Image description
সারা দেশে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র । চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ দিতে তিনবার চিঠি দেওয়া হয়েছে । সারা দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভয়াবহ, লোডশেডিং ৩৫০০ মোগাওয়াটের বেশি ।

গত ২৩ দিন ধরে উৎপাদনক্ষমতার প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে আদানি গ্রুপ। অথচ সারা দেশে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে। প্রচণ্ড গরমে নগর ও গ্রামবাসীর দুর্ভোগের যেন শেষ নেই। শিল্পকারখানাও উৎপাদন করতে পারছে না চাহিদামতো। বাংলাদেশের এ চরম দুঃসময়ে কেন আদানি চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ দিচ্ছে না, এর কোনো জবাব পাচ্ছে না বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। চুক্তি অনুযায়ী আদানিকে পুরো বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে চলতি মাসেই পরপর তিন দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রতিবারই তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কিন্তু প্রতিশ্রুত বিদ্যুৎ দিচ্ছে না। বিষয়টি ভূরাজনৈতিক কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডা এলাকায় আদানির ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। সেখান থেকে গত আড়াই বছরে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করলেও সবশেষ রোববার দিয়েছে মাত্র ৯১৫ মেগাওয়াট।

এদিকে সারা দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক বেশির ভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে যাওয়ায় লোডশেডিং আরও প্রকট হয়েছে। অনেক এলাকায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। তবে এই সংকটময় মুহূর্তে পিডিবির সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে। আগস্ট মাস শুরুর পর থেকে আদানির কাছ থেকে চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। জানা যায়, ৭ আগস্ট ভোর ৫টায়ও আদানি বাংলাদেশের ভেড়ামারা সীমান্ত দিয়ে ১ হাজার ৪৫৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। ৮ আগস্ট থেকে এই সরবরাহ হঠাৎ কমে দাঁড়িয়েছে ৭৯০ মেগাওয়াটে। পিডিবির একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেছেন, সারা দেশে তীব্র গরমে বিদ্যুতের অস্বাভাবিক চাহিদা বেড়েছে। এ মুহূর্তে কেন তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়েছে, তা জানার জন্য আগস্টে তিনটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রতিবারই তারা জানিয়েছে, কয়লা ভিজে গেছে অথবা কয়লা পরিবহণের রেললাইন নষ্ট। তবে তারা এও জানিয়েছে, তিন দিনের মধ্যে পুরো বিদ্যুৎ সরবরাহ দেবে। মাঝখানে এক বা দুই দিন এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করলেও আবার কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এ ব্যাপারে মন্তব্য জানার জন্য যুগান্তরের পক্ষ থেকে আদানির প্রধান অফিসে ই-মেইল করা হয়েছে। কিন্তু রোববার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ওই ই-মেইলের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। পিডিবি জানিয়েছে, কয়লার দাম নিয়ে আদানির সঙ্গে বিরোধ আছে। সেটি অর্থনৈতিক আদালতের একজন মধ্যস্থতাকারীর কাছে বিচারাধীন। এর বাইরে বাংলাদেশের কাছে আদানি গ্রুপের কোনো বিদ্যুৎ বিল বকেয়া নেই। গত মাসেও তাকে ৯ কোটি ডলারের বেশি বিল দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে অনুমোদিত বিতর্কিত চুক্তির আওতায় আদানি ভারতের গড্ডা এলাকায় ১ হাজার ৬০১০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়েছে। পিডিবির জন্য নির্ধারিত আর কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বাইরে নেই। এখন আদানির তথ্য ঠিক কি না, তা যাচাই করতে চাইলেও পিডিবির কেউ ভারতে যেতে পারছেন না। সুতরাং আদানি যা বলছে, তাই মেনে নিতে হচ্ছে। এমনকি কয়লা কেনার ব্যাপারেও আদানির কথা বিশ্বাস করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে কারও পরির্দশনের সুযোগ নেই।

বিদ্যুৎ বিভাগ এবং পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রেস কনফারেন্সের পর দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা হলেও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। এর দুই দিন পরই আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে গেছে। তবে কূটনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। সংশ্লিষ্ট একজন জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা ভারতে গিয়ে দেখতে পারলে বিষয়টি জানা যেত। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখকে অবহিত করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ এ ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত জাতীয় কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, আদানি চুক্তিতে বড় দুর্নীতি হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা এ চুক্তির কারণে বাংলাদেশকে ২৫ বছর বড় ধরনের খেসারত দিতে হবে। এতে দেশের ক্ষতির আশঙ্কা ৬০০ কোটি ডলারের বেশি।

লোডশেডিং ভয়াবহ : এদিকে সারা দেশে লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করেছে। রোববার দুপুর ১২টায় পিক আওয়ারে লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট। গত মাসে লোডশেডিং হয় সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭০০ মেগওয়াটের মতো। বিদ্যুতের চাহিদা এখন ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও সরবরাহ করতে পারছে ১৩ হাজার মেগাওয়াট। কয়লাভিত্তিক বেশির ভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা হঠাৎ শনিবার রাতে কমে গেছে। দেশের সব কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে (আদানি ছাড়া) ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা। কিন্তু হচ্ছে ৪ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের মতো (রোববার দুপুর ২টা)। কেননা রামপাল ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রে হলেও উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট। পায়রায় ১ হাজার ২০০ মোগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা থাকলেও এখন দেওয়া হচ্ছে ৫৬৫ মেগাওয়াট। পায়রার একটি ইউনিটে সম্প্রতি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ। আরএনপিএল যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটের পরিবর্তে দিচ্ছে ১ হাজার মেগাওয়াট। এসএস পাওয়ারের একটি ইউনিট শনিবার রাতে বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে এটির উৎপাদন ১ হাজার ২০০ থেকে কমে ৬০০ মেগাওয়াটে নেমে আসে। এটি রোববার চালু হওয়ার কথা। মাতারবাড়ী কেন্দ্রের একটি ইউনিট মেরামতের কারণে বন্ধ। ফলে এটি থেকে ৫৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বরিশাল কয়লাভিতিক কেন্দ্রও স্বাভাবিক সময়ে ৩০০ মেগাওয়াট দিলেও এখন দিচ্ছে ২০০ মোগাওয়াট।

এদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য তেল কিনতে রোববার অর্থ মন্ত্রণালয় ৩ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে বলে জানা গেছে।