Image description
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগদান করলে নতুন সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি আছে নানা ঝুঁকিও। এতে বাংলাদেশ যুক্ত হলে সামরিক পরিকল্পনায় নতুন চিন্তা আসবে। প্রতিবেশী ভারত তার সামরিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে নিয়ে অন্যভাবে চিন্তা করতে পারে। অন্যদিকে ভবিষ্যতে এই অঞ্চল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবনায় পরিবর্তন আসতে পারে। সবমিলিয়ে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে কোনো তাড়াহুড়ো না করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও সামরিক সক্ষমতার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এই চুক্তিতে যাওয়ার আগে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

রাজধানীর বিডিবিএল ভবনে সোমবার ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান : কৌশলগত জাতীয় নিরাপত্তার হিসাবনিকাশ’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ভয়েস ফর রিফর্মের আয়োজনে এই আলোচনা সভায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীর সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন-ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সাবেক উপপ্রধান জন এফ ড্যানিলোউইজ, ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান, এফএসডিএসের মুখ্য গবেষণা ফেলো ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাফায়াত আহমেদ, মানবাধিকারকর্মী রুবি আমাতুল্লাহ, নেক্সাফ ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. হাসান নাসির, এনসিপি নেত্রী মনিরা শারমিন প্রমুখ। সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর।

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন এফ ড্যানিলোউইজ বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কিংবা এতে থাকা তিন দেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কোনো সমস্যা নেই। তবে এ চুক্তির প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তিনি জানান, একই সঙ্গে ইসরাইলের নিরাপত্তা নিয়েও ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে। তিনি বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বিএনপি সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ কী হবে, এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হবে।

মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের ঝাঁপিয়ে পড়ার কিছু নেই। তবে ৫৫ বছর ধরে নানা দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ রাখার পরও বাংলাদেশের এমন কোনো নির্ভরযোগ্য বন্ধুরাষ্ট্র নেই, যে কি না নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে দৃঢ়ভাবে পাশে দাঁড়াবে। সেদিক থেকে একটি সমষ্টিগত নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আসা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে বিবেচনার বিষয় হতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিলে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সামরিক শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ইন্টারঅপারেবিলিটি তৈরির সুযোগ রয়েছে।

ঝুঁকির দিকগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যোগ দিলে ভারতকে তার সামরিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে নতুন করে হিসাবের মধ্যে রাখতে হতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান ভবিষ্যতেও একই থাকবে কি না-সেটিও নিশ্চিত নয়।

সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, দেশের মানুষ মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির পক্ষে থাকলেও হুজুগে হাইপ তুলে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না। এতে যোগ দেওয়ার আগে এর সম্ভাব্য সুফল ও ঝুঁকি নিয়ে যথাযথ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। তিনি বলেন, সরকার এখনো এ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ করছে না। দেশের জনগণের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার না করে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, কার্যকর কূটনৈতিক প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিজস্ব সামরিক সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও ট্রাম্পের অভিনন্দনও গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। এক্ষেত্রে সংসদ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা এবং জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা জরুরি।