Image description

বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দিয়েছে সরকার। প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ও ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে গতকাল নবম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন দেয়া হয়।

চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে নতুন স্কেলে বেতন কার্যকর হবে। বেতন কাঠামোয় সর্বোচ্চ ১৪২ ও সর্বনিম্ন ১০০ শতাংশ বেতন বাড়ানো হয়েছে। তিন ধাপে এ বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হবে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।

সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দেয়া হয়। জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন করার তথ্যসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

জানা গেছে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং ভারসাম্যপূর্ণ বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত বিদ্যমান ১: ১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১: ১.৭৮ করা হয়েছে। এতে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়ছে। এর মাধ্যমে এক যুগ পর নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন হচ্ছে।

প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের জন্য ‘প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা’ চালু হচ্ছে। এছাড়া এতদিন মোবাইল ভাতা প্রযোজ্য ছিল শুধু পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য। নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী সব গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পাবেন।

জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর সঙ্গে সাযুজ্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি ২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে, যা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।

কোন গ্রেডে কত মূল বেতন

প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী, গ্রেড-১-এ প্রারম্ভিক মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, গ্রেড-২-এ ৬৬ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৩২ হাজার, গ্রেড-৩-এ ৫৬ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে ১ লাখ ১৩ হাজার ও গ্রেড-৪-এ ৫০ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ টাকা হয়েছে।

এছাড়া গ্রেড-৫-এ ৪৩ হাজার থেকে বেড়ে ৮৬ হাজার টাকা, গ্রেড-৬-এ ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে ৭১ হাজার, গ্রেড-৭-এ ২৯ হাজার থেকে বেড় ৫৮ হাজার, গ্রেড-৮-এ ২৩ হাজার থেকে বেড়ে ৪৬ হাজার, গ্রেড-৯-এ ২২ হাজার থেকে বেড়ে ৪৪ হাজার ও গ্রেড-১০-এ ১৬ হাজার থেকে বেড়ে ৩২ হাজার টাকা হয়েছে।

গ্রেড-১১-এ প্রারম্ভিক মূল বেতন ১২ হাজার ৫০০ থেকে দ্বিগুণ ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। গ্রেড-১২-এ ১১ হাজার ৩০০ থেকে বেড়ে ২৪ হাজার ৩০০, গ্রেড-১৩-এ ১১ হাজার থেকে বেড়ে ২৪ হাজার, গ্রেড-১৪-এ ১০ হাজার ২০০ থেকে বেড়ে ২৩ হাজার ৫০০ ও গ্রেড-১৫-এ ৯ হাজার ৭০০ থেকে বেড়ে ২২ হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে। এছাড়া গ্রেড-১৬-এ ৯ হাজার ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার ৯০০, গ্রেড-১৭-এ ৯ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার ৪০০, গ্রেড-১৮-এ ৮ হাজার ৮০০ থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার, গ্রেড-১৯-এ ৮ হাজার ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার ৫০০ ও গ্রেড-২০-এ ৮ হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে।

বেতন বাড়বে তিন ধাপে

জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি একবারে কার্যকর হবে না। এ-সংক্রান্ত সরকারি তথ্য বিবরণীতে বলা হয়েছে, ১ জুলাই থেকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। আর্থিক অবস্থা ও মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সরকার পুরো বেতন স্কেল একযোগে বাস্তবায়ন না করে চলতি ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ দুই অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে আগামী বছরের (২০২৭) মধ্যে মূল বেতন মোট তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। তবে বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর হবে। পেনশনভোগী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একইভাবে ধাপভিত্তিক নিট পেনশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।

তথ্য অধিদপ্তরে বেতন বৃদ্ধিসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গতকাল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতন স্কেল অনুমোদন করা হবে, যা এ বছরের ১ জুলাই থেকে একইভাবে ধাপে ধাপে কার্যকর হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী (আইন অনুযায়ী সবাই কর্মচারী) এবং সোয়া নয় লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। এজন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এ অর্থের সংস্থান সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে রাখা হয়েছে।’

সবার জন্য মোবাইল ভাতা

নতুন বেতন কাঠামোয় মোবাইল ভাতার আওতা বাড়ানো হয়েছে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী ১ম থেকে ২০তম—সব গ্রেডের সব কর্মচারী এ ভাতা পাবেন। এতদিন পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেতেন। সরকারি দপ্তরগুলোয় ই-মেইল, অনলাইন সভা, ডিজিটাল ফাইল ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন অ্যাপভিত্তিক কাজ বাড়ায় প্রায় সব পর্যায়ের কর্মচারীকেই ব্যক্তিগত মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হচ্ছে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ভাতার আওতা বাড়ানো হয়েছে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা

নতুন বেতন স্কেলে প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসিক ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য একজন সরকারি কর্মচারী মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা পাবেন।

পেনশনভোগীদের পেনশনও বাড়ছে

অবসরভোগী পেনশনধারীদের জীবনযাত্রার মান ও বৃদ্ধ বয়সের ‘আর্থিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে’ সরকার স্তর অনুযায়ী নিট পেনশনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মাসিক ৯ হাজার টাকা বা এর নিচের নিট পেনশন আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন আহরণকারীদের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আহরণকারীদের ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত আহরণকারীদের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তদূর্ধ্ব নিট পেনশন আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ৫৫ শতাংশ বাড়বে। ফলে যেসব পেনশনভোগী অনেকদিন আগে অবসরে গেছেন এবং যারা তুলনামূলক কম নিট পেনশন পাচ্ছেন তাদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন বৃদ্ধির পরিমাণ বেশি হবে।

এদিকে অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন–ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন গ্র্যাচুইটিসহ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ‌ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেতন-ভাতা ও পেনশন বাবদ ১ লাখ ৩১ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯৮ হাজার ৬৬২ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৯ হাজার ৭০৯ কোটি, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭৬ হাজার ২২৭ কোটি ও ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫৬ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল।

বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি সেবার মানে কেমন পরিবর্তন আসতে পারে জানতে চাইলে সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বেতন বাড়ালেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের মান বা সরকারি সেবার মানের পরিবর্তন হবে—এমনটা আমি মনে করি না। কারণ সব কর্মকর্তা-কর্মচারী এক রকম নন; ভালো মানুষ যেমন আছেন, তেমনি কিছু অসৎ মানুষও আছেন। যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের বেতন যতই বাড়ানো হোক না কেন, তাতে খুব একটা লাভ হবে না। তাই বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা ও সুনামের ভিত্তিতে সর্বস্তরে নিয়োগ ও পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের যথাযথ তদারকি এবং জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এগুলো করা না গেলে শুধু বেতন বাড়িয়ে পরিস্থিতির সামান্যতম পরিবর্তনও হবে না।’

এর আগে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি ১ম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। কমিটি দুই ধাপে বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়নের কথা বলেছিল। এর মধ্যে প্রথম বছরে মূল বেতন এবং দ্বিতীয় বছরে বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর হতে পারে বলে আলোচনা ছিল। বিএনপি সরকারের ১৮০ দিন উপলক্ষে গৃহীত কার্যক্রম নিয়ে সম্প্রতি ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ই-বুক প্রকাশ করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সেখানে ‘নবম পে-স্কেল: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় সুখবর’ শীর্ষক উপশিরোনামে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

তার আগে অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করেছিল। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছিল গত জানুয়ারিতে। ওই কমিশন বিদ্যমান গ্রেড ২০টি বহাল রেখে বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছিল। আর সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে সুপারিশ করা হয়েছিল ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন পক্ষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সে সময় পে-কমিশন গঠন করা হয়েছিল বলে জানান সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি গতকাল বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার পক্ষ থেকে একের পর এক বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। তখন আমরা দেখলাম, কোনো এক পক্ষের দাবি মানলে অন্য পক্ষ সংক্ষুব্ধ হবে। এজন্য পুরো বেতন কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তার ভিত্তিতে আমরা পে-কমিশন গঠন করেছিলাম।’

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আরো বলেন, ‘অনেকেই মূল্যস্ফীতির ওপর বেতন বাড়ানোর ইমপ্যাক্ট নিয়ে কথা তুলেছেন। কেবল বেতন বাড়ালেই যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে, বিষয়টি তা নয়। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো। সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা করে আমরা ওই সময় বলেছিলাম, নতুন বেতন কাঠামো একবারে বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে। দুই বা তিনটি ধাপে এটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছিলাম। বর্তমান সরকার সে পথেই হেঁটেছে।’

বেতন বাড়লেও সরকারি অফিস থেকে জনগণের সেবার মানে কোনো উন্নতি হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সরকারের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের বিষয়টি সব সময়ই প্রসঙ্গিক। এর সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির সম্পর্ক নেই। তবে বেতন বাড়ার পরও যদি সরকারের সেবার মানে কোনো উন্নতি না হয়, সেটি হবে দুঃখজনক।’

প্রায় ১০ বছর পর এবং বহুদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন পে-স্কেল সরকারি কর্মচারীদের জীবনে কিছুটা স্বস্তি দিলেও অর্থের সংস্থান করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বর্তমান রাজস্ব পরিস্থিতিতে শুধু ব্যাংক ঋণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ নেয়া কিংবা নতুন অর্থ সৃষ্টি করে এ ব্যয় মেটানো হলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হতে পারে। আবার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ কমিয়েও এ অর্থের সংস্থান করা উচিত নয়। সরকারকে তাই প্রতিটি ধাপের জন্য সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য অর্থায়ন পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে। করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি ও অযৌক্তিক কর-ছাড় কমানো, অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সরকারি ক্রয়ে অপচয় ও দুর্নীতি রোধ, লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং অগ্রাধিকারহীন প্রকল্প স্থগিত করার মাধ্যমে অর্থের বড় অংশ সংস্থান করতে হবে।’

তবে বেতন বাড়লেই সরকারি সেবার মান স্বয়ংক্রিয়ভাবে উন্নত হবে না বলে মনে করেন ড. ফাহমিদা খাতুন। তার কথায়, ‘বেতন বৃদ্ধি সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক চাপ কমাতে, মনোবল বাড়াতে এবং দক্ষ জনবল ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে। জনগণের অর্থে বর্ধিত বেতন দেয়া হলে এর বিপরীতে উন্নত, দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করার প্রত্যাশাও যৌক্তিক। এজন্য পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন, সময়মতো সেবা প্রদান, উপস্থিতি, জবাবদিহি, ডিজিটাল সেবা, নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থাকে যুক্ত করতে হবে। পে-স্কেলের সঙ্গে জনপ্রশাসনের প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে সরকারের ব্যয় বাড়বে, কিন্তু জনগণ প্রত্যাশিত সুফল নাও পেতে পারে।’