Image description

উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে হাঁসফাঁস। সংকটে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য। থমকে আছে নতুন-পুরাতন বিনিয়োগও। গ্যাস-বিদ্যুতের ধাক্কায় বন্ধের পথে অনেক শিল্পকারখানা।

উৎপাদনের চাকা ঘোরায় গতি নেই। তাই কর্মসংস্থানেও পড়েছে চাপ। মন্দা ব্যবসার চক্রে রাজস্ব আয়েও ভাটা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিট্যান্স ও রপ্তানিতে সাময়িক স্বস্তি ছাড়া অর্থনীতির অবস্থা অনেকটাই ভঙ্গুর। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ ১১ বছর পর পে-স্কেল অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এতে সরকারি কোষাগারে অতিরিক্ত খরচ হবে এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থসংস্থানের। পে-স্কেল ঘোষণার কারণে সরকারি-বেসরকারি খাতের বৈষম্য বৃদ্ধি, ব্যাংক থেকে সরকারের বাড়তি ঋণ ও উন্নয়ন বাজেটে টান পড়তে পারে। অনেকক্ষেত্রে আমলাদের কাছে রাজনৈতিক সরকারের অসহায়ত্ব প্রকাশ পেয়েছে বলে মত তাদের।

জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে একযোগে সব ভাতা কার্যকর হলে বছরে বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা, যা গত ২০২৫-২৬ অর্থবছর সরকারের রাজস্ব আয় ছিল চার লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। লক্ষ্যের চেয়ে যা ৮৭ হাজার কোটি টাকা কম।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারিদের বেতন-ভাতার বাড়তি টাকা আসবে কোথা থেকে-এমন প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। পে-স্কেল বাস্তবায়নে টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। ব্যাংকের ঋণে সুদের বোঝা বাড়বে। ভর্তুকি পরিশোধে দেরি করলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘœ ঘটতে পারে। উন্নয়ন বাজেটেও টান পড়তে পারে। তাই করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় হ্রাস ও ভর্তুকির যৌক্তিকীকরণের মাধ্যমে অর্থসংস্থান করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাজেট ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি সবচেয়ে বাড়বে। ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে সুদের বোঝা বাড়বে। এতে ভবিষ্যতে বাজেট ব্যবস্থাপনায় বড় আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বেসরকারি খাত এমনিতেই খারাপ অবস্থায় রয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোর বিশাল ব্যয়ের চাপে সরকার ভর্তুকি পরিশোধে দেরি করলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘœ ঘটতে পারে। ফলে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে। এতে বেসরকারি খাতসহ দেশের ১৮ কোটি মানুষের জীবনযাত্রা আরও সংকটের মুখে পড়বে। তাই সুষ্ঠু আর্থিক ও অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে নতুন পে-স্কেল সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

পে-স্কেলের টাকা জোগাড়ে উন্নয়ন বাজেটে টান পড়তে পারে বলে মনে করেন বেসরকারী গবেষণা সংস্থা নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ড. গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হবে। সরকার বাজেটের ভিতরে চার হাজার ৬০০ কোটি টাকা রেখেছিলো। বাকি টাকা মূলত দুটি উৎস থেকে আসার সম্ভাবনা আছে। ব্যাংক ঋণ থেকে একটি অর্থ আসবে। আর এডিপি বাস্তবায়নের হার যেহেতু সচরাচর ৮০ শতাংশের মতো বাস্তবায়ন হয়, সেহেতু তিন লাখ কোটি টাকার এডিপি থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকার মতো এখাতে ব্যয় করতে পারে। সাধারণত উন্নয়ন বাজেট ও অনুন্নয়ন বাজেটের মধ্যে ৪০-৬০ একটি অনুপাত থাকে। ইতিমধ্যে তা কমে ৩৩-৬৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এখন এটা আরও কমে উন্নয়ন বাজেট আরও সংকুচিত হওয়ার আশংকা আছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দুর্বল রাজস্ব আদায়ের মধ্যে সরকার ব্যাংক ঋণ বা নতুন টাকা সৃষ্টির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করলে বেসরকারি বিনিয়োগের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হতে পারে। মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে। উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বরাদ্দ কমিয়েও এ ব্যয় মেটানো সমীচীন হবে না। তাই করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় হ্রাস ও ভর্তুকির যৌক্তিকীকরণের মাধ্যমে অর্থসংস্থান করতে হবে। সরকারি খাতে নতুন পে-স্কেল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি করবে।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়নোয় তা দেশের পুরো শ্রমবাজারের মজুরি কাঠামোয় প্রভাব ফেলবে। কারণ এতে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু জ্বালানি সংকট, উৎপাদন, বিনিয়োগে স্থবিরতাসহ নানা কারণে বেসরকারি খাতের পক্ষে বেতন বাড়ানো নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি যৌক্তিক। এর ফলে সৎ কর্মচারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে। তবে জনগণের করের টাকায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে ঘুষ-দুর্নীতি কমা উচিত। গত ১১ বছরে তৈরি পোশাক খাতে বেতন ১৩৬ শতাংশ বেড়েছে। অন্যান্য বেসরকারি খাতেও বিভিন্ন হারে বেড়েছে। এ কারণে সরকারি পে স্কেলের সঙ্গে বেসরকারি খাতে বেতন পুনর্গঠনের কোনো সম্পর্ক নেই।

নিটওয়্যার শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বেসরকারি খাতের শিল্পকারখানা এমনিতেই নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত তিন বছরে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে। এ অবস্থায় মজুরি বাড়ানো হলে শিল্পমালিকদের পক্ষে তা বহন করা সম্ভব হবে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি কর্মীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কেবল সরকারি কোষাগারের হিসাব নয়। এর প্রভাব পড়বে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ ব্যয়, কর্মী ধরে রাখার সক্ষমতা, পণ্যের উৎপাদন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক মজুরি কাঠামোর ওপর। ব্যাংক, টেলিকম, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, ভোগ্যপণ্য, উৎপাদন, এনজিও, গণমাধ্যম-এসব খাতে কী হবে, এখনও পরিষ্কার নয়। বড় প্রতিষ্ঠানের কেউ কেউ বাজার ধরে রাখতে বেতন সমন্বয় করতে পারে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য একই হারে বেতন বাড়ানো কঠিন হতে পারে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও এই পে-স্কেল শ্রমবাজারের সিংহভাগজুড়ে থাকা বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয় না বাড়লেও খরচ বাড়বে, যা সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।

ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারের পে-স্কেল বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু কোন গ্রেডে কতটুকু বাড়ানো হবে, এরফলে কি ধরনের আর্থিক অভিঘাত হবে-সেই জায়গায় সরকারের সিদ্ধান্ত সুবিবেচনাপ্রসূত হয়নি। অনেকক্ষেত্রে আমলাদের কাছে রাজনৈতিক সরকারের অসহায়ত্ব প্রকাশ পেয়েছে। সরকারি খাতে সর্বসাকূল্যে ৩৩ লাখ কর্মসংস্থান হয়। এছাড়া বেশিরভাগই বেসরকারি খাতে চাকরি করেন। এতে বৈষম্যের জায়গাটা আরও উসকে দেবে।