ইস্ট কোস্ট গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ওমেরা সোলার তাদের ১০০টির বেশি শিল্পকারখানার ছাদ থেকে এ পর্যন্ত ১৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। ওমেরা সোলারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, আগামী ছয় মাসে তাঁরা সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়িয়ে ১৮০ মেগাওয়াটে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছেন।
জাতীয় গ্রিড থেকে নেওয়া বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের খরচ ১১ দশমিক ৫৬ টাকা। আর সৌরবিদ্যুতে প্রতি ইউনিটের খরচ মাত্র ৫ টাকা। দিনে গ্রিডের বিদ্যুতের জন্য প্রতিষ্ঠানটির খরচ হয় ৪৪ লাখ ৪১ হাজার ৬০৮ টাকা। সেখানে সৌরবিদ্যুতে প্রতিষ্ঠানটির খরচ হয় ১৯ লাখ ২১ হাজার ১১১টাকা। অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করলে দিনে এই শিল্পগ্রুপের খরচ কমছে ২৫ লাখ ২০ হাজার ৪৯৭ টাকা। আর মাসে এই খরচ কমে ৭ কোটি ৫৬ লাখ ১৪ হাজার ৯৩৩ টাকা।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে শুধু দেশের বড় এই শিল্পগোষ্ঠীর বিদ্যুৎ খরচই কমছে না, বর্তমান জ্বালানি সংকটে তারা নিজস্ব উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে জাতীয় গ্রিডের ওপরও চাপ কমাচ্ছে।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের মতো দেশের অনান্য বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোও এখন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে। মূলত দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটসহ বিদ্যুৎ-জ্বালানির অতিরিক্ত মূল্যের জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে এক ধরনের বিপ্লব ঘটাচ্ছে। এক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ দিয়েই তারা মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করছে। শিল্প মালিকরা জানান, পুরোপুরি চাহিদা পূরণ করতে না পারলেও কারখানাগুলো সোলার রুফটপ দিয়ে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা উৎপাদন চালু রাখা যায়। এতে পণ্য উৎপাদন খরচও কমে আসবে। বিশেষ করে নেট মিটারিং চালুর পর ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে কারখানা মালিকরা কারখানায় অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে বিল সমন্বয়ের সুবিধা পাচ্ছেন।
দেশের শিল্পকারখানাগুলো গত দুই থেকে তিন বছরে বড় আকারে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে গিয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ৬শ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদনক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান-ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) গত ৪ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২৩৯টি বড় শিল্পকারখানার ছাদে স্থাপন করা সৌরবিদ্যুতের মোট সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৬৬৭ মেগাওয়াট। বিশ্বের বড় বড় পোশাক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে পোশাক ক্রয় করে। এক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শর্ত আছে ২০২৭ সালের পর যে কারখানাগুলোয় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হবে কেবল সে কারখানা থেকেই তারা পোশাক কিনবে। তাই আগামী দিনে দেশের পোশাক কারখানাগুলোয় সৌরবিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিভিন্ন শিল্পকারখানার মধ্যে এরই মধ্যে আকিজ সিরামিকস লি., আকিজ গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ লি., প্রাণ-আরএফএল, আবুল খায়ের স্ট্রিল, ডিবিএল গ্রুপ, রাইজিং গ্রুপ, বিএসআরএম, পলমল গ্রুপ, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার, মাইক্রোফাইবার গ্রুপ, হা-মীম গ্রুপ, জনতা জুট মিল, নাসির সিনোট্যাক্স অ্যালুমিনিয়াম ইন্ডাস্ট্রিজ লি., মাস্কো গ্রুপ, ফকির নিটওয়্যারস, স্নোটেক্স, বিআরবি কেবলস, জিপিএইচ ইস্পাত, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ এবং কাজী ফামর্সসহ অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কারখানায় সোলার রুফটপ স্থাপন করেছে।
ওমেরা সোলারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এখন সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে তার মূল্য গ্রিডের বিদ্যুতের অর্ধেকেরও কম। আর এক্ষেত্রে কারখানাগুলো সৌরবিদ্যুতে যে বিনিয়োগ করবে তা চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে উঠে আসবে। কারখানাগুলো ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ স্থাপন করলে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের যে লোডশেডিং তা থেকে কারখানাগুলোর ভোগান্তি দূর হবে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপ প্রাণ-আরএফএল-এর জনসংযোগ বিভাগের প্রধান তৌহিদুজ্জামান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এ মুহূর্তে সারা দেশের ২০টি কারখানা থেকে প্রাণ গ্রুপ ৩৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। আর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ আমরা জাতীয় গ্রিডে দিচ্ছি। এ বছরের শেষ নাগাদ উৎপাদন বাড়িয়ে ৮০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য কাজ চলছে। আগামী দুই বছরের আমাদের টার্গেট আছে ১২০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করার। পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে প্রাণের।
তৈরি পোশাকশিল্পের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান রাইজিং গ্রুপের চারটি গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল কারখানায় মোট ১৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এই কারখানাগুলোতে ৮০ শতাংশ সোলার রুফটপ স্থাপন করা হয়েছে। অবশিষ্ট ২০ শতাংশে সোলার রুফটপ স্থাপনের পরিকল্পনা আছে। রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আগে পোশাক কারখানার মালিকরা খুব বেশি সোলার রুফটপের বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু গত এক বছর ধরে তাদের আগ্রহ বেড়েছে। আগে এটি কমপ্লায়েন্স ছিল কিন্তু এখন এটি বিজনেস কেস। এটি স্থাপন করলে মালিকরা উপকৃত হবেন। আমাদের মোট বিদ্যুতের চাহিদার ৩০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মেটানো সম্ভব। সুপারস্টার রিনিউয়েবল এনার্জি গত ৫-৭ বছরে ১৫০টি কারখানায় ১০০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সোলার রুফটপ স্থাপন করেছে। এই চাহিদা দিন দিন আরও বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডিজেল জেনারেটরে শিল্পকারখানায় প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় যে উৎপাদন খরচ হয় তার থেকে রুফটপ সোলারে খরচ অনেক কম। এ ছাড়া পোশাক শিল্পে গ্রিন এনার্জির যে কমপ্লায়েন্স আছে তা বিবেচনায় নিলে এই কারখানাগুলো সোলার রুফটপকে অবশ্যই প্রাধান্য দেবে। এ ছাড়া এখানে ৭ শতাংশ হারে কারখানা মালিকরা ব্যাংক থেকে ঋণও পাচ্ছে।