Image description

গণ অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আস্থার সংকটের চরম মূল্য চোকাচ্ছে গোটা চট্টগ্রাম অঞ্চল। পুলিশের চেইন অব কমান্ডে ফাটল, প্রশাসনিক রদবদলে দীর্ঘসূত্রতা এবং ‘প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিংয়ের’ অভাবে চট্টগ্রাম মহানগর (সিএমপি) ও রেঞ্জের ১১টি জেলা এখন মাদক সিন্ডিকেটগুলোর নিরাপদ স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। মাদকের এই অবাধ বিস্তারে গোটা অঞ্চলে হু-হু করে বাড়ছে খুন, ছিনতাই ও পারিবারিক সহিংসতা। লক্ষ্মীপুরে মাদকাসক্তের হাতে মা-বোনসহ ৭ খুন, কুমিল্লায় সংঘটিত অপরাধের ৭০ ভাগই মাদককেন্দ্রিক হওয়া কিংবা রাঙামাটিতে ছেলের হাতে মায়ের মৃত্যু-সব মিলিয়ে চরম সামাজিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েছে এই জনপদ।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক জাহিদ হোসেন মোল্লা বলেন, বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়েছে। গত মাসে চার শতাধিক মামলা দায়ের করেছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) নাজমুল হাসান বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে চট্টগ্রাম রেঞ্জের বিভিন্ন ইউনিট। মাদক প্রবেশের চিহ্নিত রুটগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্রান্তিলগ্নের সুযোগে চট্টগ্রাম অঞ্চলে মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন শুরু হয়েছে। পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা, প্রশাসনিক রদবদলে দীর্ঘসূত্রতা এবং ‘প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিংয়ের’ অভাবে চট্টগ্রাম মহানগর (সিএমপি) ও রেঞ্জের ১১ জেলায় মাদকবিরোধী অভিযানে রীতিমতো ধস নেমেছে। পুলিশের অফিশিয়াল অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিগত ১৭ মাসে সিএমপিতে মাদক মামলা দায়েরের হার কমেছে প্রায় ৩৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জে কমেছে ২৩ শতাংশ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে (আগস্ট ২০২৪ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫) পর্যন্ত মাদকসংক্রান্ত মামলা হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৪৭টি। অথচ এর আগের ১৭ মাসে (মার্চ ২০২৩-জুলাই ২০২৪) এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২৭৪টি। অর্থাৎ সিএমপিতে মামলা কমেছে ৩৭.৪৮ শতাংশ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রেঞ্জের বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে ১১ হাজার ২৫৫টি। যা পূর্ববর্তী ১৭ মাসের তুলনায় ১৪ হাজার ৫৭৯টি থেকে প্রায় ২৩ শতাংশ কম।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আস্থার সংকট ও নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে মাদক সিন্ডিকেটগুলো। ধরা পড়ার ঝুঁঁকি তলানিতে নেমে আসায় কারবারিরা আগের চেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা দ্রুত রুট পরিবর্তন করে নির্বিঘ্নে মাদকের বড় বড় চালান পাচার করছে। ফলে বন্দরনগরী ও সীমান্তঘেঁষা চট্টগ্রাম অঞ্চল বর্তমানে কার্যত মাদকের এক নিরাপদ স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত মাদক কারবারিদের অন্যতম নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়ি সত্ত্বেও নাফ নদ, দুর্গম পাহাড়ি পথ ও সাগরপথ ব্যবহার করে দেশে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ (আইস) ঢুকছে। ওপারে মিয়ানমারের রাখাইনে গড়ে ওঠা কারখানাগুলো থেকেই মূলত এসব মাদকের চালান আসছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ‘অ্যানুয়াল ড্রাগ রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, পাচারকারীরা এখন অনলাইনে যোগাযোগ ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহার করছে। নারী-শিশু থেকে শুরু করে শরীরের ভিতর ও যানবাহনের গোপন চেম্বার ব্যবহার করে মাদক বহন করা হচ্ছে। উখিয়া ও টেকনাফের অন্তত ৬০টি পয়েন্ট এবং সাগরপথে আনোয়ারা, বাঁশখালী ও কুয়াকাটার রুট দিয়ে মাদকের চালান আসছে। এতে স্থানীয় কারবারিদের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সিন্ডিকেটও ব্যাপকভাবে জড়িত। বিপুল এই আগ্রাসন ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সমন্বিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।