আমির হোসেন ওরফে জামাল। ১৮ বছর আগে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ঘটে যাওয়া এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দিয়েছিল পুলিশ। ওই চার্জশিটের উপর ভিত্তি করে তাকে দেয়া হয় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। বিচারিক আদালতের রায়ের আট বছর পর হাইকোর্টে নিষ্পত্তি হলো শিশু জুলি আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স। যেখানে আসামিকে নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস দেয়া হয়েছে। যেখানে আসামি ১৮ বছর ধরে কারাবন্দি। এর মধ্যে ৮ বছর মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে কনডেম সেলে বসবাস। রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, এই মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আমির হোসেন ওরফে জামাল যে জুলিকে হত্যা করেছে এটা রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে প্রমাণ করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে তাকে খালাস দেয়া হলো।
রাষ্ট্রপক্ষের ডেথ রেফারেন্স খারিজ ও আসামির আপিল গ্রহণ করে মঙ্গলবার এ রায় দেন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্ত্তী ও বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ। রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, আসামি আমিরের কাছ থেকে যে জবানবন্দি নেয়া হয় তা সত্য ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত নয়। মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায় এই জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে জোরপূর্বক। এমনকি জবানবন্দি গ্রহণের যে আইনগত প্রক্রিয়া সেটাও সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি। হাইকোর্ট বলেছে, মামলার সাক্ষীদের জেরা ও সাফাই সাক্ষী পর্যালোচনায় দেখা যায় যে আসামিকে নির্যাতন করা হয়েছে। এমনকি আসামিপক্ষ থেকে যে মেডিকেল রিপোর্ট সংক্রান্ত কাগজপত্র দাখিল করা হয়েছিল সেগুলোও ট্রাইব্যুনাল বিবেচনায় না নিয়ে ভুল করেছে। এ ছাড়া ময়না তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাথায় আঘাত করে পানিতে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়। তবে শরীরে আঁচড়ের দাগ ছিল।
কিন্তু আসামির জবানবন্দিতে মাথায় আঘাত করার বিষয়টির উল্লেখ নেই। তাই এই হত্যার সঙ্গে এই আসামি জড়িত এটা সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে প্রমাণ করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, এই মামলায় দু’জন শিশু প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন। যাদের বয়স ৩ ও ৪ বছর। সাক্ষী দেয়ার ৫ দিন আগে শিশু দু’টিকে কোর্টে এনে আসামি হিসেবে আমির হোসেনকে চিনিয়ে দেয় বাদী। যা তারা জেরায় স্বীকার করে নিয়েছেন। এ কারণে আসামিকে নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস প্রদান করা হলো।
রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এডভোকেট মো. ইমাম হোসেন তারেক বলেন, জামাল নামে আসামিকে খুঁজতে গিয়ে আমির হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় বিচারিক আদালত। এই ব্যক্তিই যে ওই শিশু ধর্ষণ ও হত্যার সঙ্গে জড়িত সেটা হাইকোর্টে প্রমাণ হয়নি। অর্থাৎ নিরাপরাধ ব্যক্তিকে সাজা দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। হাইকোর্ট ওই রায় বাতিল করে দেয়।
প্রসঙ্গত, ফফু বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ২০০৮ সালের ১৬ই মে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন জুলি নামের এক শিশু। এ ঘটনায় চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানায় মামলা দায়ের করেন তার চাচা। মামলার এজাহারে বলা হয়, ঘটনার আগের দিন হাটহাজারী বাজারের মাদ্রাসা গেট হতে জামাল নামে এক দিনমজুরকে কাজ করানোর জন্য বাড়িতে আনা হয়। পরদিন ওই ব্যক্তি শিশুটিকে বাড়ি থেকে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যা করে। দু’দিন পর শিশুটির লাশ পাওয়া যায় খালে।
মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশ বলছে, ভিকটিমের স্বজনরা জামালকে ব্যক্তিগতভাবে চেনে না। ফলে তার ঠিকানা সংগ্রহ করা সম্ভব হয় নাই। একপর্যায়ে আসামির ফেলে যাওয়া কাপড়-চোপড়ের ব্যাগের মধ্যে মোবাইল সংক্রান্ত কাগজ পাওয়া যায়। সেখান থেকে পাওয়া মোবাইল নম্বরে ফোন দিলে আলাল নামে এক ব্যক্তি রিসিভ করেন। আলাল জানান যে, ফটিকছড়ির ট্রাক্টর মাহবুবের কাছে গেলে তার পরিচয় পাওয়া যাবে। পরে মাহবুব জানান যে, জামাল নামে এক ব্যক্তি তার সঙ্গে ১৪/১৫ দিন কাজ করেছে। কিন্তু ঠিকানা জানে না। তখন মাহবুব ও তার মেয়ের জামাই আসামি জামালের পরিচয় সংগ্রহে বের হয়। তাদের দেখানো মতে, ভূজপুর থানাধীন ওমর আলী নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে তার তিন ছেলের একজনকে জামাল বলে জানায়। কিন্তু ওমর আলী জানায় যে, তার তিন ছেলে হচ্ছে- আমির হোসেন, আবুল হোসেন ও জাগির হোসেন। ওমর আলীর পাশের বাড়ির বাসিন্দা আবুল হাশেম জানায় যে, ওমর আলীর তিন ছেলে আছে। তবে জামাল নামে কেউ নাই।
তবে তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশ হাশেমের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, আমির হোসেন যখন বাইরে কাজ করতো তখন জামাল নামে পরিচয় দিতো। এই সাক্ষীর বক্তব্যের মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে, আসামির নাম জামাল নয়, আমির হোসেন। পরে মাটিরাঙ্গা থানা থেকে আমিরকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। পরে আদালতে হাজির করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে। দেয়া হয় চার্জশিট। এতে বলা হয়, আসামি আমির হোসেন ওরফে কথিত জামাল ভিকটিমকে ধর্ষণসহ খুন করার সুযোগ পায়। সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা এবং যুক্তিতর্ক শেষে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭ ধারায় যাবজ্জীবন ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৯ (২) ধারায় মৃত্যুদণ্ড এবং এক লাখ টাকা জরিমানা করে ২০১৯ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি রায় দেয় ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মোতাহির আলী।