দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। গত বছরের তুলনায় আক্রান্ত ২০ শতাংশ বেড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ২৫২ জন। এ সময় মারা গেছে চারজন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ডেঙ্গুর মানচিত্র বদলে গেছে। ২০২৫ সালে আক্রান্তদের প্রায় ৬৯ শতাংশই ছিল ঢাকার বাইরের। চলতি বছর সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৪ শতাংশে। এবার ঢাকার বাইরে অন্তত ১০টি জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। এর মধ্যে খুলনা, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, রংপুর ও কুড়িগ্রামে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
খুলনায় চলতি বছর এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে তিন হাজার ৪২৬ জন। গত বছর আক্রান্ত হয়েছিল এক হাজার ১৯৬ জন। বাগেরহাটে চলতি বছর আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ১০৯ জন। গোপালগঞ্জে আক্রান্ত ২২৯ জন, যেখানে গত বছর ছিল মাত্র ২১ জন। মুন্সীগঞ্জে চলতি বছর আক্রান্ত ৬১৫ জন; গত বছর ছিল ২৪৭ জন। কুড়িগ্রামে এ বছর আক্রান্ত হয়েছে ৯৬ জন; গত বছর পুরো বছরে আক্রান্ত ছিল ৫০ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও মৃত্যুর তথ্য রাখে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ওই বছর আক্রান্ত হয় তিন লাখের বেশি মানুষ এবং মারা যায় এক হাজার ৭০৫ জন। গত ২৫ বছরে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় আট লাখ মানুষ; মৃত্যু সাড়ে তিন হাজারের বেশি।
সেপ্টেম্বরে আরো ভয়াবহ হওয়ার শঙ্কা : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, থেমে থেমে বৃষ্টি, এডিস মশার জন্য অনুকূল তাপমাত্রা এবং মাঠ পর্যায়ের নজরদারির তথ্য—সবই সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর জুড়ে পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এডিস মশা এখন জেলা, উপজেলা, এমনকি অনেক গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে ডেঙ্গু আর শুধু ঢাকা কিংবা কয়েকটি বড় শহরের রোগ নয়।
কবিরুল বাশারের মতে, খুলনা, বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা নতুন হটস্পটে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু এসব এলাকায় মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও পৌরসভাগুলোরও মশা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব রয়েছে। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে কীটতত্ত্ববিদ নিয়োগ, নিয়মিত মশক জরিপ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
হাসপাতালে চাপ বাড়ছে : ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ায় বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগী সামলাতে হচ্ছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দদুলাল সাহা বলেন, বর্তমানে সেখানে প্রায় ২৫০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে ৩৭ জন। পৃথক দুটি ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ১৪০টি শয্যা থাকলেও মেডিসিন ওয়ার্ড এবং মেঝেতেও রোগী রাখতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. নুরুল ইসলাম বলেন, রোগীর চাপ বাড়লেও এখনো বড় ধরনের শয্যাসংকট তৈরি হয়নি। চাপ বাড়া হাসপাতালে অতিরিক্ত ওয়ার্ড চালু করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, আগস্টে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২০ হাজার ৫৩৬ জন। জুলাইয়ে এই সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২০৬। অর্থাৎ এক মাসে রোগী বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।
দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদের মতে, আরো অন্তত তিন থেকে চার দশক ডেঙ্গু বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে টিকে থাকতে পারে। অর্থাৎ ডেঙ্গুকে আর সাময়িক কিংবা মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এখন বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি। এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন বা স্ট্রেন। দেশের ১৮ থেকে ২০ কোটি মানুষের একটি বড় অংশ যতক্ষণ না চার ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জন করছে, ততক্ষণ সংক্রমণের চক্র চলতে থাকবে। এর সঙ্গে প্রতিবছর জন্ম নেওয়া নতুন শিশুরা যুক্ত হবে ডেঙ্গুর নতুন সম্ভাব্য রোগী হিসেবে। ফলে এই সংক্রমণচক্র থামার কোনো সহজ পথ নেই।