Image description

আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে বলে আশাবাদ জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে এই উন্নতি কীভাবে সম্ভব? হঠাৎ করে কি বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে, নাকি কমবে চাহিদা? গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহ বাড়ার কারণেই কি পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে? নাকি আবহাওয়া পরিবর্তন হয়ে তাপমাত্রা কমলে বিদ্যুতের চাহিদা কমে আসবে?

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, আগস্ট মাসে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে মানুষকে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে যেন তা না হয়, সে জন্য সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলাম বুলবুলের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে লোডশেডিং বেড়েছে। দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়া, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা এবং রাতে গরমে ঘুমাতে না পারায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, অফিসের কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির দৈনন্দিন কাজেও এর প্রভাব পড়ছে। শিল্পকারখানাতেও বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

আবহাওয়া কতটা স্বস্তি দেবে?

বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবহাওয়া পরিবর্তন হলে পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। বৃষ্টি বাড়লে তাপমাত্রা কমে। ফলে ফ্যান ও এসির ব্যবহার কমায় বিদ্যুতের চাহিদাও কিছুটা কমে। অতীতেও বৃষ্টির পর তাপমাত্রা কমে বিদ্যুতের চাহিদা কমায় লোডশেডিং কমার নজির রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেলে ১৫ দিনের মধ্যেই লোডশেডিং কমানো সম্ভব। পাশাপাশি আবহাওয়া ঠান্ডা থাকলে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের চাহিদা কমে আসবে।

তবে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে খুব বেশি স্বস্তির খবর নেই। আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের দিকে দেশে মৌসুমি বায়ু সরে যেতে শুরু করবে। ফলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও কমে আসতে পারে। এতে ওই সময় তাপমাত্রা কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থাৎ শুধু আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে আগামী ১৫ দিনে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি কতটা সম্ভব, সেটিই বড় প্রশ্ন।

গ্যাসের সরবরাহই বড় বিষয়

বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান জ্বালানি গ্যাস। প্রতিমন্ত্রীর সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন।

বর্তমানে দেশীয় গ্যাস ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে দৈনিক ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে এই গ্যাসের পুরোটা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হলে শিল্প ও আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহে টান পড়বে।

এদিকে চুক্তি অনুযায়ী চলতি মাসে বেশ কয়েকটি এলএনজি কার্গো দেশে আসার কথা রয়েছে। এসব কার্গো নির্ধারিত সময়ে দেশে পৌঁছে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে পারলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও বাড়ানো সম্ভব হবে।

তেলভিত্তিক কেন্দ্রেও উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা

আবহাওয়া ও এলএনজির পাশাপাশি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর কথাও জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদনের চেষ্টা চলছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া ছিল। সংকট মোকাবিলায় অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এই অর্থ দিয়ে জ্বালানি আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের বন্ধ ইউনিট দ্রুত চালু করা এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

তাহলে ‘জাদুর কাঠি’ কী?

সব মিলিয়ে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হলে সেটি কোনও ‘জাদুর কাঠি’র ফল নয়। বরং কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করলেই পরিস্থিতিতে স্বস্তি আসতে পারে।

বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা কমে বিদ্যুতের চাহিদা কমা, নির্ধারিত সময়ে এলএনজি কার্গো দেশে পৌঁছে গ্যাস সরবরাহ বাড়া, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়ানো এবং বন্ধ বা কম উৎপাদন করা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল করা—এই সবকিছুর সমন্বিত ফল হিসেবেই পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

তবে বৃষ্টি কতটা হবে, এলএনজি কার্গো নির্ধারিত সময়ে দেশে পৌঁছাবে কিনা, গ্যাসের সরবরাহ কতটা বাড়বে এবং বন্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কত দ্রুত সচল করা যাবে—এসব প্রশ্নের ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে আগামী ১৫ দিনের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি।

তাই প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া ১৫ দিনের সময়সীমা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।