Image description

পেশাদার ছিনতাইকারী। কিন্তু আদতে তারা মৃত্যুদূত। ভোরের ঢাকায় শিকার ধরার আশায় ঘুরে বেড়ায়। সুযোগ বুঝে জাপটে ধরে। ছিনতাইয়ে বাধা দিলে আগ্রাসী আচরণ করে। প্রথমে ভয়ভীতি দেখায়। কাজ না হলে আরও ভয়ঙ্কর হয়। আর এতে তাদের হাতে প্রাণ নিভে যায় অনেকের। ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে মৃত্যু এখন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। গত কিছুদিনে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে অমানবিক কিছু মৃত্যু শোকাহত করেছে গোটা দেশের মানুষকে। তেমনি ভোরের ঢাকায় মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ছিনতাই নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থানও প্রশ্নবিদ্ধ। পুলিশের হাতে ছিনতাইকারীর তালিকা, হটস্পট সবকিছু থাকার পর রাজধানীতে প্রতি রাতেই ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে সব হারাচ্ছেন অনেকে। কেউ কেউ প্রাণও হারাচ্ছেন। অথচ র‌্যাব-পুলিশের টহল, ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার কিছুই কাজে আসছে না। ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে ৩৪২টি ছিনতাইয়ের ‘হটস্পট’ বা অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্পটের শীর্ষে রয়েছে- মোহাম্মদপুর ও উত্তরা।

মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় সবচেয়ে বেশি ১০৮টি ছিনতাইয়ের হটস্পট রয়েছে। এই এলাকায় ২৪০ জন তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী সক্রিয় 
রয়েছে। উত্তরা ও গুলশান এলাকায় ৯৪টি ছিনতাইয়ের হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে উত্তরা পশ্চিম ও এয়ারপোর্ট রোড অপরাধীদের অন্যতম প্রধান রুট। পুলিশের তালিকায় ঢাকায় ১৩৮৭ সক্রিয় ছিনতাইকারী রয়েছে। এর বাইরেও রয়েছে রাজধানীজুড়ে হাজারের বেশি ভাসমান ছিনতাইকারী। তারা ঢাকার বাইরে থেকে এসে কয়েকটি ছিনতাই করে আবার ফিরে যায়। ডিএমপি’র তথ্য বলছে, তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের মধ্যে ওয়ারীতে সর্বোচ্চ ৩০৮ জন সক্রিয় রয়েছে। এরপরেই ২৪০ জন করে সক্রিয় তেজগাঁও ও উত্তরা বিভাগে। মতিঝিলে সক্রিয় ১৬৮ জন। এছাড়া রমনায় ১৫২ জন, লালবাগে ১৫১ জন ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। তবে সবচেয়ে কম ছিনতাইকারী রয়েছে গুলশান ও মিরপুরে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সঙ্গে ছিনতাইয়ের হটস্পটও নির্ধারণ করেছে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। এ তালিকায় মোহাম্মদপুর, পল্লবী, যাত্রাবাড়ী, দারুসসালাম, উত্তরা পূর্ব ও পশ্চিম, বিমানবন্দর, তেজগাঁও, কোতোয়ালি, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, শেরেবাংলানগর, আদাবর ও খিলক্ষেত অন্যতম। যেখানে গভীর রাত ও ভোরে ছিনতাই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, গত সাত মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অন্তত ১৭৮টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে। ছিনতাইয়ের ঘটনায় গত ছয় মাসে ৪০২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৮টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ওয়ারী থানায়। আর ৩৪টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে তেজগাঁও বিভাগের বিভিন্ন এলাকায়। দায়ের হওয়া মামলার মধ্যে- জানুয়ারিতে ২৯টি, ফেব্রুয়ারিতে ২২টি, মার্চে ২৫টি, এপ্রিলে ২৫টি, মে মাসে ৩৩টি, জুনে ২৪টি এবং জুলাইয়ে ২০টি মামলা হয়েছে। সাত মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে মে মাসে। তবে বাস্তব চিত্র এর চেয়েও ভয়াবহ বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ঝামেলা এড়াতে কিংবা খোয়া যাওয়া মালামাল উদ্ধারের আশা না থাকায় অনেক ভুক্তভোগী সাধারণ ডায়েরি করেন অথবা কোনো আইনি পদক্ষেপই নেন না। ফলে প্রকৃত ছিনতাইয়ের ঘটনা এই পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি।

সূত্রগুলো বলছে, গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী, কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে ভোরে আসা যাত্রীদেরই টার্গেট করে ছিনতাইকারীরা। বিশেষ করে পায়ে হেঁটে ও রিকশা করে যেসব যাত্রী গন্তব্য যাওয়ার জন্য রওনা করেন। তাদের গতিবিধি, গতিপথকে অনুসরণ করে। তারপর সুবিধাজনক নির্জন স্থানে পেলেই ভয়ভীতি দেখিয়ে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। আর ছিনতাইয়ে বাধা দিলে ছুরিকাঘাত এমনকি গুলি করার মতো ঘটনাও বহুবার ঘটেছে। তবে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে চলন্ত রিকশার যাত্রীদের ব্যাগ ধরে টানাটানি ও পরে হেঁচকা টানে পড়ে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনা এখন ভাবিয়ে তুলেছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ছিনতাইকারীরা মানুষের প্রাণ নিয়ে যাচ্ছে তবুও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির নজির নাই। এছাড়া ছিনতাইকারীরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর খুব সহজে কোর্টে গিয়ে জামিন পেয়ে যাচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে তাদের অল্প কিছুদিন জেল খাটতে হচ্ছে। জামিনে মুক্তি পেয়ে তারা আবার একই কাজে নামে।

গত ছয় মাসে ঢাকায় চলন্ত রিকশা বা অটোরিকশা থেকে ব্যাগ টান দেয়ার ঘটনায় তিন নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া এক ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছে আরেক ছিনতাইকারী।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন মানবজমিনকে বলেন, অন্যান্য অপরাধের মতো ছিনতাইয়ের মতো অপরাধকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে ডিএমপি। রাতের ঢাকাকে নিরাপদ করার জন্য ডিএমপি’র প্রতিটা বিভাগে টহল, পেট্রোলিং, ফিক্সডটিমসহ নানা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আর এসব দায়িত্ব পালনে কোনো ব্যত্যয় যাতে না হয় সেজন্য প্রতিটি জোনের এসি, এডিসি, ডিসিরা ঘুরে ঘুরে তদারকি করেন। এ ছাড়া সাদা পোশাকেও আমার টিম কাজ করে রিপোর্ট সংগ্রহ করে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, আইনের প্রয়োগটা খুব যথাযথভাবে নিশ্চিত করা দরকার। অন্যথায়, এই ছিনতাইকারীরা নানা ধরনের আইনগত প্রক্রিয়াকে পুঁজি করে, জামিনসহ নানা প্রক্রিয়ায় বের হয়ে আসে এবং নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। ছিনতাইকারীদের এই দ্রুত জামিনে বের হয়ে আসা, তাদের দ্রুত জামিনে বের হয়ে আসার মতো চার্জশিট দেয়া এই অভিযোগগুলো বন্ধ করা প্রয়োজন। পুলিশের টহল কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন। এবং পুলিশ যদি এই ধরনের অপরাধীদের বিষয়ে তৎপর না হয়, দৃষ্টান্তমূলকভাবে শাস্তির ব্যবস্থা করতে না পারে, সেইভাবে মামলার চার্জশিট প্রস্তুত করতে না পারে, তাহলে ছিনতাইকারীদের হাতে আরও অনেকেই আহত বা নিহত হওয়ার ঘটনা বা নিহত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।