Image description

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বিশ্ববাজারের জ্বালানির দামের অস্থিরতার বড় মাশুল দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বেশি দামে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করায় বিপুল লোকসান গুনছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো।

একই সঙ্গে বাড়ছে সরকারের ভর্তুকির বোঝা। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই এলএনজি খাতে সরকারের ভর্তুকি সাত হাজার ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যেখানে পুরো বছরের জন্য বরাদ্দ ছিল সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববাজার থেকে চড়া দামে জ্বালানি তেল কিনে কম দামে বিক্রির ফলে গত আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) লোকসান দিয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর চড়া দামে এলএনজি আমদানি করে কম দামে বিক্রি করে গত ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে অতিরিক্ত ১৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে পেট্রোবাংলার।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ খাতের বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ও।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্র জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে লোকসান ধরা হয়েছিল ৪৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু কয়লা, ফার্নেস অয়েল ও এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরে বিপিডিবির লোকসান ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সব ধরনের জ্বালানি বেড়ে যাওয়ায় এক ধরনের টালমাটাল অবস্থা তৈরি হয়েছে।

তবে সরকারের প্রচেষ্টার কোনো কমতি নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও কঠোর মনিটরিংয়ের কারণে সংকট নিরসনে সরকার সাধ্যমতো সব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যুদ্ধের প্রভাবে গত ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে অতিরিক্ত ১৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। গত দুই মাসে এলএনজির জন্য পাঁচ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ভর্তুকি পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বকেয়া এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা যোগ হয়েছে।

অর্থাৎ সব মিলিয়ে গত দুই মাসে এলএনজিতে মোট সাত হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি পেয়েছে পেট্রোবাংলা।’

আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। একসময় প্রতি এমএমবিটিইউ ১০ থেকে ১২ ডলারে এলএনজি কেনা হলেও গত আগস্টে দাম বেড়ে ১৮ থেকে ২২ ডলারে ওঠে। সেপ্টেম্বরের জন্য কেনা ৯টি কার্গোর অধিকাংশের দাম পড়েছে ২৩ থেকে ২৪ ডলার। আর অক্টোবরের সর্বশেষ কেনা একটি কার্গোর দাম দাঁড়িয়েছে ২৮ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ।

পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্যনুযায়ী, গত বছরের প্রথম আট মাসে দেশে ৭১টি এলএনজি কার্গো আনা হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে এসেছে ৬৮টি। গত বছরের জুলাই-আগস্টে ২১টি কার্গো এলেও চলতি বছরের একই সময়ে এসেছে মাত্র ১৫টি।

এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণেই জ্বালানির আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এলএনজি আমদানির জন্য কাতার ও ওমানের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী তারা এখন আমাদের এলএনজি সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে বাধ্য হয়ে আমাদের স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে দাম বেশি পড়ছে এবং সরবরাহের নিশ্চয়তাও কমে যাচ্ছে। এলএনজি কার্গোর দাম বেড়ে যাওয়ার এটিই মূল কারণ। বাড়তি দরে জ্বালানি তেল কিনে কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে বিপিসির ব্যাপক হারে লোকসান বেড়েছে বলেও তিনি জানান।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘জ্বালানিসংকট সামাল দিতে বাধ্য হয়ে বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সরবরাহকারীরা ফোর্স মেজর ঘোষণা করায় স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচ হলেও মানুষের দুর্ভোগ ও শিল্প-কারখানার ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার এই ঝুঁকি নিচ্ছে।’

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক হারে দাম বেড়েছে। ফলে বাড়তি দরে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিন আমদানি করে দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করছে বিপিসি। এতে গত মার্চ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত সংস্থাটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা। আগস্ট শেষে লোকসান ২২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে বিপিসি সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. মনজুর আলম প্রধান বলেন, ‘বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও দেশের বাজারে সে অনুযায়ী দাম সমন্বয় করা হয়নি। ফলে লোকসানি দামে জ্বালানি বিক্রি করতে হচ্ছে।’

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি দামের চাপ সামাল দিতে গত ছয় মাসে দুই দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। প্রথম দফায় ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়। পরে মে মাসে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারে আরো ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। তবে এতেও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারের দামের ব্যবধান পুরোপুরি সমন্বয় হয়নি।

জ্বালানিসংকট ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বাড়তি দামে কয়লা ও ফার্নেস অয়েল কিনতে হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে। এর সঙ্গে গ্যাসের সংকট থাকায় সমপ্রতি ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে চার হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়বে।

বিপিডিবির কর্মকর্তারা জানান, গত জুনে বিদ্যুতের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। এরপর ধারণা করা হয়েছিল, বিদ্যুৎ খাতে সরকারের লোকসান কমবে। কিন্তু জ্বালানি আমদানির ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সেই হিসাব এখন পাল্টে গেছে। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা লোকসান ধরা হলেও তা ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লার সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়েছে। ফলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপ আরো বাড়বে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে ভর্তুকি ও লোকসানের চাপও কিছুটা কমে আসতে পারে।

এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যেভাবে দেশ এগোচ্ছে, তাতে সরকারের ভর্তুকির চাপ কমার সম্ভাবনা নেই; বরং তা আরো বাড়তে পারে। বর্তমানে জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে এলএনজি আমদানিকে ঘিরে। প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ২৮ ডলারে আমদানি করা হলে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে ৯০ টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এটি সরকারের জন্য বাড়তি আর্থিক বোঝা তৈরি করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য জ্বালানির দামও বেশি এবং বাজারে অস্থিরতা রয়েছে। সহসা এই পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষণ না থাকায় জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকি—দুটিই বাড়বে।’

তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতেও ভর্তুকির চাপ বাড়তে পারে। গত দেড় থেকে দুই মাসে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে অনেক বেড়েছে। শিল্প খাতকে সহায়তা করতে সরকার গ্যাস সরবরাহ বাড়ালে জ্বালানি তেলের ব্যবহারের চাপ আরো বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের সামগ্রিক আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।’

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনটি বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে শফিকুল আলম বলেন, প্রথমত, দেশের নিজস্ব গ্যাসের সর্বোচ্চ অনুসন্ধান ও উৎপাদনের চেষ্টা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয় রোধ করতে হবে। এই তিনটি ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করা না গেলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আর্থিক বোঝা কমানো সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে এ খাতকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করাও কঠিন হবে।’