Image description

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫–২৬ অর্থবছরে আরও বেড়েছে। বর্তমানে দুই দেশের মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় পৌনে ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ ভারতে রফতানি করে ১ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। আর বাকি অর্থের পণ্য ভারত বাংলাদেশে রফতানি করে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল বাতেনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এ তথ্য জানান। একই অধিবেশনে ভারতের সঙ্গে গত পাঁচ অর্থবছরের বাণিজ্য ঘাটতির তথ্য জানতে বিএনপির সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান লিখিত প্রশ্ন করেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি বেশি থাকার বিষয়টি তুলে ধরে আব্দুল বাতেন জানতে চান, ঘাটতি কমাতে সরকার কোনও পদক্ষেপ নিয়েছে কি না। জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ভারত ও চীনের সঙ্গে ঘাটতি সবচেয়ে বেশি।

তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু দেশভিত্তিক না দেখে সামগ্রিকভাবে দেখা দরকার। পৃথিবীর বহু দেশের আমদানি বেশি, রফতানি কম। আবার অনেক দেশের ক্ষেত্রে রফতানি বেশি, আমদানি কম। তবে পুরো বিশ্বের হিসাব ধরলে আমদানি-রফতানি সমান।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের সামগ্রিক রফতানি সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া দরকার। এ জন্য কয়েকটি খাত চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে চামড়া, পাট, জাহাজ নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল ও সেমিকন্ডাক্টরসহ কয়েকটি খাত। যেসব খাতে রফতানি সক্ষমতা রয়েছে, সেসব খাতের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নীতি সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে রফতানি বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

আর যেসব খাতের রফতানি সক্ষমতা এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি, সেগুলোকে সেই পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের তথ্য তুলে ধরে খন্দকার মুক্তাদির বলেন, ‘গত বছরের যে পরিসংখ্যানের তুলনায় ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সেই ঘাটতিটা আরও বেড়েছে। প্রায় পৌনে ১৩ বিলিয়ন হচ্ছে আমাদের এখন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য। যেখানে আমরা রফতানি করি ১ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন। আর বাকিটা ভারত রফতানি করে আমাদের দেশে।’

ভারতের রফতানি সক্ষমতা আরও কয়েকটি খাতে রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ভারতের দিক থেকেও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছু বাধা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে গত দুই বছরে বাংলাদেশের দিক থেকেও কিছু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে।

সম্প্রতি ভারতের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশ সফরের কথা সংসদে তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মিলে অবকাঠামো উন্নয়নে একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে ওই প্রতিনিধি দল। সরকার এ প্রস্তাবে আগ্রহ দেখিয়েছে। এভাবে সমন্বিতভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে আগামী দিনে ভারতে বাংলাদেশের রফতানি আরও বাড়ানো যায়।

ভারত থেকে আমদানি বেশি হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার আমদানি করে না, মূলত বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরাই আমদানি করেন। তারা যখন আমদানি করেন, তখন অন্যান্য উৎসের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য পাওয়া যায়—এমন উৎসকেই বেছে নেন। উৎস হিসেবে ভারত বড় হলেও ব্যবসায়ীরা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী আমদানি করেন।

পাঁচ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে ঘাটতির চিত্র

বিএনপির সংসদ সদস্য লুৎফর রহমানের লিখিত প্রশ্নের জবাবে ভারতের সঙ্গে গত পাঁচ অর্থবছরের বাণিজ্য ঘাটতির তথ্য দেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২০–২১ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৭ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার। ২০২১–২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলারে।

২০২২–২৩ অর্থবছরে ঘাটতি কমে হয় ৭ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৭ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। পরের অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার।

২০২১–২২ অর্থবছরে ১১ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলারে ওঠার পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমলেও ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা আবার বেড়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরেও এই ঘাটতি আরও বেড়েছে।

সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ভারতের সঙ্গে

২০২৪–২৫ অর্থবছরে সার্কভুক্ত সাত দেশের মধ্যে চারটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল। দেশগুলো হলো—ভারত, পাকিস্তান, ভুটান ও আফগানিস্তান। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে ঘাটতিই ছিল সবচেয়ে বেশি।

ওই অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রফতানি ছিল ১ হাজার ৭৬৪ দশমিক ২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং আমদানি ছিল ৯ হাজার ৬২৪ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ৭ হাজার ৮৫৯ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ডলার।

পাকিস্তানের সঙ্গে রফতানি ছিল ৭৪ মিলিয়ন এবং আমদানি ৭৫৫ দশমিক ৩০ মিলিয়ন ডলার। ফলে ঘাটতি ছিল ৬৮১ দশমিক ৩০ মিলিয়ন ডলার। ভুটানের সঙ্গে রফতানি ১৪ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন এবং আমদানি ৪৪ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার; ঘাটতি ২৯ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলার। আফগানিস্তানের সঙ্গে রফতানি ১১ দশমিক ০৯ মিলিয়ন এবং আমদানি ২১ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ডলার; ঘাটতি ১০ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলার।

অপরদিকে নেপাল, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক উদ্বৃত্ত ছিল। নেপালের সঙ্গে উদ্বৃত্ত ২৯ দশমিক ৯০ মিলিয়ন, শ্রীলংকার সঙ্গে ৬ দশমিক ২৫ মিলিয়ন এবং মালদ্বীপের সঙ্গে ২ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।