Image description
স্বজনদের কান্নায় ভারী চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র

এক যুগের বেশি অপেক্ষার প্রহর গুনছেন গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনরা। তারা জানেন না-প্রিয়জন কোথায় আছেন, বেঁচে আছেন কি না। এরই মধ্যে কেউ ফিরে এসেছেন অন্ধকার ‘আয়নাঘর’ থেকে। তবে শরীর ও মনে গভীর ক্ষত। তাদেরও আকুতি-অন্যরা যেন ফিরে আসে। রোববার রাজধানীতে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের আলোচনাসভায় প্রিয়জনকে ফেরত চেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। এ সময় তাদের কান্না এবং মঞ্চে বসা অতিথিদের অশ্রুজলে বেদনাবিধুর এক পরিবেশ তৈরি হয়। স্বজনদের কণ্ঠে একটাই দাবি-‘গুম ও খুনের প্রতিটি ঘটনার সত্য প্রকাশ করতে হবে। শনাক্ত করতে হবে দায়ীদের। নিশ্চিত করতে হবে দৃষ্টান্তমূলক ন্যায়বিচার।’

গুমের শিকার ছাত্রদল নেতা পারভেজ হোসেনের মেয়ে আদিবা ইসলাম রিধি বলেন, ‘২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর আমার বাবাকে ঢাকার শাহবাগ থেকে তুলে নেওয়া হয়। ছোট থেকে বড় হয়ে গেলাম বাবাকে খুঁজতে খুঁজতে; কিন্তু বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্নটা পূরণ হলো না। বাবা কেমন আছেন, কোথায় আছেন, বেঁচে আছেন কি না-কিছুই জানি না। সন্তানের জন্য এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে? আমরা কোনো প্রতিশোধ চাই না। আমরা শুধু সত্যটা জানতে চাই এবং ন্যায়বিচার চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা গুম হয়েছে, তাদের স্বজনদের কান্না থামাতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি আজ গুম হওয়া, গুমের শিকার সালাউদ্দিন হিসাবে কথা বলছি। হুম্মাম কাদের বলে গেছেন। প্রথমে আমি গুমের শিকার হিসাবে কথা বলেছি। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে কথা বলেছি। এরপর রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসাবে কথা বলেছি। বলারই তো কথা! আমরা যদি আরও হিসাব দিই-জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে যে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি বাংলাদেশে তদন্ত করেছে, তারা ১৪০০-এর মতো শহীদের তালিকা পেয়েছে। তাও যেটা রেকর্ডেড হয়েছে বিভিন্ন হাসপাতাল, পত্রিকা এবং বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রাপ্ত তথ্য থেকে। আমাদের হিসাবে সেটা তো ২০০০-এর বেশি।’

তিনি বলেন, ‘স্বজনরা এখন কবরের সন্ধান করে। আমরা দিতে পারি না। লাশ গায়েব করা হয়েছে, পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। হাসপাতালের রেকর্ড গায়েব করে ফেলা হয়েছে। সেরকম একটা ফ্যাসিস্ট, স্বৈরাচারী শাসনামলের মধ্য দিয়ে আমরা গিয়েছি। কিন্তু সেই ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার কোনো অনুশোচনা নেই। সেই ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের অনুতাপ নেই। দুঃখপ্রকাশ তো দূরের কথা! উলটো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের যারা যোদ্ধা, তাদের বলছে, তারা জঙ্গিবাদী তৎপরতার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে নাকি ধ্বংস করেছে! তাদের গদিচ্যুত করেছে।’ সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা চাই গুমের শিকার ব্যক্তিরা যেন আইনের কাছে যেতে পারেন। বিচার পান।’

তিনি বলেন, ‘তখন একটা গুম কমিশন করা হয়েছিল। কয়েকজন ব্যক্তিকে কমিশনার বানিয়ে দেওয়া হলো। সেই কমিশনের কার্যক্রম যা নির্ধারিত হলো। তাতে দেখা গেল, যিনি গুমের শিকার হয়েছেন, তিনি সরাসরি আদালতে যেতে পারছেন না। এখন আইসিটি অ্যাক্টের মধ্যে যে বিধানটা আছে তা হলো-ওয়াইড স্প্রেড সিস্টেমেটিক এনফোর্স ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সের জন্য আইসিটি কোর্টে যাওয়া যাবে। তার সাজা যাবজ্জীবন, মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত আছে। আমি নিজেও একটি মামলার বাদী হয়েছি। তদন্ত এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে।’

ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান বলেন, ‘একটি অন্ধকার ঘরে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম। গুমের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রথম দাবি অ্যাকাউন্টেবিলিটি, জবাবদিহিতা। এখনো শতাধিক পরিবার জানতে পারে না তাদের প্রিয়জনের সঙ্গে কী করা হয়েছে। এই সুনির্দিষ্ট তথ্য যতদিন রাষ্ট্র না দিতে পারছে, এ জাতি কলঙ্কমুক্ত হবে না। অবিলম্বে এ তথ্য পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যা করা দরকার তাই করতে হবে।’

হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, ‘আমরা যারা ফিরে এসেছি, আমাদের হয়তো সবচেয়ে বড় পরিচয়ই এখন গুমের ভিকটিম। এখন আমরা ভিকটিম না, সারভাইভার। আমরা এখন অ্যাক্টিভিস্ট। অনলাইনে আমাদের অনেক ধরনের ট্রলের শিকার হতে হয়। অ্যাক্টিভিজম আগে করেছিলাম বিচারের জন্য, এখন অ্যাক্টিভিজম করছি এই ধরনের ঘটনা আর যেন বাংলাদেশের মাটিতে না হয়।’

গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ‘২০১৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আমরা ‘মায়ের ডাক’-এর পক্ষ থেকে প্রতিটি বছর এই দিবসকে সামনে রেখে স্বজনদের ছবিগুলো আঁকড়ে ধরে দাঁড়াতে চেয়েছি; চেষ্টা করেছি সেই দাবিতে অনড় থাকতে। আসলে এক যুগেরও বেশি প্রতিটি ৩০ আগস্ট আমাদের জন্য ছিল এক সম্মুখ-লড়াই। বিভিন্ন বাহিনী যখন রাস্তা বন্ধ করে দিত, যখন ভেন্যু থেকে আমাদের সরিয়ে দেওয়া হতো বা কোনো ভেন্যুতে কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া হতো না, আমরা তখনও আওয়াজ তুলেছি। যখন শাহবাগে আমাদের দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি, তখনও ছবি, ব্যানার ও পোস্টার তুলে ধরে আমরা দাঁড়িয়েছি, প্রতিবাদ জানিয়েছি। কারণ আমাদের মনে হয়েছে, যে ভাইদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যারা আয়নাঘর ও গোপন আটককেন্দ্রে (সিক্রেট ডিটেনশন সেল) বন্দি আছে, তাদের কণ্ঠ তো পৌঁছাচ্ছে না, তাদের তো দেখা যাচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গঠিত তদন্ত কমিশন আয়নাঘর নিয়ে যে বক্তব্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ তুলে এনেছে, তাতে উঠে এসেছে ভয়াবহ সব বর্ণনা। গোপন কেন্দ্রে আটকে রেখে কীভাবে হাত-পা বেঁধে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো এবং রিভলভিং চেয়ারে এমনভাবে নির্যাতন করা হতো, যাতে মানুষ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। এখানে উপস্থিত হুম্মাম ভাই, আরমান ভাই ও খোকন ভাই ফেরত এসেছেন। তাদের কাছে যে বিবরণ শুনেছি, তাতে স্পষ্ট যে তারা জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করে ফিরে এসেছেন।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তুলি বলেন, ‘১৪ বছর সবার পাশে দাঁড়াতে গিয়ে নিজের ভাইয়ের কথা কখনো প্রকাশ্যে বলতে পারিনি, তার শেষ সময়টাতে কেমন লাগছিল বা তার সঙ্গে কী ঘটেছিল। কারণ আমি জানতাম, আমি যদি কেঁদে ফেলি বা দুর্বল হয়ে পড়ি, তাহলে আমাদের এই হাজারো ভুক্তভোগী পরিবার হয়তো লড়াই করার সাহস হারিয়ে ফেলবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬’ নিয়ে কাজ চলছে এবং জাতীয় সংসদে তা উত্থাপন করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই আইনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের বিষয়টি কতটা শক্তিশালী হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে বলছি, বিগত সময়ের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও বলপূর্বক গুমের মতো পদ্ধতিগত ও ব্যাপক অপরাধগুলোর (ওয়াইডস্প্রেড অ্যান্ড সিস্টেম্যাটিক কেস) বিচার যেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) দ্রুত সম্পন্ন হয়।’

মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনসহ গুমের শিকার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য।