Image description

সৌদি আরবের সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে নাটোরের নলডাঙ্গার তিন জন। তাদের একজন রবিউল ইসলামের মরদেহ দেশে ফিরেছে। জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফনও করা হয়েছে। কিন্তু শামীম হোসেন ও সাব্বির আহমেদের মরদেহ এখনও শনাক্ত হয়নি। আগুনে তাদের দেহ এতটাই পুড়ে গেছে যে, সাধারণ প্রক্রিয়ায় পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রথম দফায় দেশে আসেনি তাদের মরদেহও।

কবে নাগাদ ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শামীম ও সাব্বিরের মরদেহ শনাক্ত হবে, আর কবে সেই মরদেহ দেশে ফিরবে—তা এখনও নিশ্চিত নয়। সন্তান হারানোর বেদনার সঙ্গে এখন স্বজনদের অপেক্ষা, ‘লাশটা অন্তত একবার চোখে দেখবো’—এই আকুতি তাদের।

দুজনের পরিচয় শনাক্ত করতে সরকারিভাবে স্বজনদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নিহত শামীমের মা শাহিনুর বেগম। শামীম ও সাব্বিরের বাড়ি নলডাঙ্গা উপজেলায়।

নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাম্মী আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সৌদি আরবে আগুনে পুড়ে নলডাঙ্গার তিন জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজনের মরদেহ দেশে এসেছে। বাকি দুজনের মরদেহ শনাক্ত বা দেশে আনার বিষয়ে আমার কাছে হালনাগাদ তথ্য নেই।’

মরদেহ শনাক্তে বাবার ডিএনএ

নিহত শামীম হোসেন নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘীরপাড় গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে। তার মা শাহিনুর বেগম বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘আমার ব্যাডা খুব বড়ে (বেশি) পুইড়া গেছে। চেনা দেচ্ছে না। এ্যন (এখন) ডিএনএ টেস্ট করা লাগবি। তার বাপে (জাকির আলী) ডিএনএ দিয়া অইসে। অইগুলা ওই দ্যাশে (সৌদি আরব) প্যাটনো অইসে। কিন্তুক তারা এ্যনো দেহেনি। ৯ জনের লাশ প্যাটাইছে। এরপ্যরে তাগরে (ছেলেদের) সিরিয়াল ধরবি। আমার বোইনের ব্যাডা সাদ্দাম ওই দ্যাশেই কাজ ক্যারে। স্যা মোবাইল ফেনে মোক এইবাড়ে কলো।’

শামীমের বাবা জাকির হোসেন বলেন, ‘ছেলের লাশ ভয়াবহভাবে পুড়ে গেছে। এ কারণে পরিচয় শনাক্ত করতে সময় লাগছে বলে আমাকে জানানো হয়েছে। ঢাকায় গিয়ে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনাও দিয়ে এসেছি। এখন শুধু অপেক্ষা করছি সন্তানের মরদেহ দেশে ফেরার।’

একই অপেক্ষায় সাব্বিরের বাবা গোলাম রাব্বানী। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ছেলের দেহ এমনভাবে পুড়ে গেছে যে আঙুলের ছাপেও পরিচয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ কারণে তিনিও ঢাকায় গিয়ে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়েছেন। এখন আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন, যেন অন্তত ছেলের মরদেহটি ফিরে পান।

২১ দিনেও ফেরেনি লাশ

ধারদেনা করে ২০১৬ সালে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন শামীম। ২০২১ সালে দেশে ফিরে বিয়ে করেন। পাঁচ বছর পর দ্বিতীয় দফায় সৌদি যাওয়ার সময় তার স্ত্রী ছিলেন দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা। প্রবাসে থাকা অবস্থায় শামীমের ঘরে জন্ম নেয় কন্যাসন্তান শাফাহ জান্নাহ।

মৃত্যুর আগের দিন সকাল ১০টার দিকে ভিডিও কলে শেষবার মেয়ের মুখ দেখেছিলেন শামীম। এরপরই সব শেষ। পরিবারের আক্ষেপ, ছোট্ট মেয়েটি হয়তো কোনো দিন বাবাকে নিজের চোখে দেখতে পারবে না।

কাঁদতে কাঁদতে শামীমের স্ত্রী মিতু খাতুন বলেন, ‘অন্যদের লাশ এলেও আমার স্বামীর লাশ না আসায় হতাশ হয়ে পড়েছি। অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে না। লাশটি এলে অন্তত কবরের পাশে গিয়ে দোয়া করতে পারবে আমার সন্তান।’

তিনি বলেন, প্রবাসে থেকেই মেয়ের নাম ছাপা জান্নাহ রেখেছিলেন শামীম। মেয়ের আকিকার জন্য টাকা পাঠিয়েছিলেন। প্রতিদিন অন্তত দুবার ভিডিও কলে মেয়েকে দেখতেন। স্বামীর মৃত্যুতে মেয়েকে কীভাবে লালন-পালন করবেন, তা নিয়ে তিনি চিন্তায় স্থির থাকতে পারছেন না। একই সঙ্গে দুশ্চিন্তা হচ্ছে স্বামীর মরদেহ দেশে আসা নিয়েও।

কাঁদছেন তাদের স্বজনরাকাঁদছেন তাদের স্বজনরা

শাহিনুর বেগম ও গোলাম রাব্বানী বলেন, মৃত্যুর ২১ দিন পেরিয়ে গেলেও তাদের সন্তানদের মরদেহ দেশে আসেনি। ছেলেদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের জোর তৎপরতা চান তারা।

মোবাইলে বিয়ে, বাড়ি আসার আগেই মৃত্যু

নিহত সাব্বির আহমেদ (৩০) নলডাঙ্গার একই এলাকার গোলাম রাব্বানীর ছেলে। প্রায় সাড়ে চার বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। প্রবাসে থাকার কারণে মুঠোফোনের মাধ্যমেই তার বিয়ে দেওয়া হয়। কথা ছিল, আগামী ঈদে দেশে ফিরবেন। ছেলে বাড়ি ফিরলে পুত্রবধূকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘরে তুলে আনার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই আগুনে পুড়ে মারা গেলেন সাব্বির।

গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘প্রথমবারের মতো বউমা বাড়িতে এসেছে। কিন্তু স্বামীকে দেখতে পেলো না। এখন অপেক্ষা করছে স্বামীর লাশের অপেক্ষায়। এই কষ্ট কীভাবে সইবো?’

পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় আটকে মরদেহ

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানা গেছে, পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় বাকি মরদেহগুলো দেশে আনা সম্ভব হয়নি। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মরদেহগুলো শনাক্ত করে দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে।

নলডাঙ্গা উপজেলা ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম হোসেন বলেন, আঙুলের ছাপে পরিচয় শনাক্তের পর প্রথম পর্যায়ে নাটোরের একটি মরদেহ দেশে এসেছে। বাকি দুজনের মরদেহ শনাক্তের প্রক্রিয়া চলছে। প্রক্রিয়া শেষ হলে শামীম ও সাব্বিরের মরদেহ দেশে আসবে।

রবিউলের মরদেহ ফিরলো, শেষ বিদায়ও হলো

এদিকে সৌদি আরব থেকে মুঠোফোনে বাবা-মাকে কথা দিয়েছিলেন, আগামী ঈদের আগে বাড়ি ফিরবেন। দেশে বিয়ে করবেন—এমন কথাও ছিল। কিন্তু সেই কথা রাখতে পারেননি রবিউল ইসলাম। বাড়ি ফিরেছেন ঠিকই, তবে প্রাণহীন নিথর দেহ নিয়ে। গত বৃহস্পতিবার রবিউলের মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো গ্রামে। কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা-মা ও স্বজনেরা।

পরদিন শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের মহিষডাঙ্গা ভাটোপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে রবিউলকে দাফন করা হয়। তিনি ওই গ্রামের আশরাফুল ইসলামের ছেলে।

সৌদি আরবের একটি সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে রবিউলও ছিলেন। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) নিহত নয় জনের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর বিকাল ৪টার দিকে তাদের মরদেহ দেশে পৌঁছায়। তাদের মধ্যে রবিউলের বাড়ি নাটোরের নলডাঙ্গায়। নিহতদের সাত জন নওগাঁর আত্রাই এবং একজন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বাসিন্দা।

শুক্রবার সকালে রবিউলের মরদেহ বাড়ির বারান্দায় রাখা হলে আত্মীয়-স্বজন ও গ্রামের মানুষের ঢল নামে। বাবা আশরাফুল ইসলাম ডুকরে কাঁদছিলেন। স্বজনেরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ঘরের বিছানায় শুয়ে ছেলের স্মৃতি হাতড়ে বিলাপ করছিলেন মা। মাঝে মাঝেই মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি।

রবিউলের বাবা আশরাফুল ইসলাম বলেন, শেষ পর্যন্ত ছেলের লাশ পেয়েছেন—এটাই তার কাছে বড় সান্ত্বনা। অন্তত কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছেলের জন্য দোয়া করতে পারবেন।

তিনি বলেন, ধারদেনা করে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। বেশ কিছুদিন অবৈধ থাকার পর কিছুদিন আগে বৈধ কাগজপত্র তৈরি হয়েছিল। উপার্জনের টাকায় কিছু ঋণও পরিশোধ করা হয়েছিল। সবকিছু যখন ঠিকঠাক চলছিল, তখন বাড়ির কাজও শুরু করেছিলেন। ঘরবাড়ির কাজ শেষ হলে ঈদের আগে ছেলের দেশে ফেরার কথা ছিল। কথা ছিল বিয়ে করে ঘরে বউ আনবেন। কিন্তু আগুনে সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেলো। এখন ছেলেকে হারিয়ে কী নিয়ে বাঁচবেন, সেই প্রশ্নই তার সামনে।

একই অগ্নিকাণ্ডে তিনটি পরিবারে নেমে এসেছে তিন রকমের শোক—এক পরিবার পেয়েছে সন্তানের মরদেহ, আর দুই পরিবার এখনও অপেক্ষা করছে ডিএনএ পরীক্ষার ফল ও প্রিয়জনের শেষ চিহ্নটির জন্য।