Image description

দেশের সীমান্ত, বন্দর ও সামুদ্রিক এলাকাগুলো দিয়ে দেদার ঢুকছে মাদক। এমনকি আকাশপথ ও কুরিয়ার সার্ভিস দিয়েও আসছে নিত্যনতুন মাদক। ১৮টি সীমান্ত জেলার ১০৫টি পয়েন্টকে মাদকের সেফ রুট হিসেবে চিহ্নিত করেছে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। তারা বলছে, এ পয়েন্টগুলো দিয়েই ২৭ ধরনের মাদক আসছে নানা কায়দায়। ফলে শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত দেশের প্রতিটি স্থানেই মাদকের বিস্তার ঘটেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ‘অ্যানুয়াল ড্রাগ রিপোর্ট বাংলাদেশ ২০২৫’ অনুযায়ী, প্রধানত তিনটি করিডর দিয়ে ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক দেশে প্রবেশ করছে। সেগুলো হলো ভারত সীমান্তের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চল এবং মিয়ানমার সীমান্তের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার। আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো থেকেও উচ্চমূল্যের মাদক আসছে।

জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের রুট ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ এবং ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’-এর একেবারে কেন্দ্রে বাংলাদেশ। ভৌগোলিক অবস্থান এবং অরক্ষিত সীমান্তের কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রগুলো বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ পশ্চিম ও উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, উত্তরে আসাম, উত্তর ও উত্তর-পূর্বে মেঘালয় এবং পূর্বে ত্রিপুরা ও মিজোরাম দ্বারা বেষ্টিত। দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের (বার্মা) সঙ্গে সীমানা রয়েছে। অন্যান্য মাদকের পাশাপাশি ভারত থেকে গাঁজা ও ফেনসিডিল এবং মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ও আইস স্রোতের মতো দেশে প্রবেশ করছে। দেশে প্রবেশ করা মোট মাদকের ১৭ শতাংশ ঢাকা ও এর আশপাশ এলাকায় আসছে। আর বাকি ৮৩ শতাংশ মাদক সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। অল্প সময়ে ধনী হওয়ার প্রবণতা থেকে দেশের অসৎ লোকেরা মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। এ ব্যবসায় পৃষ্ঠপোষক, ব্যবসায়ী, বাহক ও বিক্রির নেটওয়ার্কে প্রতি বছরই লোকসংখ্যা বাড়ছে।

মাদকের প্রবেশপথ হিসেবে বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন ১৮টি জেলার ১০৫টি পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। এগুলো হচ্ছে দেশের পশ্চিমাঞ্চল সীমান্তের সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া, দেবহাটা, ভোমরা, কাকডাঙ্গী ও পলাশপুর; যশোর জেলার বেনাপোল, পুটখালী, চৌগাছা, নারায়ণপুর, শার্শা এবং আশপাশের এলাকা; চুয়াডাঙ্গা জেলার কারপাশডাঙ্গা, দর্শনা ও জীবননগর; মেহেরপুর জেলার দারিয়াপুর ও বুড়িপটা; রাজশাহী জেলার মনিগ্রাম, চারঘাট, সারদা, ইউছুফপুর, কাজলা, বেলপুকুরিয়া, হরিপুর, গোদাগাড়ি, বাঘা ও রাজশাহী সদর; চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট, শাহবাজপুর, বিনোদপুর, সোনামসজিদ স্থলবন্দর ও কানসাট; জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি (প্রধান প্রবেশপথ); দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট, ফুলবাড়ী, বিরামপুর, হিলি, হাকিমপুর, কামালপুর, বিরল, আকাশকারপুর, খানপুর, দাইনুর, মালিগ্রাম ও বনতারা; সিলেট জেলার জকিগঞ্জ, চুনারুঘাট ও মাধবপুর; ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার করিমপুর, কসবা, আখাউড়া, সিংগারবিল, পাহাড়পুর ও বিজয়নগর; কুমিল্লা জেলার জগন্নাথ দিঘি, চৌদ্দগ্রাম, গোলাপশাহ, কালিকাপুর, জগন্নাথপুর, রাজাপুর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া ও বিবিরবাজার এবং ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী ও পরশুরাম।

দেশের উত্তরাঞ্চল সীমান্তের কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী, রৌমারী, ভূরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী, বাশজানি, বলারহাট, বলাবাড়ি, কুটি চন্দ্রকোনা, পাথরডুবি ও নাখারগঞ্জ; লালমনিরহাট জেলার লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, পাটগ্রাম ও বুড়িমারী; শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী; ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া এবং নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা।

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল সীমান্তের কক্সবাজার জেলার জালিয়াপাড়া, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, শাহপরীর দ্বীপ, টেকনাফ, সাবরাং, সাউথপাড়া, ধুমধুমিয়া, জদিপাড়া, সাউথ হ্নীলা, লেদাপাড়া, চৌধুরীপাড়া, নোয়াপাড়া, হোয়াইক্যং, তুমরু উখিয়া, কাটাখালী, বালিখালী, ঘুমধুম ও কাটাপাহাড়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও কোস্টগার্ডসহ সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উদ্ধারকৃত মাদক, আসামি ও মামলার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৬ সাল এবং চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৪৪ কোটি ৯৯ লাখ ২৬ হাজার ৯০৭ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৪ হাজার ৭৮৯ কেজি হেরোইন, ২২৭ কেজি কোকেন, আফিম ৩৭৮ কেজি, ১১ লাখ ১৫ হাজার ৮০৮ কেজি গাঁজা, ১ কোটি ৩৬ লাখ ৪০ হাজার ১৫৩ বোতল ফেনসিডিল, অ্যাম্পুল ইনজেকটিং ড্রাগ ২২ লাখ ৭৫ হাজার ৫৮৬টি, ৩৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৫২ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া এই সময়ে ১২ লাখ ৫৭ হাজার ৮৮৮টি মামলায় ১৫ লাখ ৯২ হাজার ৬৫১ জন আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, সীমান্তের কোন কোন পথে মাদক আসছে সেটা আমরা চিহ্নিত করেছি। মাদকের প্রবেশ ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশ তৎপর রয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশও কাজ করছে। নিয়মিত চেকপোস্ট ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি আসামি গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদক নিয়ে আসা হচ্ছে। অনেক সময় লোভ-লালসায় পড়ে এজেন্সির লোকজন মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। যেসব বাহিনীর সদস্যরা এসব কাজে জড়াচ্ছে, জানতে পারলে তাদের শাস্তিও হচ্ছে। মাদক প্রবেশ ঠেকাতে পুলিশের তৎপরতা আরও বাড়ানো হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন, ‘মাদকের বিস্তার ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদকের গডফাদার, পৃষ্ঠপোষক এবং বিভিন্ন স্তরের কারবারির তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী অভিযান চালানো হচ্ছে। এ তালিকা নিয়মিত আপডেট করা হয়। অভিযানে মাদকসংশ্লিষ্টরা ধরা পড়ছে, পাশাপাশি মাদকও উদ্ধার হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রায়ই যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে। মাদকের অবৈধ ব্যবহার, কেনাবেচা ও অপরাধ তাৎক্ষণিকভাবে দমন এবং বিচার নিশ্চিত করতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।’