Image description
পুরো সিস্টেম আধুনিকায়নের উদ্যোগ

জাতীয় সংসদ ভবনের প্লেনারি হলে বারবার অডিও বিভ্রাট ও শব্দের প্রতিধ্বনি নিরসনে সাড়ে ৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সাউন্ড ও মাল্টিমিডিয়া ব্যবস্থা আধুনিকায়নের বড় উদ্যোগ নিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে মার্কিন ‘শিওর’ ব্র্যান্ডের দশ বছর মেয়াদি সিস্টেমটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে মেরামত করা হলেও তা এক বছরও টেকেনি। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই স্পিকার ও মাইক্রোফোন বিভ্রাটের মুখে পড়েন সংসদ সদস্যরা।

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার শুধু পুরোনো সরঞ্জাম মেরামত বা পরিবর্তন নয়, প্রতিটি সংসদ সদস্যের আসনের সামনে এআই ক্যামেরাসহ আধুনিক সাউন্ড ও অডিও-ভিজ্যুয়াল সিস্টেম চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জার্মানি, বেলজিয়াম ও চীনের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর সরঞ্জাম যাচাই এবং ইমেইলের মাধ্যমে সরাসরি মূল প্রতিষ্ঠানের দরপত্র পর্যালোচনা করে নতুন প্রাক্কলন তৈরি করা হয়েছে। পুরো প্লেনারি হলের শব্দ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিধ্বনি দূর করতে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ এবং আর্কিটেক্টদের পরামর্শে ‘অ্যাকুস্টিক ট্রিটমেন্ট’-এর পরিকল্পনাও এই প্রকল্পে যুক্ত রয়েছে। যদিও পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ দলের ২৩ কোটি টাকার পুনর্নির্মাণ প্রস্তাব বাদ দিয়ে অদক্ষ ঠিকাদার দিয়ে মেরামতের অনিয়ম নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবু বর্তমানে সার্বিক ত্রুটি নিরসনে প্রস্তুতকৃত সংশোধিত প্রাক্কলনের ওপর ভিত্তি করেই দরপত্র প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রকল্পের প্রাক্কলনের তথ্য অনুযায়ী, মাইক্রোফোন পরিবর্তনের পাশাপাশি যুক্ত করা হচ্ছে বেশ কিছু আধুনিক প্রযুক্তির নতুন সরঞ্জাম। মাইক্রোফোনের সমস্যা সমাধানে এই প্রকল্পের আওতায় মাল্টিমিডিয়া মেইন ইউনিট, পাওয়ার সাপ্লাই, নেটওয়ার্ক এক্সটেন্ডার, ইন্টারপ্রেটার ডেস্ক, গুজনেক মাইক্রোফোন, হেডফোন, চ্যানেল সিলেক্টর, ডিসপ্লে, ইনফ্রারেড ট্রান্সমিটার ও রিসিভার, চার্জিং কেস, প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার, অডিও মিক্সার, অ্যাম্পলিফায়ার, স্পিকার, কম্পিউটার এবং এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।

সংসদ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ মে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে জাতীয় সংসদে নতুন সাউন্ড সিস্টেম প্রতিস্থাপনের বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ জুন জাতীয় সংসদের স্পিকারের সভাপতিত্বে এ বিষয়ে একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সাউন্ড সিস্টেম বাজারজাতকারী স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে কারিগরি স্পেসিফিকেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু সরঞ্জাম ও উপাদান প্রদর্শন করা হয়। এরপর প্রকল্পটির বিষয়ে সংসদ সচিবালয়, স্পিকার, হুইপ, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, গণপূর্তের ই/এম পিঅ্যান্ডডি সার্কেলের (ঢাকা) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী দপ্তর থেকে প্রথমে ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৪৩ টাকার প্রাক্কলন পাঠানো হয়েছিল। তবে প্রয়োজনীয় তথ্যসংযোজন ও প্রাক্কলন সংশোধনের জন্য দপ্তরে চিঠি পাঠানোর পর গত ২৮ জুলাই ৩৭ কোটি ৫১ লাখ ২৪ হাজার ৯৮২ টাকার সংশোধিত প্রাক্কলন পুনরায় জমা দেওয়া হয়।

প্রাক্কলন যাচাইয়ের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ফিল্ড বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তিনটি কোটেশনে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সরঞ্জাম ও স্পেসিফিকেশন উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জার্মানির ‘ব্রেহলার’, বেলজিয়ামের ‘টেলেভিক’ এবং চীনের ‘তাইডেন’ ব্র্যান্ড। দর যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট মূল উৎপাদক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ইমেইলে সরাসরি যোগাযোগ করা হয়, যার মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকি সবাই জবাব দিয়েছে।

অর্থাৎ, শুধু স্থানীয় সরবরাহকারীদের কোটেশনের ওপর নির্ভর না করে মূল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকেও বাজারদর ও তথ্যাদি সংগ্রহ করা হয়েছে। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতেই সরঞ্জামের সঠিক মূল্য ও প্রাক্কলন যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

তবে এর আগে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয় করে মেরামতের পরও এক বছরের মধ্যে ফের সমস্যা দেখা দেওয়া এবং এবার সাড়ে ৩৭ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে পুরো ব্যবস্থা আধুনিকায়নের এ উদ্যোগ স্বাভাবিক ব্যয়ের চেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সরঞ্জামের কোটেশন, বাজারদর যাচাই ও মোট প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় জাতীয় সংসদ ভবনের প্লেনারি হলের সাউন্ড সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিস্টেমটি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চালু করা হয়েছিল এবং মাত্র দুই বছর আট মাস ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ‘শিওর’-এর তৈরি এই সিস্টেমের স্বাভাবিক কার্যকাল ধরা হয়েছিল ১০ বছর। ক্ষতিগ্রস্ত সাউন্ড সিস্টেম মেরামতের জন্য ৫ আগস্টের পর কোম্পানিটির পক্ষ থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দল এনে সিস্টেমটি পরীক্ষা করানো হয়।

বিশেষজ্ঞ দলটি দুটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত সাউন্ড সিস্টেম সম্পূর্ণ পরিবর্তন করতে ২৩ কোটি টাকা এবং মেরামত করতে ৪ কোটি টাকা ব্যয় হবে। একই সঙ্গে এসব যন্ত্রাংশের নির্দিষ্ট ওয়ারেন্টি থাকবে এবং পরবর্তী যে কোনো সমস্যা সমাধানে তারা সহযোগিতা করবে। তবে লাখ লাখ টাকা খরচ করে পর্যবেক্ষক দল আনা হলেও তাদের কোনো পরামর্শ গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি আগের অভিজ্ঞ ঠিকাদার কোম্পানিকে বাদ দিয়ে বিশেষ সুবিধায় ‘আমানত এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে কাজটি করান তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, অদক্ষ কোম্পানিকে দিয়ে কাজ করানো এবং অনিয়মের কারণেই সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই সাউন্ড সিস্টেমে নানা সমস্যা দেখা দেয়।

গত ১২ মার্চ নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা প্রথম অধিবেশনে হেডফোনে শুনতে পাননি এবং গুজনেক মাইক্রোফোনের ত্রুটির কারণে বিভ্রাটের মুখে পড়েন তারা। এ নিয়ে কয়েকজন সংসদ সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

পরবর্তী সময়ে সংসদের মাইক বিভ্রাটের ঘটনা তদন্তে ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। একই সঙ্গে ঘটনাটি অন্তর্ঘাতমূলক (সাবোটাজ) ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখে ৩ এপ্রিলের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। পাশাপাশি শব্দযন্ত্রের সমস্যা সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে বিষয়েও কমিটিকে সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে।

নতুন প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি এবং কী কী নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হচ্ছে জানতে সংসদের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম) রিসালাত বারির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দৈনিক কালবেলাকে বলেন, ‘সংসদের মাইক্রোফোন পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে। তবে আপনাকে এসব বলব কেন? আপনি নতুন প্রকল্পের বিষয়ে তথ্য পেলেন কোথায়? আর আমাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করার অধিকারই বা আপনার কীভাবে থাকে?’

এরপর তাকে প্রশ্ন করা হয়, এসব বিষয় গোপনীয় কি না। তখন তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, এটা অফিশিয়াল বিষয়, অবশ্যই গোপনীয়।’