ছ-আনার কাপড়ে ন-আনার পাড়—পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কেনাকাটায় এমন ঘটনাই ঘটেছে। হাজার টাকায় এক জোড়া জুতা কিনলেও মোজার জোড়া কিনেছে দেড় হাজারে। শুধু তাই নয়, অস্বাভাবিক মূল্যে ড্রাইভার-কর্মচারীদের জন্য হাফ ও ফুল সাফারি স্যুট, ফুল শার্ট, ভি-নেক সোয়েটার, জর্জেট ও সুতি শাড়ি, ব্লাউজ, শাল, জুতা-স্যান্ডেল, টুপি ও ছাতা কেনা হয়েছে। এ ছাড়া সব কর্মচারীর জন্য নামফলকও (নেমপ্লেট) কেনা হয়েছে। সব মিলিয়ে কেনাকাটায় যে ব্যয় হয়েছে, সেটাকে পুকুর চুরিই বলা যায়।
পরিকল্পনা অধিদপ্তর সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানের চালক ও কর্মচারীদের জন্য চাঁদপুরের শাহরাস্তির মেসার্স রাফা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কাছ থেকে ৩১ ধরনের জিনিসপত্র কিনেছে। চাঁদপুরের ওই প্রতিষ্ঠানটি গণপূর্ত অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় কম্পিউটার এক্সেসরিজ, দাপ্তরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে থাকে।
অভিযোগ রয়েছে, নতুন কেনাকাটায় অনেকগুলো পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখিয়ে বিল করা হয়েছে। এরই মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপকরণ ও সরবরাহ ইউনিট প্রতিষ্ঠানটির কেনাকাটার বিলও পরিশোধ করেছে। অভিযোগ উঠেছে, অধিদপ্তরের উপকরণ ও সরবরাহ ইউনিটের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যোগসাজশ করে অস্বাভাবিক দামে বিল তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
জানা গেছে, চলতি বছরের ৩ মার্চ ই-জিপি টেন্ডারের মাধ্যমে এসব পণ্য কেনা হয়। এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সঙ্গে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স রাফা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের চুক্তি হয়। অধিদপ্তরের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন তৎকালীন পরিচালক মো. আবদুর রাজ্জাক, ডেপুটি ডাইরেক্টর হাসান আমিন সুমন এবং সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। অন্যদিকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সই করেন স্বত্বাধিকারী মো. ফখরুল আলম পাটোয়ারী, জিএম (প্রকিউরমেন্ট) মো. নূর আলম এবং জিএম (এডমিন) মোহাম্মদ আবদুল হক। পণ্য সরবরাহের পর গত ১৩ এপ্রিল ১৭ লাখ ২০ হাজার টাকার বিল অধিদপ্তরের উপকরণ ও সরবরাহ ইউনিটের পরিচালকের কাছে জমা দেন প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ফখরুল আলম পাটোয়ারী।
বিলটির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অধিদপ্তরের চালক ও পুরুষ কর্মচারীদের জন্য হাফ ও ফুল সাফারি স্যুট, ফুল শার্ট, ভি-নেক সোয়েটার, জুতো, স্যান্ডেল, টুপি ও ছাতা কেনা হয়েছে। অন্যদিকে, নারী কর্মচারীদের জন্য জর্জেট ও সুতি শাড়ি, ব্লাউজ, শাল, জুতো ও ছাতা সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া সব কর্মচারীর জন্য নামফলকও (নেম প্লেট) কেনা হয়েছে। মোট ৩১টি আইটেমের মধ্যে বহু পণ্যের দাম অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে।
কেনাকাটার বিলে দেখা গেছে, ড্রাইভারদের প্রতিটি হাফ সাফারির দাম ধরা হয়েছে আড়াই হাজার টাকা। তাদের ব্যবহারের প্রতিটি টুপি কেনা হয়েছে এক হাজার টাকায়। কর্মচারীদের প্রতিটি নামফলক তৈরিতেও খরচ দেখানো হয়েছে এক হাজার টাকা করে। এ ছাড়া প্রতিটি ছাতা, ভি-নেক সোয়েটার ও ফুল শার্টের দাম ধরা হয়েছে এক হাজার টাকা করে। নারী কর্মচারীদের জন্য কেনা প্রতিটি সুতি ও জর্জেট শাড়ির দামও দেখানো হয়েছে এক হাজার টাকা।
কর্মচারী ও ড্রাইভারদের জন্য কেনা সাধারণ জুতা ও স্যান্ডেলের প্রতি জোড়ার দাম ধরা হয়েছে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। পুরুষ কর্মচারীদের জন্য অক্সফোর্ড জুতা কেনা হয়েছে প্রতি জোড়া দুই হাজার টাকায়। বিল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৩১টি আইটেমের মধ্যে অনেক পণ্যের দাম অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখানো হয়েছে। অধিকাংশ পণ্যের একক দাম এক হাজার টাকা বা তার বেশি।
৩১টি আইটেমের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে মোজার দাম নিয়ে। চালকদের জন্য ১৪৪ জোড়া মোজা কেনা হয়েছে। প্রতি জোড়ার দাম ধরা হয়েছে দেড় হাজার টাকা। এতে শুধু ১৪৪ জোড়া মোজার পেছনে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা। অথচ বাজারে ভালো ব্র্যান্ডের এক জোড়া মোজা ১২০ থেকে ২৫০ টাকায় পাওয়া যায়।
চালকদের জন্য ৭২ জোড়া জুতা ও ৭২ জোড়া স্যান্ডেল কেনা হয়েছে। প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে এক হাজার টাকা। তাদের জন্য ১০৮টি হাফ সাফারি কেনা হয়েছে প্রতিটি আড়াই হাজার টাকায়। এ ছাড়া ৭২টি টুপি, ৩৬টি ছাতা ও ৩৬টি নামফলক কেনা হয়েছে প্রতিটি এক হাজার টাকা দরে। চালকদের জন্য দুটি ফুল সাফারি ও দুটি সোয়েটারও কেনা হয়েছে, প্রতিটির দাম এক হাজার টাকা।
পুরুষ কর্মচারীদের জন্য ৬৬টি করে ফুল ও হাফ সাফারি কেনা হয়েছে, প্রতিটির দাম এক হাজার টাকা। তাদের জন্য ১৩২ জোড়া জুতা ও ১৩২ জোড়া মোজা কেনা হয়েছে। প্রতি জোড়া জুতা ও মোজার দাম ধরা হয়েছে এক হাজার টাকা। এ ছাড়া ৬৬টি ছাতা ও ৬৬টি নামফলক কেনা হয়েছে, প্রতিটির দাম এক হাজার টাকা করে।
নারী কর্মচারীদের জন্য ১৮টি জর্জেট ও ১৮টি সুতি শাড়ি কেনা হয়েছে। প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে এক হাজার টাকা। এ ছাড়া ১৮ জোড়া স্যান্ডেল ও ১৮ জোড়া মোজা কেনা হয়েছে, প্রতিটির দাম এক হাজার টাকা। তাদের জন্য ৯টি ছাতা ও ৯টি নামফলক কেনা হয়েছে, প্রতিটির দামও এক হাজার টাকা করে।
পুরুষ কর্মচারীদের জন্য ৬৬টি ভি-নেক সোয়েটার ও ৬৬টি ফুল শার্ট কেনা হয়েছে। প্রতিটির দাম এক হাজার টাকা। নারী কর্মচারীদের জন্য ৯টি শাল বা সোয়েটার এবং ৯টি ফুলহাতা ব্লাউজ কেনা হয়েছে। প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে এক হাজার টাকা।
পুরুষ কর্মচারীদের জন্য ৪০ জোড়া অক্সফোর্ড জুতা কেনা হয়েছে প্রতি জোড়া দুই হাজার টাকায়। আরও ৪০ জোড়া ভিন্ন ধরনের জুতা কেনা হয়েছে প্রতি জোড়া এক হাজার ৪৭৫ টাকায়। এ ছাড়া ২০টি ছাতা কেনা হয়েছে, প্রতিটির দাম এক হাজার টাকা।
এ ছাড়া নারী কর্মচারীদের জন্য আরও ৬ জোড়া জুতা বা স্যান্ডেল কেনা হয়েছে, প্রতি জোড়ার দাম এক হাজার টাকা। একই সংখ্যক, অর্থাৎ ৬ জোড়া মোজাও কেনা হয়েছে প্রতি জোড়া এক হাজার টাকায়। তাদের জন্য আরও তিনটি ছাতা কেনা হয়েছে, প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে এক হাজার টাকা। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স রাফা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী ফখরুল আলম পাটোয়ারী জানান, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে তাদের বিল নিয়ে কোনো সমালোচনা হচ্ছে বলে তিনি জানেন না। তবে বিষয়টি তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।
চুক্তিপত্র ও বিলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (মনিটরিং) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সই করেছেন। বিলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে আমি হাসপাতালে আছি। এ বিষয়ে অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। তিনি নিজে বিলে সই করেছেন বলে জানানো হলে, তিনি হাসপাতালে আছেন বলে জানান।
অন্যদিকে, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপকরণ ও সরবরাহ ইউনিটের সাবেক পরিচালক মো. আবদুর রাজ্জাক অধিদপ্তরের পক্ষে ওই কেনাকাটায় সই করেছেন। এখন তিনি আর অধিদপ্তরে নেই। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ৩১টি আইটেম কেনাকাটার জন্য রাফা ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। তারা পণ্য সরবরাহ করেছিল। তিন মাস আগে আমি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর থেকে বদলি হয়ে এসেছি। বিল বা অর্থছাড় আমি করিনি।