন ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কাছে এই পার্ক হস্তান্তর করা হয়। ওই সময় এটি ছিল ‘ঢাকা শিশু পার্ক’। পরে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা ঢাকার অবিভক্ত মেয়রের সময় এর নাম দেওয়া হয় ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক’। পরবর্তীকালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস শিশু পার্কটির নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পার্ক’। এটি করা হয় ২০২১ সালের ডিসেম্বরে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবার পরিবর্তন করে ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক’ নাম রাখা হয়েছে।