জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পেনশনের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। সংঘবদ্ধচক্র পেনশন ও ভাতা পরিশোধের জন্য ব্যবহৃত সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থা আইবাস প্লাস-এ অনুপ্রবেশ করে ভুয়া পেনশন বিল তৈরির অভিযোগ উঠেছে।
এসব বিলের বিপরীতে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ব্যবস্থায় বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানো হয়েছে। অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত তিনটি ব্যাংক হিসাবে অন্তত ১ কোটি ২৪ লাখ ৩ হাজার টাকা স্থানান্তরের তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এর মধ্যে একটি হিসাবেই পাঠানো হয়েছে ৯১ লাখ টাকার বেশি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আইবাস প্লাস-এ প্রায় আড়াই লাখ ভুয়া পেনশন পেমেন্ট অর্ডার (পিপিও) তৈরির তথ্য পাওয়া গেছে। এসব জালিয়াতিতে ৩০টি জেলা ও উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের ইউজার আইডি ব্যবহারের তথ্য মিলেছে।
এখন তদন্তকারীদের সামনে বড় প্রশ্ন সংবেদনশীল সরকারি আর্থিক ব্যবস্থার এসব ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড কীভাবে একটি চক্রের হাতে গেল? সিআইডির পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি অনুসন্ধান করছে। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি শুধু রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয় থেকে ২৬ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাতেও একই কৌশলে অর্থ সরানোর চেষ্টা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ প্রতিবেদককে বলেন, এটি একটি নতুন ধরনের প্রতারণামূলক অর্থ আত্মসাৎ। এই টাকাগুলো জনগণের করের টাকা। দুদক যেহেতু অনুসন্ধান শুরু করেছে, তাতে জড়িত ব্যক্তিদের তথ্য বেরিয়ে আসবে।
তবে এ ক্ষেত্রে ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশন হওয়া দরকার। এটি কেউ এককভাবে করেছে বলে বিশ্বাস করা কঠিন। এর পেছনে বড় সিন্ডিকেট রয়েছে। তাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। আইবাস++ হলো বাংলাদেশ সরকারের অর্থ বিভাগের অধীন সমন্বিত বাজেট ও হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা। সরকারি আর্থিক লেনদেন, বাজেট প্রণয়ন, হিসাব সংরক্ষণসহ বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রম এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আইবাস++ ব্যবহার করে ভুয়া পেনশন বিলের মাধ্যমে অর্থ সরানোর ঘটনা নতুন নয়। ২০২২ সালের মার্চে কুষ্টিয়ার খোকসায় এ ধরনের একটি ঘটনা সামনে আসে। ওই ঘটনায় তৎকালীন জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আকরামকে জরিমানাও করা হয়েছিল। এরপর এপ্রিলে নীলফামারী, রংপুর ও রাজবাড়ীর পাংশায় একই ধরনের জালিয়াতির ঘটনা সামনে আসে। তদন্তকারীদের ধারণা, আগের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন ছিল না। একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করে পরবর্তী সময়েও সরকারি অর্থ সরানোর চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে।
শীর্ষস্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান মাইসফট হ্যাভেন (বিডি) লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. মোফাখখারুল ইসলাম পল্লব বলেন, মাস্টার রোলে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রোগ্রামারদের হাতে প্রোডাকশন কোডবেসের অ্যাক্সেস দেওয়া হয়েছিল যা কোনো মানসম্মত সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট প্র্যাকটিসে অনুমোদিত নয়। ওঝঙ ২৭০০১-এর মতো তথ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা মান অনুসরণ করলে ডেভেলপমেন্ট ও প্রোডাকশন এনভায়রনমেন্ট সম্পূর্ণ পৃথক থাকার কথা। সূত্র জানায়, আইবাস++-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো একটি সফটওয়্যারের কোডে অল্প সময়ের জন্য পরিবর্তন এনে ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড যাচাইয়ের স্বাভাবিক ব্যবস্থা পাশ কাটানোর সুযোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রায় ৩০ সেকেন্ডের জন্য কোডে পরিবর্তন আনা হলে পরবর্তী কয়েক মিনিটের মধ্যে বিপুলসংখ্যক ইএফটি নির্দেশনা পাঠানো সম্ভব হতো।
এই জালিয়াতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড নিয়ে। একটি পেনশন বিল প্রক্রিয়াকরণে আইবাস++-এ একাধিক ধাপ রয়েছে। টোকেন এন্ট্রি, টোকেন অনুমোদন এবং চূড়ান্ত বিল তৈরির মতো ধাপ পেরিয়ে অর্থ ছাড়ের নির্দেশনা তৈরি হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চক্রটি এসব ব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ভুয়া তথ্য প্রবেশ করিয়ে অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থা করেছে। অনুসন্ধানে পাংশা উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলাম, খোকসার উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান, বদিয়ার রহমান, নীলফামারীর জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আশরাফুল আলম, কুষ্টিয়ার জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা স্বপন কুমার বিশ্বাসসহ কয়েকজনের আইডি ব্যবহারের বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিন ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা : সিআইডির অনুসন্ধান নথিতে তিনটি ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে। এর দুটি ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এবং একটি সিটি ব্যাংকের।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কুষ্টিয়া শাখায় ‘রাশেদা বেগম’ নামে খোলা একটি হিসাবে ৪৭টি ইএফটি অ্যাডভাইসের মাধ্যমে ২৩ লাখ ২৯ হাজার টাকা পাঠানো হয়। এর মধ্যে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা নগদে উত্তোলন করা হয়। বাকি ২০ লাখ ৬৯ হাজার টাকার চেক নগদায়নের সময় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হলে তা আটকে দেওয়া হয়। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ঝিনাইদহ শাখায় ‘মোছা. জাহানারা খাতুন’ নামে একটি হিসাবে ভুয়া ইএফটি অ্যাডভাইসের মাধ্যমে পাঠানো হয় ৯ লাখ ৭২ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৯ লাখ ১০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। অন্যদিকে সিটি ব্যাংকের ঝিনাইদহ সদর এজেন্ট ব্যাংকিং শাখায় ভুয়া ইএফটির মাধ্যমে পাঠানো হয় ৯১ লাখ ২ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে তিনটি ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের পরিমাণ দাঁড়ায় অন্তত ১ কোটি ২৪ লাখ ৩ হাজার টাকা।
সিআইডির অনুসন্ধানে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কুষ্টিয়া শাখার আবুল কালাম আজাদ, এডিবি ম্যানেজার দীপক কুমার চক্রবর্তী ও ম্যানেজার দিবাকর বিটের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হয়। একই ব্যাংকের ঝিনাইদহ শাখার সুবল চন্দ্র পাল, তরিকুল ইসলাম ও শাহিনুর রহমানের ভূমিকাও তদন্তাধীন। এ ছাড়া সিটি ব্যাংকের ঝিনাইদহ সদর এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার মেহেদী হাসান, আবদুল্লাহ আল নোমান, শরীফ মাহমুদ, আসিফুজ্জামান আকাশ এবং ডাটা এন্ট্রি অপারেটর সৈকত সাহা দিপুর ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, এত বছর ধরে সক্রিয় থাকা প্রায় আড়াই লাখ ভুয়া আইডি কেন নিয়মিত অডিটে ধরা পড়েনি, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এটি প্রমাণ করে যে সমস্যাটি শুধু প্রযুক্তিগত দুর্বলতার নয়, এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ঘাটতিও জড়িত।
চক্রটির কার্যক্রমের পুরোনো যোগসূত্রও খুঁজছেন দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তারা। সূত্রের দাবি, ২০১৬ সালে কুষ্টিয়ায় কর্মরত তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব মসিয়র হোসেনের সময়ে কয়েকজন প্রোগ্রামারের মাধ্যমে আইবাস++-সংশ্লিষ্ট কাজে কিছু ব্যক্তি যুক্ত হয়েছিলেন। আইবাস++-এর প্রোগ্রামিংয়ের সঙ্গে যুক্ত এক বাংলাদেশি ও এক বিদেশি ডেভেলপার এবং ‘বুলবুলি’ নামে এক ব্যক্তির নামও এসেছে। এ ছাড়া ২০২২ সালের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া কুষ্টিয়ার জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের আউটসোর্সিং কর্মচারী আল বেরুনী অভি পরে জামিনে বের হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় চলে যান। তাঁর স্ত্রী বিউটিকেও ওই ঘটনায় আটক করা হয়েছিল। আইবাসে টাকা আত্মসাতের ঘটনার পর দুদকের সহকারী পরিচালক হোসাইন শরীফ অনুসন্ধান শুরু করেন। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে পাওয়া লেনদেনের তথ্যের ভিত্তিতে সিআইডিও বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করে। সিআইডির অনুসন্ধান কর্মকর্তা এসআই সোহানুর রহমান বলেন, অনুসন্ধানে সরকারি কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয় সামনে আসায় তিনি দুদকে অনুসন্ধানের প্রস্তাব দেন। পরে গত জুনে বিষয়টি দুদকে অনুসন্ধানের জন্য চিঠি দেওয়া হয়। দুদকের সহকারী পরিচালক হোসাইন শরীফ বলেন, কমিশন না থাকায় অনুসন্ধানটি জোরালোভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
সাইবার নিরাপত্তার পুরোনো সতর্কবার্তা : ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার সরিয়ে নেয়। ঘটনাটি বিশ্বের অন্যতম আলোচিত সাইবার চুরির ঘটনা। এরপর ২০১৯ সালের ৩১ মে মধ্য বাড্ডার একটি ব্যাংকের এটিএম বুথ এবং পরদিন ১ জুন র্যাডিসন হোটেল, কাকরাইল, রামপুরার ডিআইটি সড়ক ও নিকুঞ্জ এলাকার বুথসহ বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ টাকা চুরির ঘটনা ঘটে।