মিয়ানমারের আরাকান বা রাখাইনভিত্তিক রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মধ্যে অস্ত্র সংগ্রহের প্রতিযোগিতা বেড়েছে। নিজ নিজ দলের সদস্যসংখ্যা বাড়াতেও তারা বেশ তৎপর।
পুলিশ ও রোহিঙ্গা নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গত দুই বছরে অন্তত ১৯টি বড় সংঘর্ষে ২৩ জন নিহত হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে চলতি বছরের ২০ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ক্যাম্পে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ২৯২ জন। সবচেয়ে রক্তাক্ত বছর ছিল ২০২৩ সাল। ওই বছর আরসা ও আরএসওর সংঘাতে নিহত হয় ৮৩ জন।
নাম প্রকাশ না করে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপের এক সদস্যের কালের কণ্ঠকে দেওয়া তথ্য মতে, সবচেয়ে বেশি অস্ত্র রয়েছে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা)। আরসার কাছে বর্তমানে অন্তত চার থেকে সাড়ে চার হাজার অস্ত্র রয়েছে। আরসার সদস্যসংখ্যা প্রায় সাত হাজার। বর্তমানে আরসার কমান্ডারের দায়িত্বে রয়েছেন রোহিঙ্গা আবদুল খালেক।
নবী হোসেনের প্রসঙ্গটি সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভায় ওঠে। সভায় কমিটির অন্যতম সদস্য এবং উখিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা নবী হোসেন ছিলেন কুখ্যাত ডাকাত। তিনি নাফ নদে ইয়াবা পাচারের পয়েন্টগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। এর পর বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কিনে গঠন করেছেন আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি নামের সংগঠন। গতকাল সোমবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে সরওয়ার জাহান চৌধুরী বলেন, নবী হোসেন এখনো নাফ নদ দিয়ে পাচারকালে ইয়াবা কারবারিদের কাছ থেকে দিনে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন।
নবী হোসেন তাঁর লোকজন নিয়ে একসময় নাফ নদের লালদিয়া ও হউসেরদিয়া নামের দুটি দ্বীপে ঘাঁটি গেড়েছিলেন। তখন মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান এনে প্রচুর টাকা হাতিয়ে অস্ত্রের মজুদ বাড়ান।
এমন অভিযোগও রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে থানাগুলো থেকে লুণ্ঠিত কিছু অস্ত্র নবী হোসেনের কাছে পৌঁছায়। ইয়াবা বিক্রির টাকায় এসব অস্ত্র তিনি কিনে নেন।
নিরপেক্ষভাবে এসব তথ্য যাচাই করা সম্ভব না হলেও এমন ঘটনা ঘটেছে বলে একাধিক রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়। ওই সময় নাফ নদে নবী হোসেনের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। তাঁর ইয়াবার ব্যবসাও ছিল একচেটিয়া।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অস্ত্রের সংখ্যায় তৃতীয় অবস্থানে রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে পুরনো সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও)। এই গ্রুপে অন্তত দুই হাজার অস্ত্র ও পাঁচ হাজার সদস্য রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের কমান্ডার মাস্টার আইউব। আরএসওর লোকজনের সঙ্গে নবী হোসেনের গ্রুপের বিরোধ রয়েছে। নবী হোসেনের দখল করা নাফ নদের একটি দ্বীপ বর্তমানে আরএসও দখলে নিয়ে ইয়াবা কারবারে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মধ্যে চতুর্থ আরাকান রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন (এআরও)। তাদেরও রয়েছে দেড় থেকে দুই হাজার সদস্য এবং কয়েক শ অস্ত্র। রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে ছোট গ্রুপ ইসলামী মাহাজ। রোহিঙ্গা আলেম-ওলামা ও মুজাহিদদের এ সংগঠনেও রয়েছে হাজার দেড়েক সদস্য এবং কয়েক শ অস্ত্র।
সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালনরত বিভিন্ন বাহিনী এবং রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমার-বাংলাদেশের সীমান্ত রেখা নাফ নদের আধিপত্য নিয়ে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপগুলোর যত বিরোধ। নাফ নদের মাঝখানে বেশ কয়েকটি দ্বীপ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে লালদিয়া (দ্বীপ), খেরেরদিয়া, হউসেরদিয়া, তোতারদিয়া ও জইল্যারদিয়া। এসব দ্বীপ মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচারের সময় ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে। এ কারণে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপগুলো এসব দ্বীপে আধিপত্য বিস্তারে তৎপর।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে নাফ নদ দিয়ে বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারের বিষয়টি এখন রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপগুলোর হাতে। রাখাইনে যেহেতু ইয়াবার বাজার নিয়ন্ত্রণ হয়ে থাকে, এ জন্য রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপগুলো ব্যাবসায়িক স্বার্থে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগসাজশে বাংলাদেশে ইয়াবার চালান পাচার করে থাকে। মিয়ানমার থেকে পাচার হয়ে আসা ইয়াবার চালানগুলোর সঙ্গে সশস্ত্র্র পাহারার ব্যবস্থাও থাকে। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অভিযানে এর মধ্যে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা গ্রেপ্তার ও ইয়াবার চালান জব্দ হয়েছে।
কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্প নম্বর-৮ ইস্ট থেকে আরসা কমান্ডার রোহিঙ্গা নূর আহমদকে গ্রেপ্তার করেন এপিবিএন-৮-এর সদস্যরা। তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে এপিবিএন-৮ অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে জানান, সম্প্রতি পরিচালিত অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নূর আহমদ কয়েক বছর আগে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঘটা একটি হত্যার ঘটনায় করা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।
তিনি জানান, গত মাসে বালুখালী ৯ নম্বর ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে আবুল হোসেন নামের আরো একজন আরসা সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেন এপিবিএন সদস্যরা।
অধিনায়ক বলেন, গত এক বছরে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পের মধ্যে ১১টি ক্যাম্প থেকে ১৪টি অস্ত্র, ৫৫ রাউন্ড গুলি, দুই লক্ষাধিক ইয়াবা, ৫১ জন অপহৃত ভিকটিমসহ ১৫১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
এসব বিষয় নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর আইন-শৃঙ্খলা দেখভালের দায়িত্বে থাকা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তারা জানান, আরাকানভিত্তিক রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠনের নেতাদের প্রতি কড়া বার্তা দেওয়া রয়েছে, কোনোভাবেই বাংলাদেশের সীমানার অভ্যন্তরে বেআইনি অস্ত্রশস্ত্র রাখা বা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ব্যাহত হয়—এমন কোনো ঘটনার অবতারণা করা যাবে না।
এ ব্যাপারে রোহিঙ্গা কাম্পের আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত এপিবিএন-৮-এর অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বেপরোয়া কর্মকাণ্ড আগের চেয়ে এখন কমে গেছে। মাঝে মধ্যে তাদের গ্রুপিং, খুনাখুনি এবং হানাহানি এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে, তখন তাদের সামাল দেওয়াই কষ্ট হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইয়াবা কারবারে জড়িত থাকার কারণে ক্যাম্পগুলোকে ইয়াবার ডিপো হিসেবে বেছে নেয় খুচরা কারবারিরা। এ জন্য ইয়াবা পাচার রোধে এপিবিএন সদস্যরা দিনরাত সজাগ রয়েছেন। এপিবিএন ইয়াবা, অস্ত্র ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের ধরার জন্য প্রায় প্রতি রাতে ক্যাম্পগুলোতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।