কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। খুন, ধর্ষণ, অপহরণের সঙ্গে আদালত প্রাঙ্গণে গোলাগুলি এবং অস্ত্র উঁচিয়ে বিচারককে ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটেছে। খুনের শিকার ব্যক্তির জানাজা চলাকালে মামলা হওয়ার আগেই ওই খুনের ঘটনায় আটক প্রধান সন্দেহভাজনকে দায়মুক্তি দিয়ে পুলিশ সুপারের (এসপি) সংবাদ সম্মেলনের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনাও ঘটেছে কক্সবাজারে। দুর্বল পুলিশিং, অদক্ষতা ও হঠকারী সব সিদ্ধান্তের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এসপির বিরুদ্ধে। পুলিশের ভেতরেও রয়েছে অস্থিরতা ও অসন্তোষ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, স্বাধীনতার পর ৫৫ বছরেও কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এতটা নাজুক আর হয়নি। জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে কক্সবাজারে ৮৮টি খুন, ১২৭টি ধর্ষণ ও ২৯৭টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা হয়েছে ১৫০টিরও বেশি। ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি ও অপহরণ তো আছেই।
পর্যটন এলাকাসহ জেলায় দিনে ১৫ থেকে ৩০টি চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব ঘটনার অনেকই থানায় মামলা বা সাধারণ ডায়েরি হিসাবে নথিভুক্ত না হওয়ায় এর সুনির্দিষ্ট হিসাবও নেই। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে খুদে বার্তার মাধ্যমে অভিযোগগুলো তার নজরে আনা হয়েছে। যদিও পাঠানো বার্তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
বিচারককে অস্ত্র প্রদর্শনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি : জেলা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারক যুগান্তরকে জানান, গত ৩০ নভেম্বর আদালত প্রাঙ্গণে এক বিচারককে পিস্তল দেখিয়ে ভয় দেখান এক যুবক। পরে আরও দুই বিচারক তৎকালীন সদর থানার ওসি ছমিউদ্দীনকে ডেকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন। বিষয়টি পুলিশ সুপারকেও জানানো হয়। কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ওই ঘটনার পর জানুয়ারিতে জেলা জজ পদমর্যাদার একাধিক বিচারক পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বরাবর চিঠি দিয়ে গানম্যান চেয়েছিলেন। কিন্তু গানম্যান তো দেওয়া হয়ইনি, এমনকি চিঠির জবাবও দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে গত ২৪ মে দিনদুপুরে আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্য গোলাগুলিতে দুজন গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হন। কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবদুল মন্নান বলেন, স্বাধীনতার পর কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এত অবনতি তিনি আর দেখেননি। উখিয়া ও টেকনাফের অনেক এলাকায় সন্ধ্যা নামার আগেই অপরাধীদের ভয়ে একধরনের সুনসান পরিস্থিতি নেমে আসে। আদালত চত্বরে গোলাগুলি এবং বিচারকদের অস্ত্র দেখানোর ঘটনায় বিচারক, আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
তদন্ত ছাড়াই খোরশেদ হত্যার প্রধান সন্দেহভাজনকে নির্দোষ ঘোষণা : ২৪ মার্চ রাতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ছুরিকাঘাতে নিহত হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক খোরশেদ আলম। ঘটনার পর তারিন নামের এক ব্যক্তিকে পুলিশ আটক করে। তারিনের ব্যাগ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিও উদ্ধার করা হয়। কিন্তু খোরশেদের জানাজা চলাকালে সংবাদ সম্মেলন করে তদন্ত না করেই তারিনকে নির্দোষ ঘোষণা করেন এসপি। পরিবারের অভিযোগ, এর আগে খোরশেদকে হুমকি দিয়েছিলেন তারিন।
একই সঙ্গে খোরশেদের কাকা তারেককে হত্যাকাণ্ডের প্রধান হোতা হিসাবে দাবি করা হয়। পরে তারেকের একটি সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের পর ঘটনার সময় তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এতে পুলিশের ওই বক্তব্য বিতর্কের মুখে পড়ে। জানা যায়, তারিনকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়েছে এবং প্রকৃত সন্দেহভাজনদের বাদ দিয়ে ১০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। সূত্রের দাবি, এসপির কড়া আপত্তির কারণে তারিনকে জিজ্ঞাসাবাদ বা কোনো ধরনের অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি। হত্যায় জড়িতদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার পরও পুলিশ হাত গুটিয়ে থাকতে বাধ্য হয় বলে অভিযোগ।
পরে পুলিশের ভূমিকার ওপর অনাস্থা প্রকাশ করে মামলার বাদী নাওশাদ হোসেন আদালতের মাধ্যমে মামলাটি পিবিআই-এ স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তারিন আত্মগোপনে বলে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে বাধা খোদ পুলিশ সুপার : গত ২২ এপ্রিল খুরুশকুলে মন্দিরের সেবায়েত নয়ন সাধুকে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এ হত্যার রহস্য উন্মোচনে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন সাংবাদিক অন্তর দে বিশাল। পরে পুলিশ আবদুর রহিম নামে একজনকে গ্রেফতার করে।
অন্তর দে জানান, সংবাদ প্রকাশের পর সেটি মুছে না ফেললে তাকে ওই হত্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেন এসপির আস্থাভাজন এলআইসি সদস্য সোহেল। তবে সোহেল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিষয়টি এসপিকে জানালে তিনি উলটো প্রশ্ন করেন, ‘আপনাকে নিউজ করতে কে বলছে?’ তার দাবি, পুলিশ সুপার তাকে সাধারণ ডায়েরি না করারও পরামর্শ দেন। পরে আবার হুমকি আসার পর সংবাদকর্মীদের প্রতিবাদের মুখে সদর থানা সাধারণ ডায়েরি গ্রহণ করে। এ ঘটনায় সাংবাদিকরা মানববন্ধন করেন। পূজা উদ্যাপন কমিটিও হুমকির প্রতিবাদ জানিয়ে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানায়।
পরে কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ-সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলের হস্তক্ষেপে আন্দোলন বন্ধ হলেও সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
অন্যদিকে রামু থানা পুলিশের একটি বড় ইয়াবা চালান আত্মসাতের অভিযোগের তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন নিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে একটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক শাহেদ ফেরদৌস হিরুকে পুলিশ সুপার প্রশ্ন করেন, ইয়াবা নিয়ে সাংবাদিকদের এত আগ্রহ কেন? সাংবাদিক হিরুর অভিযোগ, এসপির ব্যর্থতা, অদক্ষতা ও পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।
আইনশৃঙ্খলা সভায় এসপির আচরণ নিয়ে ক্ষোভ : আইনশৃঙ্খলা কমিটির কয়েকজন সদস্যও পুলিশ সুপারের আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে কোনো সদস্য বক্তব্য দিতে চাইলে পুলিশ সুপার অনেক সময় তার বক্তব্য থামিয়ে নিজেই কথা বলতে শুরু করেন। এতে মুক্তভাবে মতামত দেওয়ার পরিবেশ ব্যাহত হয়। স্থানীয় সংসদ-সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভায়ও এসপি মোবাইল ফোনে কখনো কখনো উচ্চৈঃস্বরে কথা বলেছেন। এতে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে বিরক্তি তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলাসংশ্লিষ্ট একটি বৈঠকে এসপির এমন আচরণে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানান কক্সবাজার-২ আসনের এমপি আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ।
পুলিশের ভেতরেও অস্থিরতা ও ক্ষোভ : জেলা পুলিশের অন্তত ৩৫ জন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির নেপথ্যে এসপির হঠকারী সিদ্ধান্ত, অদক্ষতা ও দুর্বল পুলিশিং দায়ী। সম্প্রতি গোপন তথ্য প্রকাশের অভিযোগে ১০১ জন পুলিশ সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে ইনস্পেকটর ৭, এসআই ৩৬, এএসআই ২৪ এবং কনস্টেবল ৩৪ জন। পুলিশ সদস্যদের অভিযোগ, অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের বেছে বেছে সরিয়ে দিয়ে তাদের জায়গায় তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এসপির বক্তব্য : আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, সারা দেশে প্রতি মাসে ৩০০টির মতো মার্ডার হয়। কক্সবাজারে ১৫ থেকে ২০টি হয়। সেটা আগে হয়েছিল, এখনো হচ্ছে। বেশির ভাগ হত্যাই প্রতিক্রিয়ায় ও পারিবারিক কারণে হচ্ছে। খুনের ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। অন্য অভিযোগ প্রসঙ্গে কিছুটা বিরক্তির সুরে তিনি বলেন, আমি তো অথর্ব এসপি। আপনাদের প্রিয় এসপি যখন ছিল, তখনো মার্ডার এমন হতো বলে ফোনের সংযোগ কেটে দেন।